(কেন্দ্রীয় পার্টি স্কুলে কমরেড বিনোদ মিশ্রের উদ্বোধনী ভাষণ, জুন ১৯৯৪)

প্রিয় কমরেডস,

আমি আপনাদের সকলকে কেন্দ্রীয় পার্টি স্কুলে স্বাগত জানাই। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন বহুদিন ধরে আমাদের পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের এক সর্বাঙ্গীণ ও সৃজনশীল অধ্যয়নের অভ্যাস গড়ে তুলেছে এবং গোটা ১৯৮০-র দশক জুড়ে গোপন অবস্থায় কাজ করা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় স্তর থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত সমস্ত স্তরে পার্টি স্কুল সংগঠিত করেছে। এই সমস্ত স্কুলে চিরায়ত মার্কসবাদী সাহিত্য এবং ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি – উভয়ের অধ্যয়নই বিষয়বস্তু হিসাবে থেকেছে। ভারতবর্ষের নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঙ্গে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সার্বজনীন সত্যের সমন্বয়সাধন করা, এইভাবে পার্টি লাইনকে সমৃদ্ধ করা এবং সমগ্র পার্টিকে ঐ লাইনের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে এই অধ্যয়ন পার্টির কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। আমাদের পার্টি যে এরকম জোরদার মতাদর্শগত-তাত্ত্বিক কাজ ধারাবাহিকভাবে করে এসেছে সেকথা পার্টির বাইরে বিশেষ কেউই জানেন না। আর তাই আমরা যে বিনা জটিলতায় একটা পর্যায় থেকে পরবর্তী পর্যায়ে উত্তরণ ঘটিয়ে চলেছি তা বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে বিস্ময়কর বলেই মনে হয়। আইপিএফ-এর মধ্যে কাজ করার সময়ও ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত পার্টি কাঠামো যে অটুট রেখে দেওয়া হয়েছিল তা নিছক কাজের ভাগাভাগির স্বার্থেই নয়, মূলত সমগ্র আন্দোলনের মতাদর্শগত-তাত্ত্বিক পথপ্রদর্শনের জন্যই, একথাও অনেকেই জানেন না। যাঁরা মনে করেছিলেন আইপিএফ-এর বেদীমূলে পার্টিকে বলি দেওয়া হচ্ছে, আজ যখন সমগ্র রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পার্টি বিনা সমস্যায় নিজের হাতে তুলে নিয়েছে সেটা তাঁরা আর ব্যাখ্যা করতে পারছেন না।

মাসখানেক আগে কোনো এক এম-এল গোষ্ঠীর জনৈক কমরেডের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। আমাদের পার্টি সম্পর্কে তাঁর অনেক সমালোচনা ছিল। কিন্তু একটা বিষয়ে তিনি আমাদের প্রশংসাই করলেন। তাঁর ভাষায় সেটি হল পার্টি গঠনে আমাদের পারদর্শিতা। বস্তুত, সাংগঠনিক দক্ষতা বা কোনো ব্যক্তি নেতার আকর্ষণ নয়, মতাদর্শগত-তাত্ত্বিক কাজকে পার্টি গঠনের মূল যোগসূত্র হিসাবে নেওয়ার ফলেই মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আন্দোলনে ব্যাপক রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ও সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার মধ্যেও আমরা পার্টি গঠনের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছি। এটা আমাদের পার্টির একটা বৈশিষ্ট্য, এক মহান ঐতিহ্য, যা আমাদের রক্ষা করা, টিকিয়ে রাখা উচিত।

আপনারা জানানে, সিপিআই মার্কসবাদের অধ্যয়ন বহুকাল ছেড়ে দিয়েছে। সোভিয়েত প্রচারপুস্তিকাই তাদের একমাত্র অধ্যয়নের বিষয় হয়ে উঠেছিল। আর সোভিয়েতের পতনের পর সিপিআই-এর গোটা প্রচারব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। সিপিআই(এম)-এর অধ্যয়ন চিরকালই অত্যন্ত ছকে বাঁধা এবং তার মধ্যে অধিবিদ্যা রয়েছে প্রচুর। মার্কসবাদের কোনো স্বাধীন ও সৃজনশীল অধ্যয়নের বা পার্টির ভিতরে কোনো মতাদর্শগত-তাত্ত্বিক বিতর্ক চালানোর কোনো সুযোগ সেখানে নেই। অতি-বাম গ্রুপগুলির মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। মাও চিন্তাধারাকেও তারা প্রথমে তার মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং তারপর তার সামগ্রিকতা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে মাওয়ের কিছু উদ্ধৃতি তুলে নিয়ে নিজেদের ভাববাদী-নৈরাজ্যবাদী চিন্তাভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে সেগুলির ব্যাখ্যা দেয়।

এসবের বিপরীতে আমাদের অবস্থা নিঃসন্দেহে বেশ ভালো। কিন্তু আমি মনে করি না আমাদের পার্টিতেও সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। বিশেষ করে গত দুবছরে মতাদর্শগত স্তরে কিছু অবনতি দেখা গেছে, সাধারণভাবে পার্টির তাত্ত্বিক মানও নেমে গেছে। আমার মনে হয় এই স্কুলে উপস্থিত কমরেডদের মধ্যে যদি সমীক্ষা চালানো হয় তবে দেখা যাবে ভালো সংখ্যক কমরেডই সাম্প্রতিক চিরায়ত সাহিত্যের ধারেকাছে যাননি তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই দৈনন্দিন কাজের চাপকে এই অবস্থার জন্য দায়ী করবেন।

যতদূর মনে পড়ে, পার্টিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসার পিছনে আমাদের একটা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মার্কসবাদের বিরুদ্ধে বুর্জোয়াদের নতুনতর আক্রমণের মোকাবিলা করা। আমরা সকলেই সম্ভবত স্বীকার করতে বাধ্য যে এ ব্যাপারে আমরা যেটুকু করে উঠতে পেরেছি তা আজকের চ্যালেঞ্জের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। আর এখন, যখন আমাদের পার্টি এক দ্রুত বিস্তারের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে, যখন আমরা সমস্ত কমিউনিস্টদের সিপিআই(এমএল)-এ যোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছি, তখন পার্টির মতাদর্শগত-তাত্ত্বিক সংহতকরণ এক নতুন আশু গুরুত্ব নিয়ে সামনে আসছে। আর তাছাড়া, পার্টি-অনুশীলনের বিভিন্ন শাখা যখন তাদের কাজের পরিমাণের বৃদ্ধির দরুণ ও পৃথক পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর মাধ্যমে ক্রমশই স্বাধীন মর্যাদা অর্জন করতে শুরু করেছে, তখন মতাদর্শগত-তাত্ত্বিক কাজের কোনোরকম অবহেলা একপেশে ও আধিবিদ্যক দৃষ্টিভঙ্গীর জন্ম দিতে বাধ্য। মতাদর্শগত-তত্ত্বগত কাজ পার্টির প্রাণস্বরূপ, যা বাদ দিলে পার্টি এক জড় বস্তুতে পরিণত হবে। পার্টিকে একটি জাহাজ হিসাবে ধরলে এই কাজ হল তার ইঞ্জিন যেটি ছাড়া জাহাজ মহাশয় দিশাহীনভাবে ঘুরে বেড়াবে এবং তীরে পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না। কেন্দ্রীয় স্কুলের উদ্দেশ্য এই লক্ষ্যে এক নতুন সূচনা করা এবং পরবর্তী কয়েক মাসে স্কুল ব্যবস্থাকে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করতে হবে।

আমাদের পার্টি তার জীবনের ২৫ বছর অতিক্রম করে এসেছে। ১৯৯৩ সালে পার্টি প্রকাশ্যে কাজ করতে শুরু করার পর থেকে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এবং আমরা পার্টির অগ্রগতির এক নতুন, বলা যায় নির্ণায়ক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি। আমি একে এক নির্ণায়ক পর্যায় বলছি এই জন্য যে ঠিক এখনই একদিকে সিপিআই(এম) পরিচালিত বামফ্রন্ট সরকারের মধ্যে মূর্ত দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী কৌশল এবং অন্যদিকে জনযুদ্ধ গোষ্ঠী পরিচালিত আশু ক্ষমতা দখলের বাম সুবিধাবাদী কৌশল উভয়েই এক অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে। উভয়ের মধ্যেই অবক্ষয় ও অধঃপতনের চিহ্ন সুস্পষ্ট।

একনাগাড়ে ১৭ বছর টিকে থাকা সত্ত্বেও বামফ্রন্ট সরকার দেশের শ্রমিক-কৃষক জনসাধারণের মধ্যে কোনোরকম প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদের অপর ঘোষিত উদ্দেশ্য – কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস – অর্জনেও তারা ব্যর্থ। তারা কোনো বিকল্প অর্থনৈতিক কার্যক্রমও হাজির করতে পারেনি। বাম ও গণতান্ত্রিক বা ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্পের বহু বড় বড় বুলি সত্ত্বেও কেন্দ্রে কংগ্রেস(ই)-র শাসনের সংহত হয়ে ওঠাকেও তারা ঠেকাতে পারেনি। আর নেতিবাচক দিকের কথা বলতে গেলে, বামফ্রন্টের শাসন পশ্চিমবাংলায় বুর্জোয়া জমিদারদের শাসনকেই সংহত করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে এবং জাতীয় স্তরে তা এই দলের নানা ধরনের সুবিধাবাদী সামাজিক-রাজনৈতিক আঁতাতে জড়িয়ে পড়ার পথকেই প্রশস্ত করেছে। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্ধ আকুলতা সম্প্রতি সিপিআই(এম)-কে কংগ্রেস(ই)-র সঙ্গে হাত মিলিয়ে নির্বাচনী সংস্কার বিলের সক্রিয় সমর্থনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

বিপ্লবী বাম শিবিরের পক্ষ থেকে একমাত্র আমাদের পার্টিই বামফ্রন্ট সরকারের তত্ত্ব ও অনুশীলনের এক পূর্ণাঙ্গ সমালোচনা হাজির করতে পেরেছে। সমস্ত ফ্রন্টে এই সরকারের জনবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপগুলির সমালোচনা ও বিরোধিতা করার পাশাপাশি আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি গ্রামাঞ্চলে এই সরকারের সামাজিক ভিত্তিতে সুস্পষ্ট শ্রেণীনির্ভর বিভাজন সৃষ্টির ওপর। করন্দা[] প্রমাণ করে যে এটাই এই সরকারের দুর্বলতম জায়গা। উপরন্তু, সরকার গঠনের সমাজগণতন্ত্রী অনুশীলনের দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্যে প্রকৃতই শ্রেণীসংগ্রামের হাতিয়ার হিসাবে একটি বাম সরকার গড়ে তোলার প্রশ্ন আমরা সামনে নিয়ে এসেছি। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, প্রকৃতি ও সমাজের সমস্ত বিভাজনের মতো মার্কসবাদী ও সংস্কারবাদী কৌশলের মধ্যে বিভাজনরেখাও পরিবর্তনশীল এবং বাস্তব পরিস্থিতিই তা নির্ধারণ করে। আজকের পরিস্থিতিতে সরকার গঠন সম্পর্কে আমাদের কৌশলকে নতুন স্তরে উন্নীত করাই হল সমাজগণতন্ত্রীদের এক মারাত্মক আঘাত হানার, তাদের গণভিত্তি ও সাধারণ কর্মীবাহিনীকে আমাদের পক্ষে জয় করে নিয়ে আসার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়। এছাড়া আর সবকিছুই নিছক বুলিসর্বস্বতা, যা সমাজগণতন্ত্রের প্রভাবকে কণামাত্র খাটো করতে পারে না। পশ্চিমবাংলায় সীমিত শক্তি নিয়েও মার্কসবাদী-লেনিনবাদী শক্তিগুলির মধ্যে একমাত্র আমাদের পার্টিই যে রাজ্য-রাজনীতির মূলস্রোতে নিজস্ব জায়গা করে নিতে পেরেছে তা আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। সমস্ত ধরনের চাপের মুখেও আমরা পশ্চিমবঙ্গে সরকারের বামপন্থী বিরোধিতার নীতিনিষ্ঠ অবস্থানে অবিচল থেকেছি এবং প্রায় সমস্ত ফ্রন্টে সিপিআই(এম)-এর সুবিধাবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করে গেছি।

ভারতবর্ষের বাম আন্দোলনের অভ্যন্তরে আমাদের সিপিআই(এম)-এর বিপরীত মেরু হিসাবে গণ্য করা হয়। ঐক্যের স্বার্থকে বিন্দুমাত্র বিসর্জন না দিয়েই আমরা এই স্বীকৃতি লাভ করেছি। সিপিআই(এম)-এর মোকাবিলায় আমাদের কৌশল সমাজগণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা, অবশ্যই উচ্চতর স্তরে। ক্রমশই বেশি বেশি সংখ্যায় বিপ্লবী কমিউনিস্টরা আমাদের কৌশলকেই নতুন পরিস্থিতিতে সমাজগণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একমাত্র বাস্তবধর্মী, কার্যকরী ও গণভিত্তিসম্পন্ন চ্যালেঞ্জ হিসাবে উপলব্ধি করতে পারছেন। বর্তমানে সমাজগণতন্ত্রী পরীক্ষা-নিরীক্ষা যখন এক অচলাবস্থার সম্মুখীন, তখন আমাদের পার্টি নতুন ও দৃঢ় উদ্যোগ নেওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। যে যে বিষয়গুলির কথা মাথায় রেখে আমি বলেছিলাম যে আমরা পার্টির অগ্রগতির এক নতুন, নির্ণায়ক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি, এটি তার অন্যতম।

১৯৮০-র দশকের গোড়ার দিকে আমাদের ঐক্য প্রচেষ্টা, বিশেষ করে সীতারামাইয়ার নেতৃত্বাধীন অন্ধ্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের ঐক্য প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে পার্টির পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া দুটি ভিন্ন পথে এগোতে থাকে। অন্ধ্র গোষ্ঠীটি চারু মজুমদার ও খতনের লাইনের বিরোধিতা করে এবং আইনি ও গণকার্যকলাপের ওপর জোর দেয়। তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রে সক্রিয় কয়েকটি গোষ্ঠীর সঙ্গে একযোগে এরা একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় চরিত্রের কেন্দ্রীয় সংগঠন গড়ে তোলে, যা সিপিআই(এমএল) জনযুদ্ধ গোষ্ঠী হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রামীণ দরিদ্র জনগণের ও ছাত্রদের কিছু শক্তিশালী গণসংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে এঁদের সূচনা ছিল সম্ভাবনাময়। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই এ সবকিছুই আবার পুরোদস্তুর “দলম্”-কেন্দ্রিক কার্যকলাপে অধঃপতিত হয়। এঁদের তাত্ত্বিক-রাজনৈতিক অবস্থান কখনই খুব স্পষ্ট ছিল না। সাধারণভাবে জনগণের, বিশেষত উপজাতীয় জনগণের অভাব-অভিযোগের সমাধানে জঙ্গী সশস্ত্র অ্যাকশনকেই প্রধান কাজ হিসাবে দেখা হত। কিন্তু রাজনৈতিক বা কৌশলগত স্তরে এগুলিকে লাল রাজনৈতিক ক্ষমতার ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসাবেই একমাত্র ব্যাখ্যা করা যায়। এই সংগঠনের শেষপর্যন্ত একটি নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠীতে রূপান্তরের সমগ্র কাহিনি এখানে পুনরাবৃত্তি না করলেও চলবে। এটুকু বলাই যথেষ্ট যে বর্তমানে এই গোষ্ঠী এক গুরুতর মতাদর্শগত বিক্ষোভ ও সাংগঠনিক ভাঙনের মধ্যে দিয়ে চলেছে, এবং এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এঁদের নেতৃত্ব কৌশলগত লাইনে বড় রকমের পরিবর্তন ঘটাতে চলেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

বিপরীতে, ১৯৭০ দশকের শেষদিকেই আমাদের পার্টি উপলব্ধি করে যে প্রত্যক্ষ বিপ্লবী আক্রমণের প্রথম পর্যায় শেষ হয়ে গেছে। সশস্ত্র সংগ্রামকে নতুন স্তরে উন্নীত করে লাল ফৌজ ও ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলার কোনো আহ্বান এখন বাম হঠকারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রয়োজনমতো সশস্ত্র প্রতিরোধ সহ গণ কৃষক সংগ্রাম গড়ে তোলার ওপর প্রাথমিক গুরুত্ব দিয়ে চলার পাশাপাশি ব্যাপক জনসাধারণের মধ্যে আমাদের প্রভাব বাড়িয়ে তোলার স্বার্থে আমরা সংসদসহ সমস্ত আইনি সুযোগকেই কাজে লাগানোর, ভারতীয় জনগণের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে থেকে নতুন সহযোগী খুঁজে বের করতে যুক্তমোর্চার কার্যকলাপ শুরু করার এবং শত্রু শিবিরের সমস্ত দ্বন্দ্বকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিই।

ভারতের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি তথা বিপ্লবী আন্দোলনের বর্তমান পর্যায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সামগ্রিক একগুচ্ছ কৌশল গড়ে তুলতে গিয়ে আমাদের পার্টির ভিতরে বিলোপবাদী প্রবণতার সম্মুখীন হতে হয়। এই প্রবণতা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শ ও কমিউনিস্ট পার্টিকে নাকচ করে তার পরিবর্তে নিয়ে আসতে চায় এক অসংবদ্ধ বাম মতাদর্শ ও এমন এক বাম সংগঠন যা কৃষক সংগ্রামে বুনিয়াদী শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গিকেই অস্বীকার করে এবং আমাদের পার্টিকে বামফ্রন্ট বা জনতা দল ধরনের কোনো সরকারের লেজুড়ে পরিণত হওয়ার পক্ষে দাঁড়ায়। সংসদসর্বস্বতার বিভিন্ন ধরনের বহিঃপ্রকাশের বিরুদ্ধেও পার্টিকে লাগাতার লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে। নানা ধরনের পেটি বুর্জোয়া বিপ্লবীরা আমাদের নীতিগুলির তীব্র বিরোধিতা করে, আমাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনে এবং আমাদের কখনও দেং জিয়াও পিং-এর দালাল, কখনও বা সরকারি নকশাল ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করে। আমাদের পার্টি দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধভাবে এই অতি-বাম বিরোধিতার মোকাবিলা করে এবং এই বাম সুবিধাবাদীদের আসল চেহারা উন্মোচিত করে। পরবর্তীতে এঁরাই পুরোপুরি নৈরাজ্যবাদে অধঃপতিত হন, জঘন্য ধরনের রাজনৈতিক সুবিধাবাদ অনুশীলন করেন এবং এঁদের কেউ কেউ এমনকি সাধারণ জনগণ ও কমিউনিস্ট কর্মীদের হত্যাকাণ্ডেও লিপ্ত হয়।

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা স্মরণ করার জন্য ফ্রান্সে শ্রেণীসংগ্রাম-এর ভূমিকা থেকে এঙ্গেলসের বক্তব্য শোনা যাক। “(১৮৪৯-এর পরাজয়ের পর) অমার্জিত গণতন্ত্র আশা করেছিল অদূর ভবিষ্যতেই নতুন করে আক্রমণ শুরু করা যাবে। আমরা কিন্তু ১৮৫০-এর শরৎকালেই ঘোষণা করেছিলাম যে বিপ্লবী যুগের অন্তত প্রথম অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে আবার নতুন সংকট ঘনিয়ে না আসা পর্যন্ত অন্য কিছু আশা করা যায় না। এই কারণে আমাদের বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতক বলে অপাংক্তেয় করে দেওয়া হয়। যাঁরা আমাদের সেদিন তাড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্যতিক্রমহীনভাবে তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই কিন্তু পরবর্তীকালে বিসমার্কের সঙ্গে মিটমাট করে নেন, অবশ্য বিসমার্ক তাঁদের যতটা পাত্তা দিতে প্রস্তুত ছিলেন ততদূর পর্যন্তই।”

এই নতুন পর্যায়ে সংগ্রামের নতুন রূপ সম্পর্কে এঙ্গেলস বলেন, “সার্বজনীন ভোটাধিকার থেকে আমরা যদি একমাত্র এই সুবিধাটুকুই পেয়ে থাকি যে এর ফলে প্রতি তিন বছর অন্তর আমরা আমাদের সংখ্যা গোনার একটা সুযোগ পাই; প্রতিবার প্রমাণিতভাবে আমাদের ভোটের অভাবনীয় দ্রুত বৃদ্ধি একই অনুপাতে শ্রমিকদের বিজয়ের নিশ্চয়তা ও তাদের শত্রুদের অস্বস্তি বাড়ায় এবং এইভাবে আমাদের সবচেয়ে ভালো প্রচারের উপায় হয়ে দাঁড়ায়; এর মাধ্যমে আমরা আমাদের পদক্ষেপগুলির সাফল্যের মাত্রার এক অতুলনীয় পরিমাণ পাই যা আমাদের অকারণ ভীরুতা ও বেপরোয়া দুঃসাহস দুইয়ের থেকেই রক্ষা করে – সার্বজনীন ভোটাধিকার থেকে যদি আমরা মাত্র এইটুকু সুবিধাই পেতাম তাহলেও সেটা হত অনেক। কিন্তু বাস্তবে তা আমাদের আরও বহু কিছুই দিয়েছে। আমাদের থেকে এখনও যাঁরা দূরে আছেন নির্বাচনের ময়দানে তাঁদের কাছে যাওয়ার, ব্যাপক জনগণের সামনে সমস্ত দলকে আমাদের আক্রমণের জবাবে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকলাপের পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য করার এক অতুলনীয় সুযোগ এর দরুণ আমরা পেয়েছি। এছাড়াও রাইখাস্টাগে আমাদের প্রতিনিধিরা সংসদে আমাদের বিরোধীদের ও সংসদের বাইরে ব্যাপক জনগণের কাছে নিজেদের বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার এমন একটা মঞ্চ পেয়েছেন যার কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতা সংবাদ মাধ্যমে বা জনসভায় রাখা বক্তব্যের থেকে আলাদা। ...

“এইভাবে সার্বজনীন ভোটাধিকারকে সফলভাবে কাজে লাগানোর ফলে কিন্তু সর্বহারা সংগ্রামের একেবারেই নতুন একটি উপায় উদ্ভাবিত হল এবং শীঘ্রই তা আরও বিকাশলাভ করল। বোঝা গেল যে বুর্জোয়াদের শাসন যে সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগঠিত হয় সেগুলিই আবার শ্রমিকশ্রেণীকে সেগুলির বিরুদ্ধেই লড়াইয়ের সুযোগও করে দেয়।”

রাশিয়াতেও ১৯০৫-এর বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর লেনিন আইনি ও প্রকাশ্য কাজকর্মের জন্য ও ডুমায় অংশগ্রহণের জন্য পার্টিকে ঢেলে সাজান। রুশ পার্টিতেও এই সময় কিছু বাম সুবিধাবাদী প্রবণতা আত্মপ্রকাশ করে যারা লেনিনের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনে এবং বলশেভিকবাদকে বয়কটবাদের সঙ্গে এক করে দেখায়। লেনিন এই সমস্ত প্রবণতাকে শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা হিসাবে চিহ্নিত করেন, দৃঢ়ভাবে এদের নাকচ করেন ও সতর্কতার সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

চীনের ক্ষেত্রেও বাম সুবিধাবাদী ভুলের দরুণ প্রায় সমস্ত ঘাঁটি এলাকা এবং লাল ফৌজের এক বড় অংশকে হারাতে হয়েছিল। ফলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি লং মার্চের পথে যেতে বাধ্য হয়। মাও যখন জাপানী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চিয়াং কাই শেকের সঙ্গে যুক্তফ্রন্টের লাইন নিয়ে আসেন বাম সুবিধাবাদীরা তাঁর বিরুদ্ধেও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনেছিল।

এই সমস্ত ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরার কারণ এই যে এর থেকে প্রমাণ হয়, প্রতিটি দেশেই বিপ্লবী সংগ্রাম পর্যায়ক্রমে অগ্রগতি ও পশ্চাদপসরণের মধ্যে দিয়ে যায় এবং সেই অনুযায়ী পার্টির নীতি ও কৌশলগুলিকে পাল্টে নিতে হয়। কৌশলের তথা নেতৃত্বের দক্ষতার প্রশ্নে মার্কসবাদী ধারণার এটাই হল সারকথা। একটি পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য কৌশল ভিন্নতর পরিস্থিতিতেও প্রয়োগ করা বা পরিস্থিতি যখন পার্টির পুনর্গঠন ও শক্তিসঞ্চয়ের জন্য অপেক্ষা করার দাবি করে তখনও প্রত্যক্ষ সংগ্রামের কথা বলা মানে সোজা শত্রুর ফাঁদে পা দেওয়া।

চীনের মডেল নিয়ে শুরু করা আমাদের ক্ষেত্রে সঠিকই ছিল, কারণ এক আধা-সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক দেশে বিপ্লবের এক মডেলই আমাদের সামনে ছিল। কিন্তু গত ২৫ বছরে আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তথা ভারতীয় সমাজের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলি আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করার পর চীনা মডেলে প্রয়োজনীয় রদবদল করে ক্রমশ ভারতীয় বিপ্লবের এক ভারতীয় মডেল গড়ে তোলাই তো স্বাভাবিক। চীনা পথকেই গোঁড়াভাবে আঁকড়ে থাকা মাও চিন্তাধারার অন্তর্বস্তুকেই নাকচ করে। বহু ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও চীনে যাঁরা রাশিয়ার মডেল অন্ধভাবে অনুসরণ করে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন তাঁদের বিরুদ্ধে মাও-কে দৃঢ় সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। এই সংগ্রামের প্রক্রিয়াতেই উঠে এসেছে মার্কসবাদ-লেনিবাদের সার্বজনীন সত্যকে চীনের নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঙ্গে একাত্ম করার মাও-এর বিখ্যাত সূত্রায়ন।

অনেকেই জানেন না যে এই সমস্ত বাম সুবিধাবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই আমাদের পার্টি লাইন গড়ে উঠেছে। আর তাঁদের কাজকর্ম যেখানে ক্রমশই নিছক স্কোয়াড অ্যাকশনে অধঃপতিত হয়েছে, আমরা সেখানে কৃষক জনতার গণ বিপ্লবী আন্দোলনের পরিধি ও বিস্তার বহুগুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছি এবং আমাদের সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীর ক্রিয়াকলাপ এর এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে জনযুদ্ধ গোষ্ঠী কর্তৃক অনুসৃত নৈরাজ্যবাদী কৌশল যখন গতিরুদ্ধ, আমাদের পার্টি তখন বিপ্লবী কমিউনিস্টদের সঠিক লাইনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করার মতো দৃঢ় অবস্থায় রয়েছে। পার্টির অগ্রগতির যে নির্ণায়ক পর্যায়ের কথা আমি বলছিলাম এটি তার অপর উল্লেখযোগ্য দিক।

আমার মতে সাধারণভাবে বাম আন্দোলনের মধ্যে আমাদের প্রধান মতাদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বি হল সমাজগণতন্ত্র, যার প্রতিভূ হল সিপিআই(এম)। আর নির্দিষ্টভাবে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বা নকশালপন্থী আন্দোলনের মধ্যে আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হল নৈরাজ্যবাদ, যার প্রতিভূ হল জনযুদ্ধ গোষ্ঠী। ভারতে একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলতে গেলে এই উভয় প্রবণতার বিরুদ্ধেই মতাদর্শগত-রাজনৈতিক সংগ্রামের এক যথাযথ সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।

নির্বাচনী সংগ্রামে আমাদের কৌশল সম্পর্কে কয়েকটি কথা এখানে বলা উচিত। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে এর দরুণ আমাদের নিজেদের সংগঠনেও বেশ কিছু গুরুতর অস্বাস্থ্যকর বুর্জোয়া প্রবণতা ঢুকে পড়েছে। টিকিটের জন্য খেয়োখেয়ি, জেতার জন্য যেকোনো রকম সুবিধাবাদী আঁতাতে যোগ দেওয়া, নির্বাচিত বহু প্রতিনিধি অর্থ, যশ, বা বুর্জোয়া সুখসুবিধের জন্য লালায়িত, তাঁদের কারো কারো নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শেষ পর্যন্ত পার্টি ছেড়ে শাসক দলে যোগদান – এসব দেখে আমরা হতবাক। কমিউনিস্ট আচরণবিধি, পার্টির নীতিসমূহ, পার্টির শৃঙ্খলা সবকিছুকে নির্লজ্জভাবে বিসর্জন দেওয়া হল। এই ঘটনাগুলি পার্টির মর্যাদাকে বিরাটভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। এ থেকে বোঝা যায় যে নির্বাচনী কৌশলের গুরুত্ব পার্টি সংগঠনের গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি, পার্টি সংগঠন তার সংসদীয় শাখার ওপর পার্টি শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রশ্নে যথেষ্ট দুর্বল। ভারতের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্বাচন ও সংসদীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে পার্টিকে এখনও বহুদূর যেতে হবে। কিন্তু, বর্তমান অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে এব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ফলাফল মারাত্মক হতে পারে। নির্বাচনী মঞ্চকে কাজে লাগানোর প্রশ্নে আমি এর আগে এঙ্গেলসের উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম। এবার কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে মার্কসের বক্তব্য শোনা যাক।

“... বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক প্রার্থীদের পাশাপাশি সর্বত্র শ্রমিকদের প্রার্থীদের দাঁড় করাতে হবে। যতদূর সম্ভব লীগের সদস্যদের মধ্যে থেকে প্রার্থীদের বাছাই করতে হবে। সমস্ত উপায়ে তাঁদের নির্বাচিত করার চেষ্টা চালাতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে জয়ের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, সেখানেও নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখার, শক্তি যাচাই করার এবং জনগণের সামনে বিপ্লবী মানসিকতা ও পার্টির বক্তব্যকে তুলে ধরার জন্য শ্রমিকদের নিজেদের প্রার্থীদের দাঁড় করাতে হবে। এই প্রসঙ্গে, এর ফলে গণতান্ত্রিক দলের ভোট ভাগাভাগি হয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের জয়ের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে – গণতন্ত্রীদের এই ধরনের কথায় শ্রমিকদের ভুললে চলবে না। এইসব কথাবার্তার আসল উদ্দেশ্য শ্রমিকদের বোকা বানানো। এই স্বাধীন উদ্যোগের মাধ্যমে সর্বহারার পার্টি যে অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে তা প্রতিনিধিসভায় কয়েকজন প্রতিক্রিয়াশীল সদস্যের উপস্থিতির দরুণ সম্ভাব্য অসুবিধের চেয়ে বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” কমরেড লেনিনও নির্বাচনে বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক দলগুলির পরিপ্রেক্ষিতে এই কমিউনিস্ট কৌশলকে বারবার তুলে ধরেছেন এবং সংসদীয় ময়দানে কমিউনিস্টদের ভূমিকাকে বিপ্লবী বিরোধীপক্ষের ভূমিকা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। নিঃসন্দেহে এটাই হওয়া উচিত আমাদের সূচনাবিন্দু।

আমাদের পরিস্থিতিতে নির্বাচনী সংগ্রাম চালাতে গেলে আসন সমঝোতা, নির্বাচনী আঁতাত থেকে শুরু করে রাজ্যস্তরে সরকারে অংশগ্রহণ পর্যন্ত নানা প্রশ্ন উঠে আসবে। পার্টির নিঃশর্ত স্বাধীনতা বজায় রাখা ও বিপ্লবী গণআন্দোলনের সুযোগ ও পরিধি বিস্তৃত করার ওপর ভিত্তি করেই সবসময়ে এই ধরনের সমস্ত প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে হবে। বিপ্লব-পূর্ব চীনের মতো ভারতও একটি আধা-সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক দেশ হলেও ভারতীয় শাসকশ্রেণীগুলির ক্ষমতার কাঠামো চীনের থেকে বিরাটভাবে আলাদা, আর এই পার্থক্য ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। জাত, ধর্ম বা অঞ্চল-কেন্দ্রিক সমাবেশের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা তথা বিভিন্ন স্তরের ক্ষমতায় বহুবিচিত্র রাজনৈতিক শক্তির ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ শাসকশ্রেণীগুলির বিভিন্ন অংশ ও স্তরের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্নে সংসদীয় প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্রের তথা এই ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনেরই পরিচায়ক। এই পরিস্থিতি বিপ্লবী গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির সামনে এই ব্যবস্থার মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় ভাঙ্গন ধরানোর সুযোগও এনে দেয়। বিপ্লবী গণতন্ত্রের পক্ষে এক গণজাগরণের জন্ম দিতে এই পরিস্থিতিকে পুরোপুরি কাজে লাগানো দরকার। আমাদের আন্দোলনের বর্তমান পর্যায়ে এই কৌশলের কোনো বিকল্প নেই।

একথা বোঝা দরকার যে পার্টির নির্বাচনী কৌশল হল বিপ্লবী গণআন্দোলন গড়ে তোলার প্রশ্নে পার্টির সামগ্রিক কৌশলেরই এক অবিচ্ছদ্য অঙ্গ, ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার নয়। সুতরাং এই কৌশল সফলভাবে প্রয়োগের জন্য পার্টি একমাত্র পরীক্ষিত কমরেডদের ওপরই নির্ভর করতে পারে এবং সেটাই করা উচিত।

এক ব্যাপকতম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলা আমাদের পার্টির সামনে এক রণনৈতিক কর্তব্য। বুর্জোয় ও পেটিবুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের একাংশের সঙ্গে সাম্প্রতিককালে আমাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমরা বোধ হয় এক সংশ্লেষণের যুগের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগে সহযোগিতার ইতিহাসের আলোকে ও সোভিয়েতের পতন ও সাম্রাজ্যবাদের নতুনতর আক্রমণের পরিস্থিতিতে নতুন করে সহযোগিতার প্রয়োজনীতার ওপর জোর দিয়ে আমরা বিপ্লবী কমিউনিস্ট ও ৠাডিকাল সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে ঐক্যের এক তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি। পরিস্থিতির পরিহাসে আমাদের বাম কনফেডারেশনের আহ্বান বাম আন্দোলনে সিপিআই(এম)-এর আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। আমাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ কার্যকলাপের ক্ষেত্রে সিপিআই(এম)-এর পার্টি কংগ্রেসের দলিলে সূত্রবদ্ধ অবস্থানের পিছনে ছিল একটি আকাঙ্খা – আমাদের তরফে ‘ভুল সংশোধন’, অর্থাৎ সিপিআই(এম)-এর অবস্থান ও তার আধিপত্যের গণ্ডির কাছাকাছি আসা। পরবর্তী ঘটনাবলী তাদের এই আশাকে বাস্তবে পরিণত না করায় তারা আবার যেনতেন প্রকারেণ আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করার পুরোনো লাইনে ফিরে গেছে। আমি মনে করি মানুষ যতই তাদের মোহ ত্যাগ করে বাস্তবকে মেনে নিতে শিখবে ততই মঙ্গল। সিপিআই(এম)-এর তীব্র বিরোধিতা নিয়ে আমাদের বিশেষ বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের অগ্রগতিতে এরও একটা ইতিবাচক ভূমিকা আছে। আমাদের উড়িয়ে দেওয়ার ও বিচ্ছিন্ন করার সিপিআই(এম)-এর অতীত প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। নতুন করে সে চেষ্টা করলে তা আবারও ব্যর্থ হতে বাধ্য। ভবিষ্যতে ঘটনাপ্রবাহের নতুন মোড়ে আমাদের সম্পর্কও নতুন করে গড়ে উঠবে সমানাধিকার ও মতপার্থক্যের স্বীকৃতির ভিত্তিতে। একমাত্র সেটাই হবে এক সুস্থ ও নীতিনিষ্ঠ ঐক্য। এই ধরনের পরিবর্তন আনার জন্য আমাদের ধৈর্যসহকারে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে কিছু কথা। সোভিয়েত ব্লকের পতন ও চীনে সুদূরপ্রসারী কিছু পরিবর্তন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমগ্র প্রেক্ষাপটই বিরাটভাবে বদলে দিয়েছে। ষাটের দশকের মহাবিতর্কের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা সোভিয়েতপন্থী ও চীনপন্থী পার্টিগুলির পুরোনো বিভাজন আজ অচল হয়ে পড়েছে। সোভিয়েতের পতন অবশ্য রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের অন্য কয়েকটি দেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট মঞ্চগুলির মধ্যে কিছু পুনর্বিন্যাসের জন্ম দিয়েছে। এই পার্টিগুলি নিজেদের অতীতের, বিশেষত সংশোধনবাদের ক্ষতিকর প্রভাবের পুনর্মূল্যায়ন করছে। অন্যদিকে, ১৯৬৮-৭০-এর ঝোড়ো দিনগুলিতে সারা দুনিয়া জুড়ে আত্মপ্রকাশ করা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলির মধ্যে যারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পেরেছে, তারাও এককালে যেসব অতিবাম বিচ্যুতির শিকার হয়েছিল সেগুলি বিশ্লেষণ করছে। এর ফলে উভয় ধারার পার্টিগুলির কাছাকাছি আসার অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। ওয়ার্কার্স পার্টি অফ বেলজিয়ামের উদ্যোগে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সেমিনারের মধ্যে এই নির্দিষ্ট প্রবণতারই প্রতিফলন দেখা যায়। এই সেমিনারে অতীতের এই দুই ধারা তথা ‘স্বাধীন’ ধারার প্রায় ৫০টি পার্টি ও গোষ্ঠী অংশ নেয়। আমাদের পার্টিও সেখানে অংশগ্রহণ করে এবং কাছাকাছি আসার এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

আমরা মনে করি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে ঐক্যের প্রশ্নকে নিছক মাও চিন্তাধারার অনুগামী মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলির ঐক্যের ধারণায় পরিণত করা অত্যন্ত সংকীর্ণ চিন্তার পরিচায়ক এবং আজকের পরিস্থিতিতে নিতান্তই অচল।

আমার মনে হয় চীন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আরেকবার স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার, কারণ এটি বহু বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়ে চলেছে। আমাদের মতে, সমাজতন্ত্র গঠনের প্রশ্নটি সংশ্লিষ্ট দেশের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও নির্দিষ্ট যুগের থেকে বিচ্ছিন্ন ও বিমূর্তভাবে দেখা উচিত নয়। ছোটোখাটো কয়েকটি সমাজতান্ত্রিক দেশ ছাড়া আর কোথাও সমাজতন্ত্র যখন টিকে নেই, দীর্ঘকালের মধ্যে কোনো উন্নত পুঁজিবাদী দেশে সর্বহারা বিপ্লবের সম্ভাবনা যখন সুদূরপরাহত এমন এক পরিস্থিতিতে চীনের মতো একটি পশ্চাদপদ দেশে সমাজতন্ত্র গঠন একটি বিশেষ সমস্যা। সুতরাং সাধারণভাবে সমাজতন্ত্র গঠনের প্রশ্নটি আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত নয়। বরং আজকের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চীনে সমাজতন্ত্র গঠনের প্রশ্নটিই কোনো অর্থবহ আলোচনার সূচনা করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই চীনা সংস্কারগুলির সাধারণ দিশাকে আমাদের গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বা চীন সরকারের সমস্ত পদক্ষেপকে সমর্থন করার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। সাধারণ দিশাকে সমর্থন করার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিগুলির সম্পর্কে দুশ্চিন্তা ও যে সমস্ত নীতিগুলিকে আমরা সমাজতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাধারণ স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করি নিঃসন্দেহে সেগুলির সমালোচনাও নিহিত রয়েছে।

আমরা কোনো চীন-কেন্দ্রিক বা সিপিসি-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট ব্লক গঠনের পক্ষপাতী নই। আবার চীনের নিন্দা করাই যাদের প্রধান উদ্দেশ্য এমন কোনো আন্তর্জাতিক গঠনেও আমরা যোগ দিতে আগ্রহী নই। আমার মনে হয় এটাই চীন তথা আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা।

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যখন মার্কসবাদের প্রায় সমস্ত বুনিয়াদী ধারণা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন এবং ইতিহাসের অবসান দাবি করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে দর্শনের দারিদ্র্য গ্রন্থে মার্কসের একটি কথা। “তাঁরা যখন বলেন যে বর্তমান সম্পর্কই – বুর্জোয়া উৎপাদন সম্পর্কগুচ্ছ – স্বাভাবিক, অর্থনীতিবিদরা বোঝাতে চান যে এর অধীনে সম্পদ সৃষ্টি হয় এবং উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটে প্রাকৃতিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে। অর্থাৎ এই সম্পর্কগুচ্ছ যুগনিরপেক্ষ প্রাকৃতিক নিয়ম। এগুলিই সমাজের চিরন্তন নিয়ম। এইভাবে এককালে ইতিহাস ছিল, আজ আর নেই।”

অর্থাৎ বুর্জোয়া দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদেরা বহুদিন আগেই ইতিহাসের অবসান ঘোষণা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ইতিহাস এগিয়েছে এবং এই অগ্রগতিতে মার্কসবাদ পথনির্দেশক ভূমিকা নিয়েছে। মার্কস বুর্জোয়া সম্পর্কগুচ্ছের চিন্তন চরিত্রকেই চ্যালেঞ্জ করেন এবং এক বৈজ্ঞানিকের বিরল অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে তিনি দেখান যে অতীতের সম্পর্কগুলির মতোই এগুলিও উত্তরণশীল চরিত্রের। পরিবর্তনই শাশ্বত, এটাই হল মার্কসীয় দর্শনের মর্মবস্তু। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে দুনিয়াকে পাল্টানোর যে কোনো ভবিষ্যত প্রচেষ্টা মার্কসবাদের কাছ থেকে প্রাণশক্তি আহরণ করবে। মার্কস তাঁর মহান সৃষ্টি পুঁজি-তে বুর্জোয়া উৎপাদন সম্পর্কের শোষণধর্মী চরিত্র উন্মোচন করেন। মজুরি, শ্রম ও পুঁজি-তে তিনি বলেন, “শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতিতে, পুঁজির সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধির সময়েও, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান যতই উন্নত হোক না কেন, তাঁদের ও বুর্জোয়া পুঁজিপতিদের স্বার্থের মধ্যেকার বৈরিত্য দূর হয় না। মুনাফা ও মজুরি আগের মতোই বিপরীত অনুপাতেই থেকে যায়।

“পুঁজির যদি দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে তাহলে মজুরিও বাড়তে পারে, কিন্তু পুঁজির মুনাফা বহুগুণ দ্রুতহারে বৃদ্ধি পায়। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়, কিন্তু তা হয় তাঁদের সামাজিক মর্যাদার অবনতির মূল্যে। তাঁদের ও পুঁজিপতিদের মধ্যে সামাজিক ব্যবধান বেড়েই যায়।”

উৎপাদনের কাঠামো ও গঠনে বহু পরিবর্তন সত্ত্বেও বুর্জোয়া উৎপাদন সম্পর্কে শোষণের ভিত্তি, অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণ, অটুট থেকে গেছে। বরং আন্তর্জাতিক স্তরে সাম্রাজ্যবাদ ও নির্ভরশীল দেশগুলির মধ্যে ও উন্নত পুঁজিবাদী দুনিয়ায় সর্বহারা ও বুর্জোয়াদের মধ্যে সামাজিক ব্যবধান আরও বেড়েই গেছে। সুতরাং বেড়েছে এই দুইয়ের বৈরিতা, আর এটাই হল সেই চালিকাশক্তি যা ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে চলে।

তবু সর্বহারা সংগ্রাম ধাক্কার মুখে পড়েছে। পৃথিবীর এক বিরাট অংশে সমাজতন্ত্র পিছু হটেছে। সুতরাং নিছক মার্কসবাদের ওপর, সর্বহারার বিজয়ের ওপর আস্থা পুনর্ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। মার্কসবাদকে আজ তুলে ধরা সম্ভব কেবল তাকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমেই।

মার্কসের পুঁজি-র ভিত্তি ছিল ব্রিটিশ পুঁজিবাদের, সবচেয়ে আদর্শ পুঁজিবাদী বিকাশের অধ্যয়ন। কিন্তু সেই অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ শেষ হতে না হতেই অবাধ প্রতিযোগিতার জায়গায় একচেটিয়া কারবারগুলি আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। লগ্নি পুঁজি তথা একচেটিয়া পুঁজিবাদের পর্যায়ে দেশের ভিতরে প্রতিযোগিতার স্থান নেয় বিশ্ব বাজারের জন্য পুঁজিবাদী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এইভাবে আত্মপ্রকাশ করে বিশ্বযুদ্ধগুলো, ঘটে সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খল তার দুর্বলতম স্থানে ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনা। এবং পরবর্তীকালে, আমেরিকার নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের একটি একক অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক জোটের আত্মপ্রকাশ তথা দীর্ঘ ঠাণ্ডা লড়াইয়ে সমাজতন্ত্রের পরাজয় ও পতন।

একদিকে যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদী উৎপাদনের কাঠামোয় পরিবর্তন ঘটে চলেছে অন্যদিকে তখনই সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির প্রায় অচলাবস্থা বিশ্বজুড়ে মার্কসবাদী তাত্ত্বিকদের সামনে অধ্যয়ন ও গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কমিউনিস্টদের হাতে রয়েছে পঁচাত্তর বছরেরও বেশিদিন ধরে সমাজতন্ত্র গঠনের অভিজ্ঞতা। মানুষ তার ভুল থেকেই শিক্ষা নেয়। সুতরাং আমি যে অধ্যয়নের কথা বলেছি সেটিকে বস্তুত হতে হবে সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক অর্থনীতির এমন এক গভীর অধ্যয়ন যা মাত্রায় একমাত্র মার্কসবাদের পুঁজি-র সঙ্গেই তুলনীয়।

টীকা

(১) ৩১ মে, ১৯৯৩ পশ্চিমবাংলায় বর্ধমান জেলার এই গ্রামে সিপিআই(এম) থেকে আমাদের দিকে আসা ৬ জন পার্টি কমরেডকে – যারা সকলেই কৃষিশ্রমিক – সিপিআই(এম) গুণ্ডারা নৃশংসভাবে খুন করে। অন্ততপক্ষে ৩০ জন গুরুতরভাবে জখম হয় এবং সমগ্র গরিব পাড়াটিকে ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়।

(লিবারেশন, অক্টোবর ১৯৯১ থেকে)

রণনীতীগত পরিপ্রেক্ষিত

আইপিএফ অথবা কমিউনিস্ট পার্টি? আমাদের পার্টির অভ্যন্তরে ও বাইরে বহুল চর্চিত এই প্রশ্নটি দিয়েই শুরু করা যাক। কিছু কমরেড মনে করেন, পার্টি যখন গোপন কাজ করত তখন তার আইনি পরিকাঠামো হিসাবে আইপিএফ-এর তাৎপর্য ছিল। কিন্তু পার্টি ধাপে ধাপে অধিকতর খোলামেলা কাজের দিকে এগোনোর ফলে একটি স্বতন্ত্র আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। সিপিআই(এম)-এর তাত্ত্বিক নেতা প্রকাশ কারাত আমাদের সঙ্গে বিতর্কে সেই একই প্রশ্নের অবতারণা করেছেন : “সিপিাই(এমএল) ও আইপিএফ-এর মধ্যে ভবিষ্যৎ আন্তঃসম্পর্কের বিষয়টি জট পাকানো। সিপিআই(এমএল) যেহেতু খোলা পার্টি হয়ে আইনি কার্জকর্মের দিকেই এগোচ্ছ এবং সিপিআই(এমএল)-ই যেহেতু আইপিএফ-এর নেতৃত্বকারী শক্তি ও অগ্রবাহিনী, তাই কী উদ্দেশ্যে আইপিএফ-কে টিকিয়ে রাখা হবে।”[১০]

অন্য আর একটি অভিমতের সঙ্গে আমরা সুপরিচিত এবং তাঁদের দাবি পার্টির সমস্ত ব্যবহারিক কাজকর্মই যেহেতু হচ্ছে আইপিএফ-এর মাধ্যমে, তাই পার্টিকে ভেঙ্গে দিতে হবে।

আমাদের পার্টি ধারাবাহিকভাবেই বলে এসেছে যে পার্টি ও আইপিএফ – উভয়ই প্রয়োজনীয়। বিচার্য বিষয় হল উভয়ের কাজের মধ্যে ফারাক কী থাকবে এবং কাজের সমন্বয়ই বা হবে কীভাবে।

একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। কমিউনিস্ট পার্টি হিসাবে আমাদের কাজ হল শহুরে ও গ্রামীণ সর্বহারাদের সংগঠিত করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা করা। জনপ্রিয় ভাষায় বলতে গেলে, তা হল পুঁজির শাসনের অবসান ঘটানো ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা। সবক্ষেত্রেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর অতিক্রম করে যেতে হবে এবং আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লব যেহেতু অসমান্ত ও অমীমাংসিত, তাই তার সমাধার উপরই আমাদের সর্বাধিক মনোনিবেশ করতে হবে। বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের সাম্প্রতিক বিপর্যয় প্রমাণ করেছে যে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কাজগুলিকে পাশ কাটিয়ে সমাজতন্ত্র গঠনের তাড়াহুড়ো আমাদের কোনো বাড়তি সুবিধা এনে দেয় না।

ভারতবর্ষে পুঁজি তার আধুনিক শিল্পীয় রূপে কিছু পরিমাণে বিকাশ লাভ করেছে এবং কৃষিতে তার অনুপ্রবেশ যথেষ্ট। শ্রমের শোষণ প্রায়শই পুঁজিবাদী রূপ গ্রহণ করে। সংবিধান, প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদ এবং বিচারব্যবস্থা – বুর্জোয়া গণতন্ত্রের আধুনিক সমস্ত প্রতিষ্ঠানই এখানে রয়েছে। অনেকেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ডাক দেওয়ার প্রলোভন সংযত করতে পারবেন না। কিন্তু এটি বিষয়টির একটি দিক মাত্র।

অন্যদিকে রয়েছে মধ্যযুগীয় অবশেষ, সামন্ততান্ত্রিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, প্রতিক্রিয়াশীল ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতি ব্যবস্থা, ধর্মীয় মৌলবাদ। এককথায় পুরোনো ব্যবস্থার লক্ষণসমূহ। তাছাড়া রয়েছে এই ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত অত্যন্ত শক্তিশালী আমলাতন্ত্র, আর এসবই পুঁজিবাদী শোষণের সঙ্গে একাকার হয়ে আছে। পক্ষান্তরে পুঁজি এক বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু ভারতবর্ষের পুঁজি গাঁটছড়া বেঁধে রয়েছে পুরোনো সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির সঙ্গে।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির উপর ভারতীয় পুঁজির মাত্রাধিক নির্ভরতা হল ভারতীয় পুঁজির আর একটি বৈশিষ্ট্যমূলক দিক।

ভারতবর্ষে সমস্ত আধুনিক বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানই তৃণমূলে তামাশা হয়ে দাঁড়ায়। গোটা পরিবেশই শ্রেণী সচেতনতার বিকাশকে প্রচণ্ডভাবে অবরুদ্ধ করে এবং সমস্ত স্তরের জনগণের মধ্যেই রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশকে ব্যাহত করে। ফলে এমনকি শহুরে ও গ্রামীণ সর্বহারাকে সংগঠিত করা ও কমিউনিস্ট ধারায় তাদের সংহতি গড়ে তোলা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ গণতান্ত্রিক দাবিগুলি পূরণ করা ও গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা করা ব্যতীত সমাজতন্ত্রের জন্য প্রকৃত কোনো সংগ্রামে নামা সম্ভব নয়। আর বুর্জোয়া শ্রেণীর কোনো অংশের পক্ষেই যেহেতু গণতন্ত্রের জন্য এই সংগ্রামে সম্পূর্ণরূপে ও দৃঢ়ভাবে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়, তাই এই সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া সর্বহারা ও তার পার্টি কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক কর্তব্য। দীর্ঘস্থায়ী এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি সমাজতন্ত্রের জন্য চূড়ান্ত সংগ্রামের শর্তাবলী সৃষ্টি করে ও সুগম করে তোলে।

ইউরোপের মধ্যে সর্বাপেক্ষা পশ্চাদপদ ও মূলত আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশ রাশিয়ায় লেনিন বারংবার এই বিষয়টির উপর জোর দিয়েছিলেন এবং শ্রমিক ও কৃষকের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের ধারণাকে সূত্রবদ্ধ করেছিলেন। আধা-সামন্ততান্ত্রিক চীনে মাও এই লেনিনীয় তত্ত্বের সফল রূপায়ন করেন। তিনি চারটি শ্রেণীর (যথা শ্রমিক, কৃষক, পেটিবুর্জোয়া ও জাতীয় বুর্জোয়া) একনায়কত্বের ধারণা সামনে নিয়ে আসেন এবং এর নামকরণ করেন নয়া গণতন্ত্র।

উপরের আলোচনা থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। প্রথমত স্বাধীন ও দৃঢ় নীতিনিষ্ঠ একটি কমিউনিস্ট পার্টির আমাদের প্রয়োজন, যে পার্টি সমাজতন্ত্রের বিজয়ের জন্য একমাত্র প্রতিশ্রুতিই নয়, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয়ের জন্যও অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রের গুরুত্ব সম্পর্কে আমাদের বিস্মৃত হলে চলবে না, এবং যে কারুর চেয়ে বেশি জোরের সাথে আগে গণতন্ত্রের পতাকা তুলে ধরতে হবে। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, প্রতিক্রিয়াশীল জাতি ব্যবস্থা, ধর্মীয় মৌলবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে সংক্ষেপে পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিপ্লবী গণতন্ত্রের সমস্ত শক্তিগুলির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা সবসময়েই চালাতে হবে।

বিপ্লবী গণতান্ত্রিক শক্তি বলতে আমরা বুঝি সেই সমস্ত শক্তিকে যারা কমিউনিস্ট পার্টির গণতান্ত্রিক কর্মসূচিকে স্বীকার করে এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে দৃঢ় ও সক্রিয় কিন্তু কমিউনিস্ট শ্রেণী-চেতনার অভাব আছে। এই শক্তিগুলি বিবিধ চরিত্রের এবং তারা সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের বিভিন্ন উত্তরণের পর্যায়ে থাকে। শুরুতে, বিভিন্ন অ-পার্টি রূপে তাদের আবির্ভাব ঘটে, অথবা তাঁরা কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের ভিতরে প্রেসার-গ্রুপ হিসাবে কাজ করে। তাদের বিপ্লবী গণতন্ত্রী হিসাবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কমিউনিস্ট পার্টির গণতান্ত্রিক কর্মসূচির স্বীকৃতির বিষয়টিকে নিছক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসাবে বুঝলে চলবে না বরং তাদের সঙ্গে চুক্তি একটি অলিখিত সংগ্রামী চুক্তিই হতে পারে। আমাদের কর্তব্য হল এই সব শক্তিগুলিকে চিহ্নিত করা, বিপ্লবী গণতন্ত্রী হিসাবে তাদের বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করা এবং তাদের সাথে সংগ্রামী ঐক্য গড়ে তোলা।

আইপিএফ হল আমাদের পার্টির ঐ প্রয়াসের প্রতীক। তাছাড়া আইপিএফ শুধুমাত্র আমাদের পার্টি কর্তৃক যান্ত্রিকভাবে গড়ে তোলা একটি সংগঠনই নয়, তা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে থেকেই বেড়ে উঠেছে এবং এক বিশিষ্ট চরিত্র গ্রহণ করেছে।

আমাদের দেশের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিপ্লবী গণতন্ত্রীদের দ্বারা একটি স্বতন্ত্র সংগঠিত গণতান্ত্রিক পার্টি গড়ে তোলার কোনো প্রচেষ্টাই এযাবৎ ফলদায়ক হয়নি। একটি অ-পার্টি রাজনৈতিক সংগঠন নিয়ে স্বামী অগ্নিবেশের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চাষিদের সংগঠনগুলির একটি জাতীয় সমন্বয় মঞ্চ এবং এমনকি ডিপিএফ-এর আবির্ভাব – এসবই আমরা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে নিরীক্ষণ করেছি। তাদের মধ্যে কেউই এমন একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক পার্টিতে বিকাশলাভ করতে পারেনি যাদের সঙ্গে আমরা একটি সংগ্রামী ঐক্য গড়ে তুলতে পারতাম, আর বিপ্লবী ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মধ্যে দোদুল্যমান এই শক্তিগুলি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনতা দলের বিভিন্ন উপদলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বেশ ভালো সংখ্যক বিপ্লবী গণতন্ত্রী আইপিএফ-এ যোগ দেন এবং আইপিএফ হয়ে দাঁড়ায় কমিউনিস্ট পার্টি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে আসা অ-পার্টি গণতন্ত্রীদের এক সম্মিলিত ফ্রন্ট। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে আইপিএফ যদি তার কর্মসূচি ও কর্মতৎপরতার প্রতি অবিচল থাকে তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে বিশেষত জনতা দল থেকে গণতন্ত্রীদের নতুন স্রোত আইপিএফ-এ যোগ দেবে। পরবর্তী স্তরে আইপিএফ-কে তার স্লোগানগুলি পুনর্বিন্যাস করতে হবে, অধিকতর নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে এবং তার সামাজিক ভিত্তিকে প্রসারিত করার জন্য তার কর্মসূচি ও কাঠামোয় প্রয়োজনীয় বিন্যাস ঘটাতে হবে। তার বিকাশের প্রক্রিয়ায় এসবই অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ অবশ্যই উজ্জ্বল।

দুই কৌশলের সংগ্রাম

প্রথমেই স্পষ্ট করে বলে নেওয়া যাক যে নকশালবাদ কোনো বিশেষ ধারা নয়, আর সেভাবে একে গড়ে তোলার কোনো অভিপ্রায়ও আমাদের নেই। সমগ্র বুর্জোয়া প্রচার এবং সিপিআই(এম)-এর প্রচারও নকশালবাদকে একটি বিশেষ, ভারতের মূলধারার আন্দোলন থেকে বিজাতীয় ‘নয়া বাম’-বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি ধারা হিসাবেই চিত্রিত করে। যেহেতু ১৯৭০ দশকে নকশালবাদ এক জনপ্রিয় বিপ্লবী আন্দোলন হিসাবে বিকাশলাভ করে তাই স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন পেটিবুর্জোয়া ধারাগুলি এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় এবং তাদের কেউ কেউ একে এক বিশেষ ‘নয়া বাম’ ধারায় রূপান্তরিত করার চেষ্টা চালায়। ধাক্কা ও অজস্র ভাঙ্গনের একটি পর্যায়ের পর এই পেটি বুর্জোয়া ধারাগুলি অবশেষে পৃথক হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে নৈরাজ্যবাদে পরিণতি লাভ করে, আর আন্দোলনের মূল অংশটি ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিপ্লবী ধারা হিসাবে পুনরায় তার অস্তিত্ব ঘোষণা করতে সমর্থ হয়।

প্রতিটি দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনই, অন্ততপক্ষে বিপ্লব সমাধা হওয়ার আগে পর্যন্ত, সবসময়েই বিপ্লবী ও সুবিধাবাদী ধারায় বিভক্ত হয়ে থাকে, আর ভারতবর্ষও তার ব্যতিক্রম হতে পারে না।

আমাদের প্রথম পর্যায়ের সমগ্র নেতৃত্ব সাধারণভাবে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে কৌশলগত দুই লাইনের দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম এবং বিশেষভাবে সিপিআই(এম)-এর সঙ্গে সংগ্রামের মধ্য থেকে উঠে এসেছিলেন। আমাদের পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কমরেড চারু মজুমদার বারবার বলেছেন, যে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে কমিউনিস্টরা পুন্নাপ্রা ভায়লার, তেভাগা ও তেলেঙ্গানায় বীরত্বপূর্ণ লড়াই করেছেন এবং শহীদত্ব বরণ করেছেন, আমরা সেই কমিউনিস্ট পার্টির উত্তরাধিকারী।

‘নয়া বাম’ বলে আমাদের যতই অস্বীকার করা হোক না কেন, ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের সুবিধাবাদী ধারার, যার প্রতিনিধিত্ব করছে সিপিআই(এম), বিপরীতে আমরা সবসময়ই বিপ্লবী ধারা হিসাবে ছিলাম, এবং ভবিষ্যতেও থাকব।

কিছু কিছু ব্যক্তি আমাদের ছেড়ে গেছেন এবং ভবিষ্যতেও ঐ ধরনের দলত্যাগের ঘটনা আমরা উড়িতে দিতে পারি না। কিন্তু যে ধারার আমরা প্রতিনিধিত্ব করি তাকে ধ্বংস করা যাবে না, কেননা ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ৭০ বছরের ইতিহাসের গভীরে তার শিকড় প্রোথিত এবং বিপ্লবী সমাধানের জন্য দাবি জানাচ্ছে যে বাস্তব পরিস্থিতি, তা ঐ ধারাকে আরও শক্তিশালী করছে।

মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। সিপিআই(এম)-এর কৌশলগত লাইন তিনটি উপাদান নিয়ে গঠিত, যে উপাদানগুলিকে নেতৃত্ব যান্ত্রিকভাবে একটি সমগ্রে মেলাতে সচেষ্ট।

প্রথমত, পশ্চিমবাংলার বামফ্রন্ট সরকারকে দেশের সর্বাপেক্ষা উন্নত বাম সংগঠন এবং এই মডেলের সৃষ্টি ও স্থায়িত্বকে প্রধান সাফল্য বলে মনে করা হয়।

দ্বিতীয়ত, কংগ্রেস(ই)-র প্রত্যাবর্তনকে রোখা ও বিজেপির সাম্প্রদায়িক চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করার জন্য বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির, অর্থাৎ জনতা দল ও ন্যাশনাল ফ্রন্ট-এর ব্যাপক ঐক্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

তৃতীয়ত, জাতীয় ঐক্যকে রক্ষা করাই বামেদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে বিবেচনা করা হয় এবং এই অছিলায় কংগ্রেস(ই) ও বিজেপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অলিখিত সমঝোতায় পৌঁছানো হয়।

সিপিআই(এম)-এর কৌশলগত লাইনকে কী দিয়ে বিচার করব? প্রধান সাফল্য অথবা অগ্রাধিকার অথবা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভিত্তিতে? আসুন প্রকাশ কারাতের সাহায্য নেওয়া যাক।

তিনি বলেছেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ মঞ্চে বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের অধিকাংশ দলগুলিকে সমাবেশিত করা, যে মঞ্চ রাজনৈতিক জোট গঠনে সাহায্য করবে এবং ঐ জোট বিরোধীপক্ষের মধ্যে ফাটল ধরানোর কংগ্রেস(ই)-র কূটকৌশলের মোকাবিলা করবে এবং বিজেপি-বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পিছনে সাম্প্রদায়িক সমাবেশের গুরুতর বিপদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে – এই সন্ধিক্ষণে সিপিআই(এম) ঐ কাজে সফল কিনা তার ভিত্তিতেই সিপিআই(এম)-এর কৌশলগত লাইনকে বিচার করতে হবে।’ ১৯৯০-এর অক্টোবরের আগেই প্রকাশ[১১] ঐ কথা লিখেছেন। যেহেতু বিষয়টি বর্তমান আলোচনার পরিধির বাইরে, তাই প্রকাশের ঐ রচনার পর থেকে ঐ লাইনের সাফল্য অথবা বিপরীতকে বিচার করার প্রলোভন আমরা সম্বরণ করব।

সোজা কথায় বলতে গেলে, প্রকাশ যা বলেছেন এবং সিপিআই(এম) যা বিশ্বাস করে তা হল বিজেপির সাম্প্রদায়িক বিপদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের দলগুলির উপর চাপ সৃষ্টি করাই বর্তমান সন্ধিক্ষণে বামেদের প্রধান কৌশল। মঞ্চটি মূলত যদি ধর্মনিরপেক্ষ হয় এবং বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষকে যদি মূলত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি হিসাবে বর্ণনা করা হয়, তবে এটা স্পষ্ট যে সমগ্র সমাবেশটিই বিজেপি যে সাম্প্রদায়িকতার প্রতিনিধিত্ব করে তার বিরুদ্ধেই পরিচালিত। কংগ্রেস(ই)-কে যেহেতু সাম্প্রদায়িক দল হিসাবে বিবেচনা করা হয় না তাই এই কৌশলের যুক্তিযুক্ত সম্প্রসারণ হবে কংগ্রেস(ই)-কে অথবা অন্ততপক্ষে তার একটি শক্তিশালী অংশকে অন্তর্ভূক্ত করে ধর্মনিরপেক্ষ মঞ্চটির বিস্তার ঘটाনো।

রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় বর্তমান মুহূর্তে তাঁরা ঠিক এটিই করছেন। সমগ্র কৌশল যে রণনীতিগত উপলব্ধি থেকে উদ্ভূত হচ্ছে তা হল, ভারতবর্ষ যেহেতু বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে রয়েছে তাই এটি স্পষ্ট যে মৌলবাদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামিবাদের প্রাচীন শক্তিগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রামে বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষকেই নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসতে হবে। বামেরা দুর্বল এবং এই সন্ধিক্ষণে দুর্বল থাকাই তাঁদের নিয়তি এবং খুব বেশি হলে তারা যা করতে পারেন তা হল এগিয়ে যাওয়ার জন্য বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করা। গুরুত্বপূর্ণ হিন্দিবলয়ে পার্টি জনতা দলের লেজুড়বৃত্তি করেই অগ্রগতির কথা ভাবতে পারে, এবং অন্ধ্রে তেলেগু দেশম ও তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-র সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি করা হয়। ভারতবর্ষে তার ভাগ্য এইভাবে বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের উত্থান-পতনের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, ত্রিপুরা বাদে – যেখানে কোনো বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষ নেই বললেই চলে। মজার কথা হল, কয়েক দশক ধরে বামপন্থার স্বাধীন আত্মঘোষণা ও শক্তিশালী গণআন্দোলনের প্রক্রিয়াতেই কমিউনিস্টদের ঐতিহ্যবাহী এই শক্তিশালী দুর্গগুলি তৈরি হয়েছিল।

সিপিআই(এম) ও তার ছোটো ভাই সিপিআই সব সময়ই আমাদের এই বলে নিন্দা করে যে আমরা কংগ্রেস(ই) ও বিজেপির বিপদকে ছোটো করে দেখি। ঘটনা হল যে, সিপিআই(এমএল) তার সমগ্র ইতিহাসে, বিজেপি অথবা কংগ্রেস(ই)-র সাথে কখনই খোলা অথবা গোপন কোনো চুক্তি করেনি। ঐ ধরনের চুক্তির ‘কৃতিত্ব’ সিপিআই ও সিপিআই(এম)-এর মতো বামেদেরই প্রাপ্য। আর সেই জন্য সঠিকভাবেই তাঁদের ‘সুবিধাবাদী’ বলে অভিহিত করা হয়। জনতা দলের পিছু পিছু চলার তাঁদের কৌশলের যথার্থতা প্রমাণের লক্ষ্যেই আমাদের বিরুদ্ধে ঐ বিপদকে ছোটো করে দেখার অভিযোগ আনা হয়। একইভাবে আমাদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করা হয় যে আমরা জাতীয় ঐক্যের প্রতি বিপদকে ছোটো করে দেখেছি। এটিও আবার কংগ্রেস(ই) ও বিজেপির সঙ্গে তাঁদের সমঝোতার যৌক্তিকতা প্রমাণের প্রয়াস। আমাদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ যে বিভিন্ন বর্ণের বুর্জোয়া দলগুলির মধ্যে পার্থক্য করি না এবং একটি একক প্রতিক্রিয়াশীল সমষ্টি হিসাবেই তাদের দেখি। নিজেদের লেজুড়বৃত্তিকে ঢাকার উদ্দেশ্যেই এই সমস্ত কুৎসামূলক অভিযোগের অবতারণা।

১৯৮৯-র নভেম্বরে ভি পি সরকার যখন আস্থা ভোট চায়, সংসদে আমাদের একমাত্র প্রতিনিধি ভোটদানে বিরত থাকেন, তা মূলত এই কারণে যে ঐ সরকার বিজেপির সমর্থনে দাঁড়িয়েছিল। কংগ্রেস(ই)-বিজেপি জোটের কাছ থেকে যখন ঐ সরকারের বিপদ এলো ঐ একই সদস্য তখন সরকারের পক্ষে ভোট দিলেন। কংগ্রেস(ই)-বিজেপি বিরোধিতার মুখে আমরা বিহারের লালু সরকারকে সমর্থন করেছিলাম, তা করেছিলাম নীতিগত দিক থেকে, প্রকাশের অভিযোগ মতো বাধ্য হয়ে নয়। এই সংসদেও আমাদের একমাত্র সাংসদ কংগ্রেস(ই) সরকারের আস্থা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।

বুর্জোয়া দলগুলির মধ্যে আমরা অবশ্যই পার্থক্য করি আর তাই কংগ্রেস(ই) ও বিজেপির বিরুদ্ধে জনতা দলের মতো দলের সঙ্গে যৌথ আন্দোলনে অংশ নিয়েছি।

বিষয়টি হল যে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের শক্তিগুলির মধ্যে আমরা আরও একটি পার্থক্য করি, অর্থাৎ উদারনৈতিক ও বিপ্লবী গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্যকরণ। বিপ্লবী গণতন্ত্রের শক্তিগুলিকে আমরা সমস্ত ধরনের উদারনীতিবাদী মোহ থেকে মুক্ত করে বিপ্লবী শিবিরের দিকে জয় করে নিয়ে আসার চেষ্টা করি। বিপ্লবী ও সুবিধাবাদী কৌশলগত লাইনের মধ্যে স্বাধীন বাম অগ্রগতি এবং বুর্জোয়া বিরোধী দলগুলির অধিকাংশকে ধর্মনিরপেক্ষ মঞ্চে তথাকথিত সমাবেশিত করার নীতির মধ্যে, গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সর্বহারা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা ও বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের পিছন পিছন চলার প্রচেষ্টার মধ্যে এই হল মূল পার্থক্য। এই দুই লাইনের সংগ্রামই ভারতীয় বিপ্লবের ফলাফল নির্ধারণ করবে এবং হিন্দি বলয়ই ঐ বিতর্ক সমাধানের আদর্শ ক্ষেত্র। দুই কৌশল সম্পর্কে লেনিন যা বলেছেন তা দিয়ে রাজনৈতিক কৌশলের উপর এই বিতর্কের ইতি টানা যাক ...।

“বুর্জোয়াদের কোন অংশগুলি সর্বাহারার সাথে মিলে রাশিয়ার বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব শেষপর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারে, এটা বুঝতে না পারাই সামগ্রিকভাবে মেনশেভিকবাদের মূল ভ্রান্তি। বুর্জোয়া বিপ্লব করতে হবে “বুর্জোয়াদেরই” (“বর্ণ” নিরপেক্ষ সাধারণভাবে বুর্জোয়া শ্রেণী) আর সর্বহারা শ্রেণীর কাজ হবে তাকে সাহায্য করা – এই জাতীয় চিন্তা আজও মেনশেভিকদের বিপথে চালিত করছে। ... বলশেভিকরা বলে এসেছে এবং আজও বলে যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে (যতদিন না সেই বিপ্লব জয়ী হচ্ছে) সর্বহারার একমাত্র দৃঢ় ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হল কৃষক। কৃষকরাও হচ্ছে “বুর্জোয়া শ্রেণী,” কিন্তু কাডেট বা অক্টোবরবাদীদের চেয়ে “বর্ণে” সম্পূর্ণ আলাদা। ... জমিদার সত্তার খোদ বনিয়াদের বিরুদ্ধে এবং তার সাথে যুক্ত পুরাতন রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামতে এই বুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা হলেন বিপ্লবী গণতন্ত্রী।” (কমরেড প্লেখানভ সমাজগণতান্ত্রিক কৌশলের প্রশ্নে কেমনভাবে বিতর্ক করেন রচনা থেকে।)

আমাদের কর্মীদের মধ্য থেকে যে কোনো বুর্জোয়া দলের সঙ্গে কোনোরকম জোট বাঁধার প্রধান বিরোধিতা যে যুক্তি নিয়ে হাজির হয় তা হল, কমিউনিস্ট হিসাবে সমস্ত বুর্জোয়া দলগুলিকেই উন্মোচিত করা আমাদের মৌলিক কর্তব্য; কাজেই তাদের কারো সাথেই কোনোরকম এমনকি সাময়িক জোটও বাঁধি কী করে। লেনিনকে পুনরায় উদ্ধৃত করা যাক, “সমস্ত দেশে এবং সব সময়েই সকল বুর্জোয়া দলগুলিকে উন্মোচিত করা সমাজতন্ত্রীদের কর্তব্য। বুর্জোয়া বিপ্লবের কালে ‘সমস্ত বুর্জোয়া দলগুলিকে উন্মোচিত কর’ বলার অর্থ কিছুই না বলা, এবং অবশ্যই অসত্য বলা, কেন না নির্দিষ্ট বুর্জোয়া দলগুলি যখন ইতিহাসের পুরোভূমিতে প্রবেশ করে, কেবলমাত্র তখনই তাদের আন্তরিক ও সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত করা যায়।” (কমরেড প্লেখানভ সমাজগণতান্ত্রিক কৌশলের প্রশ্নে কেমনভাবে বিতর্ক করেন রচনা থেকে)

উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক দলগুলি সম্পর্কে আমাদের কৌশল

উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মতো রাজ্যগুলিতে ঐতিহাসিকভাবে সমাজবাদী ধারার শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল। সময়ের ধারায় এবং রাজনৈতিক স্রোতের সঙ্গে সংমিশ্রণের জটিল প্রক্রিয়ায় এখন তা জনতা দলের রূপ পেয়েছে এবং কৃষক জাতিগুলির মধ্যে তার যথেষ্ট প্রভাব আছে। তার ঘোষণার মধ্য দিয়ে সে উদারনীতিবাদী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তুলে ধরে এবং গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী ও মুসলিম সংখ্যালঘুদের এক বড় অংশকেও সম্প্রতি প্রভাবিত করতে পেরেছে। এ সমস্তই তার সঙ্গে আমাদের আন্তঃক্রিয়াকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। লেনিন বলেছেন “নিজেদের ওপর যাদের আস্থা নেই, তারাই কেবল অবিশ্বস্ত লোকেদের সঙ্গে সাময়িক জোট বাঁধতে ভয় পায়; ঐ ধরনের জোট ছাড়া কোনো রাজনৈতিক পার্টি বেঁচে থাকতে পারে না।”

জোট বাঁধার অবশ্য দুটি পন্থা আছে। একটি হল সিপিআই ও সিপিআই(এম) অনুসৃত সুবিধাবাদী পথ, যে পথে উদারনীতিবাদ ও গণতন্ত্রের কোনো শ্রেণী বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন হয় না। কংগ্রেসের পুর্বতন পর্যায়ের ‘সমাজতান্তিক’ স্লোগান হোক অথবা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে মুলায়ন সিং যাদবের আড়ম্বরপূর্ণ বুলিসর্বস্বতা হোক আর ভি পি সিং-লালু যাদব ইত্যাদির ‘সামাজিক ন্যায়’ই হোক, সুবিধাবাদীরা প্রশংসায় তাদের আকাশে তোলে। বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের শুভ অভিপ্রায়, সদাশয়তা, চমৎকার কথাবার্তা ও মনোরম শ্লোগানের উপরই ভিত্তি করে রয়েছে ঐ দৃষ্টিভঙ্গি।

বিপ্লবী পন্থা বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের বিশ্বাসযোগ্যতার উপরো ভিত্তি করে না আবার তারা যে তাদের সত্তার অবিচ্ছেদ্য উপাদান – বুলিসর্বস্বতা ও ধূর্তামি ত্যাগ করবে, তাও প্রত্যাশা করে না। উদারনীতিবাদ ও গণতন্ত্রের শ্রেণী বিশ্লেষণের উপরই সে ভিত্তি করে, কোনো নির্দিষ্ট বুর্জোয়া রাজনীতিবিদ বা দল বাস্তবে তার সঙ্গে যতটুকু যেতে পারে ততটুকুই সে সনাক্ত করে এবং সংগ্রামের ময়দানেই সহযোগিতা চায়। আর চুক্তি সম্পাদনের যোগ্য এমন সৎ ও দয়ালু বুর্জোয়াদের মানদণ্ড নির্ধারণ করার পরিবর্তে, লেনিনের কথায় “যে কোনো, এমনকি সবথেকে নিকৃষ্ট বুর্জোয়াকেও সমর্থন করে, আর ততটুকুই করে যতটুকু সে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রকৃত সংগ্রাম করে।” লেনিন আরও বলেছেন, “সর্বহারার স্বাধীন সমাজ-বিপ্লবী লক্ষ্যকে অর্জন করার স্বার্থেই ঐ সমর্থন জরুরি।” (শ্রমিকশ্রেণী ও বুর্জোয়া গণতন্ত্র থেকে)

কেন্দ্রে জনতা দলের এগারো মাসের শাসককালে সংসদে আমরাই একমাত্র বামপন্থী বিরোধীপক্ষ ছিলাম, বিহার ও আসাম বিধানসভায় এবং সংসদে এখনও আমরা ঐ ভূমিকা পালন করে চলেছি। বিহারে উচ্ছ্বাসের বন্যা বয়ে যাওয়া সত্ত্বেও মণ্ডল অভিযানের শোভাযাত্রিকদের দলে যোগ দিতে আমরা অস্বীকার করেছি, আর যখন এমনকি জনতা দল কর্তৃক বিস্তারিত ‘সামাজিক ন্যায়’-এর উদারনৈতিক মোহ ব্যাপক সংখ্যক গণতান্ত্রিক মানুষকে অভিভূত করে ফেলল, তখনও আমরা বিপ্লবী গণতন্ত্রের স্বাধীন পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছি। জনতা দলের মণ্ডলায়িত রাজনীতির প্রতি নিঃশর্ত ও সমালোচনাহীন সমর্থন দিতে অস্বীকার করেছি এবং তার সীমাবদ্ধ শ্রেণী লক্ষ্য, ‘কাজের অধিকারের’ প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা ও তার পৃষ্ঠপোষকতায় সর্বাপেক্ষা নিপীড়িত জনগণের উপর সামাজিক অন্যায় চাপিয়ে দেওয়াকেও উন্মোচিত করেছি।

১৯৮৯-এর নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যালঘু জনগণের কংগ্রেস(ই)-র কবল থেকে বেরিয়ে এসে বাম দলগুলি ও জনতা দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া যদি নিশ্চিতভাবে মুসলিম রাজনীতির ধর্মনিরপেক্ষকরণের ইঙ্গিতবাহী হয়ে থাকে, বিপরীতে ১৯৯১-এ জনতা দল নেতৃবৃন্দের মুসলিম মৌলবাদী শক্তিগুলির সঙ্গে এক নীতিহীন চুক্তিতে পৌঁছনো মুসলিম জনগণের উপর ঐ শক্তিগুলির কব্জাকে আরও শক্তিশালী করেছে মাত্র। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও বাম ও গণতান্ত্রিক শিবির থেকে কেবলমাত্র আমরাই জনতা দলের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন দিককে উন্মোচিত করেছি।

যে বিষয়ের ওপর আমি জোর দিতে চাইছি তা হল, আমাদের পার্টি কখনই বিপ্লবী গণতন্ত্রের পতাকার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি এবং সিপিআই-এর মতো জনতা দলের সহযোগিতায় নিছক একটি সংসদীয় আসনের জন্য আমাদের ধারাবাহিক নীতিগত অবস্থান ত্যাগ করতে অস্বীকার করেছি।

পরিস্থিতি গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। কংগ্রেস কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসেছে, বিজেপি তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে, জনতা দল তার প্রথাগত বিরোধীদলের ভূমিকায় ফিরে গেছে এবং তার দুর্গগুলিতেই ফিরে গেছে। কংগ্রেস(ই) ও বিজেপির বিরুদ্ধে জনতা দলের সঙ্গে যৌথ আন্দোলনের সম্ভাবনাগুলির অনুসন্ধান করতে হবে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে জনতা দল একটি পাঁচমিশেলী ধরনের পার্টি এবং বিভিন্ন প্রবণতা ও উপদল তার মধ্যে কাজ করে। যে কোনো ধরনের যৌথ কার্যকলাপ এবং সাময়িক মৈত্রী তার সঙ্গে গড়ে তুলি না কেন, আমাদের লক্ষ্য হবে তার মধ্যে ভাঙ্গন ঘটানো এবং বিপ্লবী গণতন্ত্রের অভিমুখী শক্তি ও উপদলগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা।

দলিত ও সংখ্যালঘু জাতিসত্তার আন্দোলনগুলি সম্পর্কে আমাদের কৌশল

ভারতবর্ষে বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকারের রাজনৈতিক শক্তিগুলি উঠে এসেছে এবং তাদের প্রতি আমাদের সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ দলিতদের স্বার্থকে তুলে ধরছে এমন একটি পার্টি বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি) উত্তরপ্রদেশে এক স্থায়ী ভিত্তি অর্জন করেছে। তাদের নেতৃত্ব চরম বাম বিরোধী, রাজনৈতিকভাবে চরম সুবিধাবাদী এবং দলিত আমলাতন্ত্রের স্বার্থেরই মূলত প্রতিনিধিত্ব করে। ব্যাপক দলিত জনতা যারা আবার ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষক তাদেরকে ঐ নেতৃত্বের নির্দিষ্ট কিছু দেওয়ার নেই। তবুও তারা দলিত জনগণের আকাঙ্খা ও জঙ্গীভাব জাগিয়ে তুলেছে, বিপ্লবী গণতান্ত্রিক দিশা গ্রহণ করার সম্ভাবনা তাদের যথেষ্ট রয়েছে। কাজেই বিএসপি সম্পর্কে আমাদের কৌশলের পুনর্বিন্যাস করতে হবে, নির্দিষ্ট ইস্যুতে সাময়িক জোট বাঁধা এবং ঐ প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক অংশটিকে প্রভাবিত করে জয় করে নিয়ে আসার সম্ভাবনাগুলি অনুসন্ধান করতে হবে।

তামিলনাড়ুতে পিএমকে-র প্রতি একই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারি। তার যদিও দলিত বিরোধী একটি ঝোঁক আছে, তবুও তা অনগ্রসর জাতিগুলির জোটে এবং প্রথাগত দ্রাবিড় রাজনীতি থেকে ভাঙ্গনের প্রতীক।

কার্বি আংলং-এ স্বশাসনের প্রশ্নের সঙ্গে সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরণের বিষয়টি যুক্ত করার অভিজ্ঞতা, যদিও খুবই ক্ষুদ্র স্তরে, কিছু বিস্তারিত উল্লেখের দাবি রাখে।

ঐ একই জাতিসত্তা থেকে উদ্ভূত কমিউনিস্ট ও জাতিসত্তা আন্দোলনের গণতান্ত্রিক ব্যক্তিদের সাধারণ ফ্রন্ট এএসডিসি একটি জনপ্রিয় গণআন্দোলনের মধ্য থেকে উঠে আসে। কংগ্রেস(ই) নিয়ন্ত্রিত জেলা পরিষদের দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়েছিল ঐ আন্দোলন। ওখানে কংগ্রেস(ই)ও একটি স্বশাসিত রাজ্যের দাবি তুলে ধরে। একেবারে শুরু থেকেই আন্দোলনের মধ্যে শ্রেণীসংগ্রামের একটি উপাদান ছিল যা মূলত কংগ্রেস(ই)-র মদতপুষ্ট মহাজন, জমিদার ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে মূলত ব্যাপক সংখ্যক ভূমিহীন, দরিদ্র ও মধ্য কৃষকদের সংগ্রাম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়াশীলরাও ছিল একই জাতিসত্তার লোক। কমিউনিস্টরাই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন, ঐ কমিউনিস্টরা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আন্দোলনের সামগ্রিক প্রভাব থেকেই কমিউনিস্ট শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং আন্দোলনকে প্রবাহিত করেন কার্বি অন্দোলনে, উল্টোটা নয়। শক্তিশালী ও জঙ্গী গণআন্দোলনের উদ্দীপ্ত শিখার মধ্যেই জেলা পরিষদের নির্বাচনে সাফল্য আসে। সামাজিক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীলদের উপর আগেই বিজয় অর্জন করা হয়েছিল। আর তারপর থেকেই গণকার্যকলাপকে গভীরতর করা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করা ও শ্রেণীসংগ্রামকে তীব্রতর করে তোলার প্রচেষ্টা চলছে। জাত্যাভিমানের ঝোঁক থেকে মুক্ত এএসডিসি অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলির উপর প্রভাব প্রসারিত করতে পেরেছে, বিহারীদের মধ্যে মেরুকরণ ঘটিয়ে এবং ঐ অঞ্চলের বাঙালি ও অসমীয়া জনগণের অংশের সমর্থনও ভোগ করে।

আমাদের পার্টির কৌশলে শুধুমাত্র জেলা পরিষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার পরিবর্তে আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য উপজাতিগুলির জাতিসত্তা আন্দোলনে বিপ্লবী গণতন্ত্রী দিশা প্রদানের জন্য এবং অসমীয়া সমাজের গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাসের জন্য এএসডিসি-কে উল্লম্ফন মঞ্চ হিসাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা আছে। এএসডিসি-র এই পুরোদস্তুর রাজনৈতিক ভূমিকা এবং বিভিন্ন স্তরের জনগণ ও অন্যান্য অঞ্চলের উপর তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব তাকে বিশিষ্টরূপ প্রদান করেছে।

কার্বি আংলং-এর অভিজ্ঞতার আলোকে যে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠে আসে তা হল ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড এবং ঐ ধরনের অন্যান্য আন্দোলনগুলি সম্পর্কে আমাদের কৌশলের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে কী না।

কমরেড এ কে রায় যখন ভেবেছিলেন যে উপজাতিদের রাজ্য ঝাড়খণ্ড, যার সমাজের মধ্যে আদিম সাম্যবাদের বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তা নিজের থেকেই লালভূমিতে রূপান্তরিত হবে, সেটা তাঁর ভ্রান্তিই ছিল। ঐ প্রক্রিয়ায় তিনি একজন আদিম বুর্জোয়া শিবু সোরেনকে সৃষ্টি করতে পেরেছেন মাত্র।

প্রশ্ন হল ঝাড়খণ্ডকে লালভূমিতে রূপান্তরিত করার এবং ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির বিপক্ষে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়েই তা করা সম্ভব। ঝাড়খণ্ডীদের মধ্যে এক শক্তিশালী কমিউনিস্ট গ্রুপের উপস্থিতি সম্বলিত একটি শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষেই ঐ কৌশল অনুসরণ করা সম্ভব।

ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা নিজেই তার দাবি নামিয়ে এনে এখন শুধুমাত্র বিহার রাজ্যের জেলাগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দাবি রাখছে, এমনকি বিহারের মধ্যেই স্বশাসিত ধরনের এলাকার কথাও বলছে। ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা বিভিন্ন শক্তিশালী গোষ্ঠীতে বিভক্ত এবং ঝাড়খণ্ড সমাজে কর্মরত রাজনৈতিক শক্তিগুলি ও সমাজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যে রয়েছে পার্থক্য। আমাদের পার্টির প্রভাবও ঐ অঞ্চলে বেড়ে চলেছে এবং সক্রিয় হস্তক্ষেপের নীতি গ্রহণ করার পক্ষে আমরা ভালো অবস্থানে রয়েছি। এই হস্তক্ষেপের নীতি ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা বা তার মধ্যে কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে সাময়িক ঐক্যকেও নাকচ করে দেয় না।
উত্তরাখণ্ডে বিজেপি তার অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটিয়েছে এবং তার অগ্রগতিকে রোধ করার জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবিকে সক্রিয়ভাবে তুলে ধরে সেখানে আমাদের কৌশলের পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

স্থানীয় ও রাজ্য স্তরে সরকার গঠনের কৌশল

মার্কস বলেছিলেন যে, আমাদের কোনো সরকারি দলের পরিবর্তে ভবিষ্যতের বিরোধী দল গঠন করতে হবে। এই নীতিগত অবস্থানকে আমরা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকি। ভারতীয় পরিস্থিতিতে অবশ্য নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির সঙ্গে জোট বেঁধে কমিউনিস্টদের আঞ্চলিক এমনকি রাজ্য স্তরেও সরকার গঠনের সুযোগ আছে। আমাদের কৌশলগত লাইন এই কৌশলকে নাকচ করে দেয়নি এবং অন্তত এক ব্যতিক্রম হিসাবেও একে বিবেচনার মধ্যে রাখা হয়েছে। অবশ্য গণআন্দোলনকে আরও ব্যাপক ও উন্নত স্তরে নিয়ে যাওয়ার অংশ করে তুলতে হবে এই কৌশলকে।

শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটিয়ে গণআন্দোলনের স্তরকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার এবং সর্বভারতীয় স্তরে প্রভাব বাড়ানোর জন্য সিপিআই(এম)-এর কৌশলগত লাইনে, এই কৌশলের গুরুত্ব অপরিসীন। পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও ত্রিপুরায় সরকার গঠন করতে তাঁরা সক্ষম হয়েছেন। পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকার একনাগাড়ে চৌদ্দ বছরের অধিক সময় ধরে চলছে। ভাগ্যের পরিহাস! এমনকি একটি দুর্দান্ত সাফল্য রের্কডই বটে, কিন্তু পার্টিকে তা গভীর এক তাত্ত্বিক সংকটের মধ্যেই ফেলে দিয়েছে।

সিপিআই(এম)-এর ঘোষণা  ও প্রত্যাশার বিপরীতে সর্বাপেক্ষা অগ্রগতি সম্পন্ন বাম সংগঠনটি এমনকি কোনো সীমান্তবর্তী রাজ্যেও প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, সর্বভারতীয় স্তরের কথা আর না বলাই ভালো। পশ্চিমবাংলার প্রতিটি বিজয় যে তার সর্বভারতীয় তাৎপর্যকে আরও বেশি বেশি করে হ্রাস করছে এবং তাকে নিছক পশ্চিমবাংলার ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছে।

হিন্দি বলয়ে বিস্তার সাধনে পার্টিকে জনতা দলের স্লোগানগুলি অবিকল অনুসরণ করতে হয় এবং জনতা দলের জোট সঙ্গী হিসাবে চলতে হয়। বামফ্রন্ট সরকারের একমাত্র সাফল্য হিসাবে পার্টি সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলিকে সংযত রাখার দাবি করে থাকে। পশ্চিমবাংলায় বিজেপি ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠায় এই প্রচারও ধাক্কা খেয়েছে।

সিপিআই(এম) তাত্ত্বিকেরা পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্য নিয়ে প্রচুর কথা বলেন, কিন্তু তাদের কৌশলগত লাইন অনুযায়ী দেশের সর্বাপেক্ষা উন্নত বাম সংগঠনের উল্লম্ফন মঞ্চ হিসাবে যে অভিপ্রেত ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল তা চেপে যান।

জার্মানিতে কৃষক যুদ্ধ রচনায় এঙ্গেলস যা বর্ণনা করেছেন, সিপিআই(এম)-এর দুরবস্থার সঙ্গে তা মিলে যায়, “একটি চরমপন্থী দলের নেতার পক্ষে সর্বাপেক্ষা খারাপ যে ঘটনা হতে পারে তা হল, এমন এক যুগে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করা যখন ঐ কর্তৃত্ব দিয়ে যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা সেরকম আন্দোলন এখনও পরিপক্ক হয়ে ওঠেনি।”

এঙ্গেলসের মতে এমতাবস্থায় চরমপন্থী দলের নেতাকে “বিজাতীয় শ্রেণীর স্বার্থেই কাজ করে যেতে হবে এবং তার নিজের শ্রেণীকে বুলি ও প্রতিশ্রুতি দিয়েই সন্তুষ্ট রাখতে হবে এবং এই আশ্বাসই দিয়ে যেতে হবে যে ঐ বিজাতীয় শ্রেণী স্বার্থই তাদের স্বার্থ। ঐ অবস্থায় যে পড়বে তার সর্বনাশ অনিবার্য।”

নিয়মিত কি আমরা শুনতে পাই না যে বামফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ পশ্চিমবঙ্গে কলকারখানা খোলার ব্যাপারে টাটা, বিড়লা, গোয়েঙ্কাদের যে স্বার্থ আছে তাকে পশ্চিমবাংলা শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থ বলেই চালিয়ে যাচ্ছেন?

প্রকাশ কারাত স্বীকার করেন যে পশ্চিমবঙ্গে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে তা সমাজগণতন্ত্রী ধাঁচেরই, কেননা বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থায় সমাজতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করা সম্ভব নয়। তিনি আমাদের বুঝতে অনুরোধ করেছেন যে ঐ ধরনের রাজ্য সরকারগুলির যে পরিধি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে তাতে দেশী ও বিদেশী একচেটিয়া পুঁজির সঙ্গে সহযোগিতায় যেতে তারা বাধ্য। তিনি স্বীকার করেছেন যে বিভিন্ন ক্ষেত্রগুলিতে সরকারের ব্যর্থতা ও ত্রুটি রয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে প্রকাশের অভিযোগ, আমরা বামফ্রন্ট সরকারকে কার্যত অন্যান্য অ-কংগ্রেসী সরকারের পর্যায়ে ফেলি। আমাদের কাছে তাঁর দাবি আমরা অন্তত সমালোচনামূলক সমর্থন তো করতেই পারি, অন্য কথায় এক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণেই বা আমাদের অসুবিধা কোথায়।

প্রিয় কমরেড, সমস্ত সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধেই আমরা যথেষ্ট অবহিত। এই সরকারের কাছ থেকে আমরা কোনো বিপ্লবী ভূমিকা আশাও করি না। ‘রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতা’কে জাতীয় স্তরে হস্তক্ষেপের একমাত্র কর্মসূচি বানিয়ে এবং শুধু একাধারে অ-কংগ্রেসী সরকারগুলির সঙ্গে মিতালী করে আপনারাই আপনাদের সরকারকে অন্য যে কোনো অ-কংগ্রেসী সরকারের স্তরে নামিয়ে এনেছেন।

তবু আমরা কংগ্রেস(ই) ও তার চক্রান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচনেই হোক বা কেন্দ্র-বিরোধী সংগ্রামেই হোক, আপনাদের সমর্থন জানিয়ে এসেছি। আপনারা যে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলে আমরা অবশ্যই সমালোচনামূলক সমর্থন জানাতে সর্বদাই তৈরি। কিন্তু যদি আমরা এই তথাকথিত সবচেয়ে এগিয়ে থাকা বাম সংগঠনের অতিকথার স্বরূপ উদ্ঘাটন না করি এবং এই সরকারের জনবিরোধী কার্যকলাপের বিরোধিতা না করি, তাহলে বিপ্লবী কমিউনিস্ট হিসাবে আমাদের যা কর্তব্য তা পালনে আমরা ব্যর্থ হব। পার্টিরই একটি অংশের দ্বারা পরিচালিত নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের দমন দিয়েই তো বামফ্রন্ট ধরনের সরকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল। তাই এই ধরনের সরকার যে গণআন্দোলনে কখনই প্রেরণা সঞ্চার করতে পারে না, বিপরীতে তাকে স্তিমিত করতে পারে মাত্র। এই সত্য তুলে না ধরলে ভারতীয় বিপ্লবের প্রতি এক অপরাধই করব।

ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে ‘সবচেয়ে এগিয়ে থাকা বাম সংগঠন’ দীর্ঘ চৌদ্দ বছরেও পশ্চিমবাংলার বাইরে কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ নকশালবাড়ি আন্দোলন, তার আদি ভূমি পশ্চিমবাংলায় দমিত হলেও, সর্বভারতীয় স্তরে ছড়িয়ে পড়ল। প্রথমে অন্ধ্রে ও পরে বিহারে ঘাঁটি গাড়ল, যদিও তাকে কত না দমন সহ্য করতে হয়েছে এবং কত ভাঙ্গনই না পেরিয়ে আসতে হয়েছে। নকশালবাড়ি আন্দোলন এমনকি প্রতিবেশি নেপালেও প্রভাব সৃষ্টি করে, এবং সেখানকার কমিউনিস্ট আন্দোলনে নতুন জীবন সঞ্চার করে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই রূঢ় কঠোর সত্য খোদ কমরেড সুরজিৎ-কেই স্বীকার করতে হয়েছে।

নির্বাচনী কৌশল

যখনই নির্বাচন আসে, রং-বেরং-এর সমস্ত উদারনৈতিকরা আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যে, আমরা কংগ্রেস(ই) ও বিজেপির বিপদকে ছোটো করে দেখছি। এরা আমাদের পরামর্শ দেন বিরোধী ভোট যাতে ভাগ না হয়, তার জন্য আমরা   যেন নির্বাচনী লড়াই-এ অংশগ্রহণ না করি বরং বিপরীতে উদারনৈতিক বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষকে যেন নিঃশর্ত সমর্থন জানাই। এই ধরনের যুক্তিগুলি আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী ও আমাদের পার্টির ভিতরে একাংশের মধ্যে সমর্থন পেয়ে যায়। দরকষাকষি করে যে দু-একটি নির্বাচনী আসন পাওয়া যাবে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার জন্য তাঁরা আমাদের উপদেশ দেন, কেননা আসনগুলিই নাকি মূল ব্যাপার।

আমরা বারংবার ব্যাখ্যা করেছি যে আমাদের নির্বাচনী কৌশলগুলি কোনো স্বতন্ত্র ব্যাপর নয়, এগুলি কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আমাদের সাধারণ রাজনৈতিক কৌশলগুলিরই প্রয়োগ। এছাড়াও ভোট ভাগাভাগির প্রশ্নকে আনুষ্ঠানিক কোনো পাটিগণিতীয় সম্ভাবনা হিসাবে দেখার পরিবর্তে আমাদের বরং রাজনৈতিক সম্ভাবনা হিসাবেই দেখা দরকার। এবারের নির্বাচনেও এটি যান্ত্রিক বলে প্রমাণ হয়েছে যে আমাদের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে অঙ্কের নিয়মে কংগ্রেস(ই) ও বিজেপির নির্বাচনী বিজয়ের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। যদি কোনো ক্ষেত্রে এরকম ঘটেও, তবে তা ব্যতিক্রম মাত্র। এই উদারনৈতিক চাপের কাছে যদি আমরা নতিস্বীকার করতাম, তবে ব্যাপকমাত্রায় স্বাধীন রাজনৈতিক প্রচার অভিযান চালানো ও আমাদের ভবিষ্যৎ অগ্রগতির অবস্থা সৃষ্টির সুযোগ নিশ্চিতভাবেই আমরা হারাতাম। লেনিন ও বলশেভিকদেরও মেনশেভিকদের পক্ষ থেকে একই অভিযোগ শুনতে হয়েছে যে তাঁরা ব্ল্যাক হান্ড্রেড (কৃষ্ণশত) বিপদকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যুত্তরে লেনিন পাল্টা বলেছেন, “... সমস্ত দেশে সর্বত্রই নির্বাচনী প্রচারকাজে সমাজগণতন্ত্রীদের প্রথম স্বাধীন অংশগ্রহণের সময় উদারনৈতিকরা এই বলে শোরগোল ও চিৎকার শুরু করে দেয় যে সমাজতন্ত্রীরা ব্ল্যাক হান্ড্রেডদের সুযোগ করে দিচ্ছে।

“... কাডেটদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে অস্বীকার করে আপনারা সমাজগণতন্ত্রীদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে ইচ্ছুক প্রোলেতারিয়েত ও আধা-প্রোলেতারিয়েত জনগণকে ক্যাডেট মতাদর্শের প্রভাবে রেখে দিচ্ছেন। আজ হোক কাল হোক, যদি না আপনারা সমাজতন্ত্রী অবস্থান পরিত্যাগ করেন, তবে ব্ল্যাক হ্যান্ড্রেড বিপদ থাকা সত্ত্বেও আপনাদের স্বাধীনভাবেই নির্বাচনে লড়াই করতে হবে। তাই ভবিষ্যতের পরিবর্তে এখনই তুলনায় সহজ ও অধিক প্রয়োজনীয় সঠিক পদক্ষেপ আপনাদের গ্রহণ করতে হবে।” (ক্যাডেটদের সঙ্গে ব্লক গঠনের প্রশ্নে)

লেনিন আরও বলেছেন, “একটি যৌথ তালিকার (ক্যাডেটদের সঙ্গে) প্রকাশ সমাজগণতন্ত্রীদের সমগ্র স্বাধীন শ্রেণী নীতির সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করবে। জনগণের কাছে এই যৌথ তালিকা হাজির করলে শ্রেণী ও রাজনৈতিক বিভাজনগুলি সম্পর্কে আরও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। ডুমাতে একজন উদারনৈতিককে জয়ী করার বিনিময়ে তা আমাদের প্রচার অভিযানের নীতিগুলি ও সাধারণ বিপ্লবী তাৎপর্যকে নস্যাৎ করে দেবে। আমাদের সংসদবাদকে শ্রেণী-নীতির অধীনে রাখার পরিবর্তে তা আমাদের শ্রেণী-নীতিকেই সংসদবাদের অধীনস্থ করে ফেলবে। এর ফলে আমরা নিজস্ব শক্তিকে পরিমাপ করার সুযোগ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করব। সমস্ত নির্বাচনেই যে স্থায়ী ও দীর্ঘকালীন লাভ – সমাজতান্ত্রিক সর্বহারার শ্রেণী সচেতনতা ও শ্রেণী ঐক্য বৃদ্ধির সুযোগ আমরা হারাবো। আর আমাদের যে লাভ হবে তা হল অস্থায়ী, আপেক্ষিক ও অসত্য – অক্টোব্রিস্টদের তুলনায় ক্যাডেটরা উৎকৃষ্ট।” (সমাজগণতন্ত্র ও নির্বাচনী সমঝোতা)

কমরেড লেনিন বারবারই কমিউনিস্ট পার্টির নির্বাচনী প্রচার কর্মসূচির পূর্ণ স্বাধীনতার উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, “কোনো অবস্থাতেই অন্য কোনো বিরোধী দল বা বিজয়ী পার্টির সঙ্গে কমিউনিস্ট স্লোগান ও কৌশলগুলিকে মিলিয়ে ফেলা উচিত নয়। ... এই নিয়মের ব্যতিক্রম একমাত্র চূড়ান্ত কোনো প্রয়োজনে ও আমাদের আশু রাজনৈতিক সংগ্রামের মূল স্লোগানগুলিকে পুরোপুরি গ্রহণ করেছে এমন কোনো পার্টির ক্ষেত্রেই কেবল অনুমোদন করা যেতে পারে।”

আমাদের দেশের নির্দিষ্ট অবস্থায় গ্রামাঞ্চলে আমাদের কাজের মূল কেন্দ্রগুলি এই একই শ্রেণীভুক্ত।

আমাদের নির্বাচনী কৌশলগুলি লেনিনের শিক্ষাকেই জোরালোভাবে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে, একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টির পক্ষে এটিই একমাত্র মূল্যবান বিষয়।

যেহেতু নির্বাচনী কৌশলগুলি সাধারণ রাজনৈতিক কৌশলগুলির একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগ ব্যতীত অন্য কিছু নয় তাই খুবই স্বাভাবিক যে, অসংসদীয় সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় যে রাজনৈতিক আঁতাতগুলি গড়ে ওঠে, তারই স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে আসন সমঝোতা ও আন্যান্য নির্বাচনী বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে। আমাদের নীতিগুলির সীমানার মধ্যে এই প্রশ্নে আমরা সর্বদাই নমনীয় থাকার চেষ্টা করছি।

বাম ব্লক গঠনই একমাত্র উপযুক্ত কৌশল

আগামী দিনগুলিতে আমাদের সামনে রয়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াই। কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল তিনটি ধারা, ছোটো বাম পার্টিগুলি, নৈরাজ্যবাদী কার্যকলাপ পরিত্যাগ করে রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিয়েছে এমন নকশালপন্থী গোষ্ঠীগুলি ও তৃণমূল আন্দোলনের প্রতিনিধিরা, জনতা দল, দলিত, সংখ্যালঘু ও জাতিসত্তার আন্দোলনের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক অংশগুলি এবং বিপ্লবী পেটি বুর্জোয়া ও বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের কাছাকাছি নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে সেই বাম ব্লক বা যাকে আমরা বলি বাম গণতান্ত্রিক কনফেডারেশন (মহাজোট)। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত ব্লকের অপসারণ এবং কংগ্রেস সরকার অনুসৃত নতুন অর্থনৈতিক নীতিগুলি যা একদিকে ভারতীয় পুঁজির আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির উপর নগ্ন নির্ভরশীলতাকে দেখিয়ে দিচ্ছে ও অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র তার কর্তৃত্বমূলক অবস্থান খোয়ানোর সাথে সাথে সুবিধাবাদীরা তাদের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে করুণ তাত্ত্বিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদ বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে পরিচালিত সমাজতান্ত্রিক ব্লকের দ্বন্দ্বই প্রধান দ্বন্দ্ব, ভারত সরকারের ‘প্রগতিশীল’ বৈদেশিক নীতির উচ্চকিত প্রশংসা, ভারতীয় বুর্জোয়াদের জাতীয় চরিত্রকে এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ক্ষেত্রগুলির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রগুলির ভূমিকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা ইত্যাদি বিষয়গুলি আজ এইসব সুবিধাবাদীদের পক্ষে রক্ষা করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বামফ্রন্ট ও রাষ্ট্রীয় মোর্চার আঁতাতের মাধ্যমে তৃতীয় যে রাজনৈতিক বিন্যাস গড়ে উঠেছিল ও যারা কেন্দ্রে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখেছিল, যে সরকারে যোগ দিতে সিপিআই আগ্রহ প্রকাশ করেছিল ও সিপিআই(এম) ‘সেতু অতিক্রমে’ প্রস্তুত হচ্ছিল, সেই আঁতাত নির্বাচনে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে। বামেদের পক্ষে কংগ্রেসের সঙ্গে যাওয়া যেমন কঠিন, ঠিক তেমনি বহুধাবিভক্ত বুর্জোয়া বিরোধী পক্ষের সঙ্গে হাঁটাও অস্বস্তিকর হয়ে পড়েছে। কংগ্রেস(ই)-র মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি খুঁজে ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রন্টকে বিস্তৃত করার প্রয়াসই সম্ভবত তাঁরা চালাবেন। কিন্তু পরিস্থিতির চাপ ক্রমশই তাদের বেশি বেশি করে স্বাধীন অবস্থান গ্রহণ ও সরকারের অর্থনৈতিক নীতিগুলির বিরুদ্ধে জনপ্রিয় আন্দোলনগুলিতে সামিল হতে বাধ্য করবে।

ভারতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রক্রিয়ায় বাম ব্লকের উদ্ভব যেমন প্রয়োজনীয় তেমনি অবশ্যম্ভাবী, যা বিপ্লবের সমগ্র প্রক্রিয়াকেই পরিবর্তিত করে দেবে। আমাদের রাজনৈতিক কৌশলগুলির মৌলিক দিশা এই লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত, যার বস্তুগত শর্তগুলি প্রতিদিনই পরিপক্ক হচ্ছে।

রাশিয়ার বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পর্কে লেনিন বলেছিলেন, “এই বিপ্লবে বিপ্লবী সর্বহারা সর্বশক্তি নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়বে, আর ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ন্যক্কারজনক লেজুড়বৃত্তি ও বিপ্লবী বুলিসর্বস্ব রাজনীতির প্রতিনিধি গোষ্ঠীগুলিকে। বিভ্রান্তির ঘটনাবলীর ঘুর্ণাবর্তে এরা নিয়ে আসবে শ্রেণী নির্দিষ্টতা ও শ্রেণী সচেতনতা। অকুতোভয় ও দ্বিধাহীন চিত্তে এরা অগ্রসর হবে। ভয়শূন্য কিন্তু বিপ্লবী গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার দুর্দম আকাঙ্খা নিয়ে এরা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও পূর্ণাঙ্গ নাগরিক স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালাবে। পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য লড়াই চালানোর মাধ্যমে এরা নিজের জন্য প্রস্তুত করবে এক বিস্তৃত আঙ্গিনা। বিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে মানানসই এই বিস্তৃত আঙ্গিনায় এরা সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।”

বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্বে এসে আমাদের শুধু সময়কে একবিংশ শতাব্দী হিসাবেই পাল্টে নিতে হবে, কিন্তু লেনিনের অন্য সমস্ত কথাই ভারতীয় সর্বহারাদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

টীকা

১০. ১৯৮৮-র পার্টি কংগ্রেসে যা দেখা দেয় সেই বিলোপবাদী ধারার প্রবক্তাদের কথা এখানে বলা হয়েছে।

১১. ‘দি মার্কসিস্ট’ পত্রিকার অক্টোবর-ডিসেম্বর, ১৯৯০ সংখ্যায় প্রকাশ কারাতের লেখা “সিপিআই(এমএল)/আইপিএফ – বাম ভূমিকার অন্বেষণে।”

(দেশব্রতী, বিশেষ সংখ্যা, অক্টোবর ১৯৮৯ থেকে)

পার্টির চতুর্থ কংগ্রেসে বাম শক্তিগুলির অভ্যুদয়কে বর্তমান ভারতীয় রাজনীতির এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং কংগ্রেস বিরোধী লড়াইয়ে বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের মোকাবিলায় তথা বামপন্থী শক্তিগুলিকে এক স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে দাঁড় করানোর কর্তব্যকর্ম নির্ধারিত করা হয়েছিল। বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের পেছনে না চলে, বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বদানের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার জন্য বামপন্থী শক্তিগুলির কাছে আহ্বান জানানো হয়েছিল। বাম গণতান্ত্রিক কনফেডারেশন গড়ে তোলার যে কর্তব্য ‘পার্টি কংগ্রেস’ সূত্রবদ্ধ করে, তা ছিল এই দিশাতেই এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।

এই আহ্বান ও তার থেকে বেরিয়ে আসা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্তব্য বামপন্থী আন্দোলনের অন্য দুটি প্রধান শক্তি সিপিআই ও সিপিআই(এম)-এর সাথে আমাদের আন্তঃক্রিয়া ও ঐক্যের সম্ভাবনার দ্বার যেমন খুলে দিল, তেমনি তাদের সাথে আমাদের ঐতিহাসিক সংগ্রামকে এক নতুন পর্যায়ে উন্নীত করল।

বাম কনফেডারেশনও একটি যুক্তফ্রন্ট মাত্র। এই যুক্তফ্রন্টে মূল অংশীদারদের মধ্যে যেহেতু সিপিআই, সিপিআই(এম) ও সিপিআই(এমএল)-এর কথাই ভাবা হয়েছে, তাই শেষ বিচারে রাজনৈতিক ঘটনাক্রমের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তিনটি পার্টির মধ্যেই পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটতে পারে, তারা আরও কাছাকাছি আসতে পারে, ১৯৬৪ ও ১৯৬৭-র ঐতিহাসিক বিভাজনগুলির পুর্নমূল্যায়নের এবং ভারতের একক কমিউনিস্ট পার্টি পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন সামনে চলে আসতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা সুদূর ভবিষ্যতের গর্ভে রয়েছে, কাজেই তা নিয়ে আজকেই মাথা ঘামানো তত্ত্বের ক্ষেত্রে আমাদের বিমূর্ততায় ঠেলে দেবে এবং ব্যবহারিক নির্দিষ্ট কর্তব্য থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেবে।

এই মুহূর্তে বাম কনভেডারেশন-এর স্লোগান তিনটি পার্টির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই এক নতুন স্তরে দাঁড় করিয়েছে। ‘নতুন স্তরে’ বলছি, কারণ এই প্রথম সমাজগণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে বিমূর্ততার সীমা থেকে টেনে নিয়ে আসা হয়েছে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্নে, কারণ এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন চলবে ব্যাপক আন্তঃক্রিয়া ও ঐক্যবন্ধ ফ্রন্ট গড়ার লক্ষ্যে।

বাম কনফেডারেশন-এর স্লোগান যে কয়টি প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তরের দাবি জানায়, তা হল :

১) সিপিআই ও সিপিআই(এম)-এর সাথে আজকের স্তরে আমাদের নির্দিষ্ট সম্পর্ক কী হবে?

২) সাধারণভাবে রাজ্যগুলিতে বামপন্থী সরকার গঠনের প্রশ্নে ও নির্দিষ্টভাবে সিপিআই(এম) পরিচালিত বামফ্রন্ট সরকারের প্রশ্নে আমাদের মনোভাব কী হবে? এবং

৩) কনফেডারেশনের প্রশ্নে আমরা কীভাবে ও কোথায় শুরু করব?

আমি এই প্রশ্নগুলি সম্পর্কে আমার মত এখানে রাখার চেষ্টা করব।

শুরুতে বলে রাখি, সমাজগণতন্ত্রীর নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আচরণ সম্পর্কে শেষ কথা নিশ্চয়ই বলা যায় না। তারা বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির এজেন্ট ও গণসংগ্রামের শত্রুশক্তি, নাকি কমিউনিস্টদের ও গণসংগ্রামের স্বাভাবিক মিত্র – ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’তে এই প্রশ্নের উত্তর বোধহয় দেওয়া সম্ভব নয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্যায়ে, তাঁরা পুরোপুরি ভিন্নভিন্ন ভূমিকা পালন করেছেন ও করতে পারেন। বাস্তব অবস্থা, রাজনৈতিক ঘটনা সমাবেশ, তাঁদের নেতৃত্বের বিভিন্ন অংশের ও স্তরের মধ্যকার শক্তির ভারসাম্যের ওপর তা নির্ভর করে থাকে।

এখানে আমরা সিপিআই-এর দৃষ্টান্ত নিতে পারি। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত তার বিকাশের এক প্রক্রিয়া আছে যা ক্রমে ক্রমে তাকে কংগ্রেসের সাথে জুড়ে দেয়, তারা কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন গভর্ণমেন্ট পরিচালনা করে ও জরুরি অবস্থার একমাত্র সমর্থক হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃত অর্থে ইন্দিরা কংগ্রেস ও সিপিআই-কে আলাদা করে চেনা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে মালিকশ্রেণীর দালালি থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী কমিউনিস্টদের বিরোধিতায় শ্রেণী শত্রুদের সাথে হাত মেলানো পর্যন্ত তাঁদের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭৭-এর রাজনৈতিক ঘটনাক্রম এই পার্টির সামনে অস্তিত্বের সংকট এনে দাঁড় করায় এবং তারপর থেকে ক্রমে ক্রমে এই পার্টি তার পুরোনো অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করে। তার জন্য তাকে তীব্র আন্তঃপার্টি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ডাঙ্গে, মোহিত সেন ও কল্যাণসুন্দরমরা বিতাড়িত হয়। কংগ্রেস বিরোধী অবস্থান নিয়ে সে বামপন্থার মূল স্রোতে ফিরে আসার চেষ্টা করে। মৌলিক কর্মসূচি নিয়েও পার্টির অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। গণআন্দোলনের কিছু কিছু কর্মসূচি নেওয়ার তাঁরা চেষ্টা করছেন। সিপিআই(এম)-এর বিরোধিতা আগ্রাহ্য করে অন্ধ্রে তেলেগু দেশম সরকারের বিরুদ্ধে তাঁরা আন্দোলনে নামেন, বামফ্রন্ট সরকারের অংশীদার হয়েও তার কোনো নীতির বিরোধিতা করা ও প্রয়োজনে আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং আমাদের সাথে সম্পর্ক বিকশিত করতে এগিয়ে আসে। তাঁদের তত্ত্বে ও প্রয়োগে এখনও বহু কিছু আছে, যা তাঁদের কংগ্রেসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আমাদের সাথে সম্পর্ককে বামফ্রন্টের মধ্যে সিপিআই(এম)-এর সাথে দরকষাকষির জন্যই হয়তো ব্যবহার করতে চান তাঁরা। এ সমস্ত সত্ত্বেও ১৯৭৭ ও ১৯৮৯-র সিপিআই-এর ভূমিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন যে এসেছে, তা বোধহয় কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না।

সিপিআই-এর আমাদের আন্তঃক্রিয়া, যা ক্রমেই এগোচ্ছে, উভয়ের মধ্যে সম্পর্ককে বিভিন্ন স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। আবার অন্যদিকে, সিপিআই(এম)-এর সাথে তারা আগেই এক ঘনিষ্ঠ প্রাতিষ্ঠানিক রূপে আবদ্ধ। সিপিআই একদিকে সিপিআই(এম)-এর বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে আমাদের সাথে সম্পর্ক বিকশিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তেমনি অন্যদিকে সে আমাদের বামফ্রন্ট সরকার সম্পর্কে মনোভাব পাল্টানোর ও বামফ্রন্টের শরিক হওয়ার জন্য লাগাতার চাপ দিচ্ছে। এটি দেখার বিষয় যে আমাদের ও সিপিআই(এম)-এর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নেওয়ার তাঁরা যে চেষ্টা করছেন তাতে তাঁরা সফল হবেন নাকি দুটি বিপরীত দিকের চাপে তাঁরা আরও সংকটে পড়বেন। বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় তাঁদের আগামী পদক্ষেপ কী হবে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে আমাদের মধ্যকার অগ্রগতি।

সিপিআই(এম) বৃহত্তম বামপন্থী পার্টি ও তাঁরা দুটি রাজ্যে সরকার পরিচালনা করছেন। এই শক্তির ভিত্তিতে সাম্প্রতিককালে তাঁরা জাতীয় রাজনীতিতেও এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছেন। তাঁরা নিজেদের বাম শক্তিগুলির স্বাভাবিক নেতা বলেই মনে করেন এবং অপরিহার্যভাবেই তাঁদের নেতৃত্বে পরিচালিত বামফ্রন্টই তাঁদের কাছে বাম ঐক্যের নির্দিষ্ট রূপ। বামফ্রন্ট পরিচালিত দুটি রাজ্য সরকারকে তাঁরা তাঁদের কৌশলগত লাইনে কেন্দ্রীয় অবস্থান রাখেন যাদের ধরেই তাঁরা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটাতে চান। তাঁদের ভাষায়, এই মেরুকরণের নির্দিষ্ট রূপ বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির সংযুক্ত মোর্চা।

পশ্চিমবাংলা ও কেরলের কথা বাদ দিলে, যেখানে সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত, জাতীয় পর্যায়ে তার নিজস্ব শক্তি সীমিত ও খুব বেশি হলে তা এক শক্তিশালী প্রেসার গ্রুপ গঠন করতে পারে। জাতীয় ক্ষেত্রে সংসদীয় রাজনীতিতে তাকে একটা বিরোধী অবস্থান নিয়েই থাকতে হবে। সংসদীয় বিরোধী অবস্থানের এই শক্তিশালী অবস্থার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে দেশব্যাপী এক ব্যাপক গণআন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টি করার কাজে সে এগিয়ে যেতে পারতো। তবে এই বিপ্লবী পথে এগোনোর কোনো ইচ্ছাই সিপিআই(এম)-এর নেই। তাঁরা তাঁদের পার্টির শক্তি বৃদ্ধির জন্য অন্য পথই গ্রহণ করেছেন।

অন্ধ্রে তেলেগু দেশম, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে ও হিন্দি বলয়ে জনতা দলের সাথে রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে নিজেদের সংসদীয় শক্তি বৃদ্ধি ঘটানোকেই তাঁরা বামপন্থার শক্তিবৃদ্ধি হিসাবে দেখতে চান। সংসদ ও বিধানসভায় এইভাবে অর্জিত প্রতিটি আসন যে জনগণের রাজনৈতিক চেতনাকে কলুষিত করার ও বিপ্লবী আন্দোলনে তাঁদের ক্ষমতাকে দুর্বল করার বিনিময়ে হাসিল হয়, তা সিপিআই(এম) নেতৃত্ব ভালোভাবেই জানেন। বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের এই তাবড় তাবড় শক্তিগুলি যারা নিজের নিজের প্রভাবাধীন ক্ষেত্রে বুর্জোয়া জমিদার সমন্বয়কে প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁদের সাথে নিজের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সমঝোতাকে প্রাতিষ্ঠানিক করার স্বার্থেই ‘বাম গণতান্ত্রিক’-এর সাথে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ জুড়ে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ মোর্চার তত্ত্ব আনা হয়েছে। এ যেন সিপিআই-এর সাথে কংগ্রেসের আঁতাতের সেই আগেকার অনুশীলনেরই উল্টোপিঠের পুনরাবৃত্তি।

এই ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্পে সিপিআই(এম) যে নেতৃত্বকারী ভূমিকায় থাকবে না তা স্পষ্ট। কাজেই এই বিকল্পে পার্টির অবস্থান কী হবে ও কংগ্রেসকে সরিয়ে এই বিকল্পের সরকার গঠন হলে সিপিআই(এম) তাতে অংশ নেবে নাকি বাইরে থেকে সমর্থন জানাবে – এই সমস্ত প্রশ্নে তাঁদের পার্টির অভ্যন্তরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে এটুকু দেখাই যাচ্ছে যে, ‘জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের’ পথে বর্তমান পর্যায়ে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সীমানাকে বর্ধিত করার যে কর্মসূচি তাঁদের রয়েছে, নির্দিষ্ট অর্থে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের দাবি যার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু, তাতে তাঁরা বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষকে স্বাভাবিক নেতা হিসাবে মেনে নিয়েছেন ও নিজেরা হয়ে উঠেছেন তাঁদের স্বাভাবিক মিত্র। বর্তমান স্তরে, যারা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিপ্লবী বিস্তারের জন্য কোনো শক্তি ভারতের বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের মধ্যে খুঁজে পান না বরং তার জন্য নির্ভর করেন গ্রামাঞ্চলের ব্যাপক দরিদ্র ও মেহনতি কৃষক সম্প্রদায়ের উপর, সেই বিপ্লবী গণতন্ত্রের শক্তিগুলি সিপিআই(এম)-এর কাছে ‘বাম শক্তি’ হিসাবে গণ্য হন না, বিপরীতে তারা গ্রামাঞ্চলে ‘কৃষক ঐক্যে' ভাঙ্গন সৃষ্টিকারী নৈরাজ্যবাদী শক্তি হিসাবেই গণ্য হন। এটি খুবই স্বাভাবিক, কেননা গ্রামাঞ্চলে আমাদের সংগ্রাম অপরিহার্যভাবে তাঁদের ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুদের সামাজিক ভিত্তিতেই আঘাত হানে।

বাম কনফেডারেশনের আমাদের স্লোগান কৌশলগত লাইনের প্রশ্নে তাঁদের সাথে বস্তুগত বৈপরীত্যকেই প্রতিফলিত করে। এমন এক পরিস্থিতিতে তাঁদের সাথে সংগ্রামই বস্তুগতভাবে প্রধান দিক হয়ে আছে। এই স্লোগান তাঁদের সাথে রাজনৈতিক বিতর্কের সুনির্দিষ্ট ও ধারালো করার এবং সেই ভিত্তিতে তাঁদের কর্মীবাহিনী ও প্রভাবিত জনগণের সাথে আন্তঃক্রিয়া বাড়াতে অবশ্যই সাহায্য করবে। এই পর্যায়ে তাঁদের সাথে কোনো বড় আকারে ঐক্যবদ্ধ কার্যকলাপ চালানো ও সম্পর্ককে কোনো সংস্থাবদ্ধ রূপ দেওয়ার আশু সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে বিহারে রাজ্যস্তর পর্যন্ত ও অন্য কোথাও কোথাও স্থানীয় স্তরে ঐক্যবদ্ধ কার্যকলাপ সম্ভব হয়েছে। পশ্চিমবাংলাতেও স্থানীয় স্তরে তাঁদের কর্মীবাহিনীর সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক ও এমনকি কিছু কিছু যৌথ কার্যকলাপ যে চালানো যায় তা কয়েকটি এলাকার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়েছে। সর্বত্রই তাঁরা শুরু করেন আমাদের বিচ্ছিন্ন করার বা যেখানে তাঁরা শক্তিশালী সেখানে আমাদের আক্রমণ করে উৎখাত করার মরীয়া প্রচেষ্টা দিয়ে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে যেখানেই আমরা এই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে টিকে থাকতে পেরেছি, সেখানেই পরবর্তীকালে তাঁদের মনোভাব পাল্টেছে ও সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে অবশ্যই আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু তাঁদের মনোভাবে কোনো আমূল পরিবর্তনের জন্য আমাদের অবশ্যই রাজনৈতিক ঘটনাক্রমের পরবর্তী বিকাশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। পরবর্তীকালের পরিবর্তিত সম্পর্কের শর্ত সৃষ্টি হতে পারে আজকের এই নীচুতলার কাজের মধ্য দিয়েই। নীচুতলার কাজের এই কঠিন, কঠোর ও দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে গিয়ে কিছু স্লোগান বা কৌশলগত পরিচালনা দিয়ে সিপিআই(এম)-এর মতো আমাদের সাবেকী প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থান পরিবর্তনের আশা করা নিছক কল্পনাবিলাস। বিশেষত যখন সে রাজনৈতিক উত্থানের স্তরে আছে ও নেতৃত্ব তাঁদের কৌশলগত লাইনের সাফল্য সম্পর্কে কর্মীবাহিনীর মধ্যে মোহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর বলা যায় যে, সংসদীয় সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় কোনো কোনো রাজ্যে বামপন্থী সরকার গঠনের প্রশ্ন দেখা দিতে পারে ও আমরা সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারি। চতুর্থ কংগ্রেস পার্টির কৌশলগত লাইনে এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ঘটিয়েছে।

এতদিন ধরে কমিউনিস্ট বিপ্লবী মহলে এই প্রশ্ন অচ্ছুৎ হয়েই ছিল। আমরা এই প্রশ্ন তোলার সাথে সাথে ‘সব গেল-গেল’ রব পড়ে গেল। সমাজগণতন্ত্রের সাথে পার্থক্যরেখার শেষ স্তম্ভটিও খসে গেল। পার্টির অভ্যন্তরে একই ভিত্তিভূমির উপর দাঁড়িয়ে চরম দক্ষিণপন্থী অবস্থান থেকে প্রশ্ন উঠল, সিপিআই(এম) পরিচালিত বামফ্রন্ট সরকারের শরিক হওয়ার চেষ্টা করতে বাধা কোথায়!

কোনো কোনো রাজ্যে সরকার গঠনের প্রশ্ন ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সেই ১৯৫৭ থেকে সংসদীয় সংগ্রামের সর্বোচ্চ রূপ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের আগেও পার্টির অভ্যন্তরীণ সংগ্রামে সরকার গঠনের কৌশলকে বিপ্লবী কমিউনিস্টরা নাকচ করেননি। এই সরকারকে গণআন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে ব্যবহার করার কৌশল নিয়ে পার্টির মধ্যে ঐকমত্যই ছিল। সংঘাত বাধল তখনই, যখন সিপিআই(এম) নেতৃত্ব যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ব্যবহার করলেন নকশালবাড়ি আন্দোলনকে দমন করার জন্য। তার পরবর্তী সময় ছিল আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ বিপ্লবী সংগ্রামের সময়, যেখানে সংসদীয় সংগ্রাম ছিল বর্জিত এবং ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসের মুখে সিপিআই(এম)ও সরকার গঠনের সুযোগ পায়নি।

সংগ্রামের এই বিশেষ রূপের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই এগোতে হবে সতর্কতার সাথে ও ধাপে ধাপেই, তাই চতুর্থ কংগ্রেস এই প্রশ্নে কিছু সাধারণ দিশাই দিয়েছে এবং বিষয়টিকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে বিবেচনার ভার ভবিষ্যতের উপরই নির্দিষ্ট করেছে। বিপ্লবী আন্দোলনের বিকাশের কোন পর্যায়ে আমরা এই প্রশ্ন তুলব, দৃষ্টান্তস্বরূপ বিহারের আজকের অবস্থায় এই প্রশ্নে কী সম্ভাবনাগুলি রয়েছে, এসব নিয়ে পার্টির মধ্যে অবশ্যই বিচার-বিবেচনার ও বিতর্কের সূত্রপাত হওয়া উচিত। তবে চতুর্থ কংগ্রেস যেমন আমাদের নির্দেশ দিয়েছে, এ প্রশ্নে আমরা আমাদের অনুশীলনের বিকাশ ঘটাবো সিপিআই(এম) পরিচালিত বামফ্রন্ট সরকারগুলির দ্বান্দ্বিক নেতিকরণের ভিত্তিতেই।

একথা অবশ্যই সঠিক যে, কেন্দ্রের কংগ্রেসী শাসনের বিরোধিতা ও সামগ্রিকভাবে ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রে কিছুটা হলেও ফাটল সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিরোধী রাজ্য সরকারগুলির একটি ভূমিকা আছে। কিন্তু ঠিক এই অবস্থাই তো ব্যাপক গণজাগরণের শর্তও সৃষ্টি করে। অ-বাম সরকারগুলি কর্তৃক এই গণজাগরণকে আঞ্চলিকতার খাতে বইয়ে দেওয়ার যুক্তি ও প্রয়োজন বোঝা যায়। কিন্তু একটি বাম সরকারও যদি একই পথ অবলম্বন করে তাহলে ‘বামপন্থী’ ছাপ থাকলেও আমরা তার বিরোধিতা না করে পারি না।

ঐ সব কারণে কেন্দ্র বিরোধী সংগ্রামে বামফ্রন্ট সরকারগুলির সমালোচনামূলক সমর্থন ও রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বিপ্লবী বিরোধীপক্ষ, এটিই আমাদের বুনিয়াদী অবস্থান হতে পারে।

এখানে তৃতীয় প্রশ্নে এসে পৌঁছচ্ছি। বাম কনফেডারেশন-এর কথা আমরা বলেছি নির্দিষ্টভাবে রাজীব হঠাও স্লোগান-কে ধরে। একই স্লোগান থাকলেও বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের চেয়ে বাম শক্তিগুলির যে এক গুণগত আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে, জনগণের মৌলিক দাবিগুলি নিয়ে গণআন্দোলনের সাথে যে রাজীব হঠাও-এর প্রশ্নকে বামপন্থীরা জুড়তে চায়, বুর্জোয়া বিরোধীদের সাথে বামেদের সমঝোতা শুধু যে ইস্যুভিত্তিক ও ক্ষণস্থায়ী – বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের সাপেক্ষে বামেদের এই স্বাধীনতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার স্বার্থেই বাম কনফেডারেশনের প্রয়োজন।

বামফন্ট ও জাতীয় ফ্রন্টের মধ্যে পার্থক্য শুধু যে বিজেপির সাথে জোট করা না করা নিয়ে, জনগণের চেতনায় প্রশ্নটি এইভাবেই যাচ্ছে। তা বামেদের স্বাধীন অস্তিত্বকে নিছক সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে।

আমাদের প্রচারের ধারা এটিই হতে পারে যে এই কনফেডারেশনে সিপিআই(এম)-এর সাথে আমাদের ঐক্য অবশ্যই সম্ভব যেহেতু জাতীয় পরিপ্রেক্ষিতে বামফন্ট সরকারের এক প্রাসঙ্গিকতা আমরা মেনেই নিয়েছি, এই সরকারগুলির কেন্দ্র বিরোধী সংগ্রামকে আমরা সমর্থন জানাই ও এই সরকারকে ভেঙ্গে  দেওয়ার কেন্দ্রের যে কোনো চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আমাদের কোনো বাধা নেই। পশ্চিমবাংলার অভ্যন্তরে এই সরকারের জনবিরোধী কার্যকলাপের আমাদের বিরোধিতা বা অন্যদিকে বিহারে আমাদের কৃষক সংগ্রামের প্রতি সিপিআই(এম)-এর বিরোধিতা কনফেডারেশনের অভ্যন্তরে বিতর্কের বিষয়বস্তু হয়ে থাকতে পারে। ন্যূনতম যে সাধারণ বিষয়গুলি আমাদের মধ্যে আছে সেখান থেকেই আমাদের শুরু করা উচিত ও শুরু করা সম্ভবও বটে।

বিহারে আমরা দেখেছি, বামফন্ট সরকার সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা আমাদের কৃষক সংগ্রাম সম্পর্কে সিপিআই(এম)-এর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে উভয়পক্ষই অবিচল থাকলেও রাজ্য স্তরেও যৌথ কার্যকলাপ সম্ভব হয়েছে। এমনকি, বুর্জোয়া বিরোধীপক্ষের সাথে একসাথে যৌথ কার্যকলাপ চালালেও সিপিআই, সিপিআই(এম), আইপিএফ-এর মতো বাম পার্টিগুলির নিজেদের মধ্যে এক পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত – এই প্রস্তাব তিনটি পার্টির মধ্যেই চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিহারে আজকে যে বীজ পোঁতা হচ্ছে, সেটিই আগামীদিনে একটি বাম কনফেডারেশনের রূপ নিতে পারে।

এই বাম কনফেডারেশনের উদ্যোগ অবশ্যই আসবে সাধারণভাবে হিন্দি বলয়ে, বিশেষ করে বিহার থেকে। আইপিএফ-এর মাধ্যমে যে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের সূত্রপাত আমাদের পার্টি আজ থেকে সাত বছর আগে করেছিল, তা হিন্দি এলাকায় নির্দিষ্ট অবস্থায় যে বামপন্থার পুনরুত্থানের বার্তা বহন করে আনছে তার ইঙ্গিত আমরা পেতে শুরু করেছি। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ও ভারতীয় রাজনীতির স্নায়ুকেন্দ্রে, যেখানে বামপন্থী আন্দোলন শিকড় গাড়তে পারেনি, আজ এক নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বামপন্থী আন্দোলনের তিনটি প্রধান ধারার সম্মিলন-ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে এই এলাকাই। বিহার ও উত্তরপ্রদেশে সিপিআই-সিপিআই(এম)-এর কর্মীবাহিনী ও প্রভাবিত জনগণের বড় সংখ্যায় আইপিএফ-এ যোগদান এই সম্মিলনের একটি রূপ। প্রথমে সিপিআই-এর সাথে, ক্রমে ক্রমে সিপিআই(এম)-এর সাথে যৌথ কার্যকলাপের সূত্রপাত এই সম্মিলনের দ্বিতীয় রূপ। এই ধারা অবশ্যই এগিয়ে যাবে ও জাতীয় পর্যায়ে বাম কনফেডারেশনের ভিত্তি রচনা হবে এই এলাকাতেই – কনফেডারেশনে থাকবে আমাদের স্বাধীন উদ্যোগের গ্যারান্টি।

আশ্চর্যজনক শোনালেও দ্বান্দ্বিক সত্য এটিই যে, কনফেড়ারেশন গঠনের এই প্রচেষ্টায় পশ্চিমবাংলার বিপ্লবী কমরেডরা তাঁদের অবদান রাখতে পারেন সম্পূর্ণ বিপরীতভাবেই, অর্থাৎ বামফ্রন্ট সরকারের জনবিরোধী নীতি ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বিপ্লবী বিরোধীপক্ষের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে।

(লিবারেশন, নভেম্বর ১৯৮৮ থেকে)

আমাদের পার্টির চতুর্থ সর্বভারতীয় কংগ্রেসে এক বাম ও গণতান্ত্রিক কনফেডারেশন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। এমন এক পরিস্থিতিতে এই আহ্বান জানানো হয় যখন ভারতের বাম আন্দোলন এক দীর্ঘ সময় পর বড় ধরনের অগ্রগতির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এই শ্লোগানের অন্তর্বস্তু ও তার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পার্টি কংগ্রেসে বলা হয়, “বর্তমান পর্যায়ে সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বাধীন বিকল্পের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে প্রধানত সংগ্রামের এবং গৌণত ঐক্যের। আর ঐক্যের এই দিকটির অর্থ হল রাজীব হঠাও আন্দোলনে যতদূর সম্ভব সহযোগিতা। এখন রাজনৈতিক বিকাশের প্রক্রিয়ায় বামফ্রন্ট সরকারগুলিকে উৎখাত করার জন্য কেন্দ্রের সরাসরি আক্রমণ, জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের জোয়ার এবং ফলস্বরূপ আমাদের শক্তি বলিষ্ঠতর হয়ে ওঠার দরুণ পরিস্থিতির বিরাট পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই সময়ে সংগ্রামের দিকটি গৌণ ও ঐক্যের দিকটি প্রধান হয়ে উঠতে পারে এবং সম্পূর্ণ নতুন এক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ব্যাপকতর বাম ও গণতান্ত্রিক কনফেডারেশন গড়ে ওঠার পরিস্থিতি পেকে উঠতে পারে”।

এখন বিভিন্ন দিক থেকে পার্টি কংগ্রেসের এই স্লোগানকে বিশ্লেষণ করা যাক। প্রথমত আমাদের দেখতে হবে যে একটি স্লোগান সূত্রায়নে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত। একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে, শ্রেণীশক্তি ভারসাম্যের এক নির্দিষ্ট অবস্থায় যা অর্জন সম্ভব কেবলমাত্র তার উপর ভিত্তি করেই কি আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত, না কি আশু বাস্তবায়নের সম্ভাবনা-নিরপেক্ষভাবে স্লোগানকে বিকাশমান প্রবণতাগুলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে উঠতে হবে? আমাদের স্লোগান কি কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে বাস্তবায়নের সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করবে নাকি তাকে সমস্ত সম্ভাব্য বিকাশকে হিসাবে রাখতে হবে? মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে আমাদের দিশার, আমাদের অন্তিম লক্ষ্যের অভিমুখে আমরা যতদূর পর্যন্ত নজর করতে পারি তার উপরই আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্থাপন করা উচিত। এর অর্থ হল, আমাদের স্লোগানকে হতে হবে বাস্তবসম্মত এবং এতে যেমন বর্তমানের নির্দিষ্ট কর্তব্যকর্মগুলি থাকবে, তেমনি তাতে আমাদের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলার পথের দিশাও থাকবে। একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে যা অর্জন করা সম্ভব, শুধুমাত্র তাতে আমাদের স্লোগান ও কর্তব্যকর্মকে সীমাবদ্ধ রাখা হল প্রয়োজনবাদ। এর সাথে মার্কসবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। অনুরূপভাবে, বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্নভাবে এবং আত্মগত আকাঙ্খা থেকে স্লোগান দেওয়া রাজনৈতিক জুয়াখেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। “কমিউনিস্টরা বর্তমানের মধ্যে ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করে” – এঙ্গেলসের এই বিখ্যাত উক্তিটি হল স্লোগান সূত্রায়নে আমাদের পরিচালনকারী দিশা। যারা বর্তমানের মধ্যে কেবলমাত্র বর্তমানেরই প্রতিনিধিত্ব করে সেই সংশোধনবাদীদের থেকে এবং  যারা বর্তমানকে অস্বীকার করে নিছক ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্নে বিভোর থাকে সেই কল্পনাবিলাসীদের থেকেও আমাদের নিজেদের পার্থক্য করতে হবে। ব্যাপক জনগণ যাতে আমাদের স্লোগান থেকে আমাদের দিশাকে বুঝতে পারেন তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

আমি মনে করি এক বাম ও গণতান্ত্রিক কনফেডারেশন গড়ে তোলার জন্য আমাদের স্লোগান মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই স্লোগান একদিকে বাম ও বাম ঘেঁষা পার্টিগুলির সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া ও যৌথ কার্যকলাপ গড়ে তুলতে আমাদের প্রচেষ্টাকে গতি দেবে, অপরদিকে সমাজগণতন্ত্রীদের ‘বামফ্রন্ট সরকার কেন্দ্রিক বাম ও গণতান্ত্রিক বিকল্প’-এর বিপরীতে আমাদের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক বিকল্পের দিশাকে স্পষ্ট করবে। এক নতুন ভিত্তিতে – জঙ্গী গণআন্দোলনের ভিত্তিতে এক বাম ও গণতান্ত্রিক কনফেডারেশন গড়ে তোলার জন্য আমাদের স্লোগান, আমরা সাধারণত যেভাবে ভেবে থাকি, ঠিক সেভাবে বাস্তবায়িত নাও হতে পারে, কিন্তু তা নিশ্চিতভাবেই বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে এক নতুন মেরুকরণ ঘটাবে। এই মেরুকরণ ঠিক কীভাবে ঘটবে তা আমরা এই মুহূর্তে ভবিষ্যতবাণী করতে পারি না। কিন্তু এটি নিশ্চিত যে বিপ্লবী গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে এটি আমাদের আর এক ধাপ এগিয়ে দেবে।

এখানে স্বাভাবিকভাবেই যে প্রশ্ন ওঠে তা হল সিপিআই(এম)-এর প্রস্তাবিত বাম ও গণতান্ত্রিক বিকল্পের সাথে আমাদের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক বিকল্পের ধারণার বুনিয়াদী পার্থক্যকে স্বীকার করা হবে কি না। এই বুনিয়াদী পার্থক্যকে স্বীকার করলে ধারণা দুটির মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হবে মুখ্য এবং যৌথ কার্যকলাপের স্থান হবে এর অধীন। বামফ্রন্ট সরকারগুলির প্রতি আমাদের নির্দিষ্ট কৌশল সম্পর্কে বিতর্ক চলতে পারে এবং তা প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। কিন্তু সিপিআই(এম)-এর সঙ্গে ঐক্যের নামে, বামফ্রন্ট সরকারগুলির মূল্যায়নের নামে মৌলিক পার্থক্যকে গুলিয়ে দেওয়ার যে কোনো প্রচেষ্টা আত্মঘাতী হতে বাধ্য। আমাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে ব্যবহারিক বাস্তবতার নামে এই মৌলিক পার্থক্যকে কেউ গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি পার্টি মানসিকতা ও বিপ্লবী মানসিকতা হারাবেন এবং বিভিন্ন ধরনের বিলোপবাদী প্রবণতার শিকার হবেন।

এক বাম ও গণতান্ত্রিক কনফেডারেশন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টিতে আমরা বিকাশের যে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াকে প্রত্যক্ষ করছি এবং আমাদের শ্লোগানে যা প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছি তা কি বাস্তব? এই প্রশ্ন গভীর অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণের দাবি করে।

আমাদের শ্লোগানের ঐতিহাসিক ভিত্তি কী? সিপিআই, সিপিআই(এম) ও সিপিআই(এমএল) হল একদা ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যকার তিনটি ধারা। ১৯৬৪ সালে, জাতীয় গণতন্ত্র বনাম জনগণতন্ত্রের স্লোগানকে কেন্দ্র করে পার্টি সিপিআই ও সিপিআই(এম)-এ বিভাজিত হয়ে যায়। সিপিআই(এম)-এর মধ্যে একেবারে শুরু থেকেই জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের দুই কৌশলগত লাইনের মধ্যে – সুবিধাবাদী লাইন ও বিপ্লবী লাইনের মধ্যে – সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়। কৌশলগত লাইনের এই সংগ্রাম পরবর্তীতে নকশালবাড়ির সংগ্রাম ও যুক্তফ্রন্ট সরকারের মধ্যে নির্দিষ্ট সংঘাতের সুস্পষ্ট রূপ নেয় এবং আমাদের পার্টি সিপিআই(এমএল)-এর জন্ম হয়। সুবিধাবাদী ও বিপ্লবী – এই দুই ধারার মধ্যকার সংগ্রাম আজও সমাজগণতন্ত্র ও বিপ্লবী গণতন্ত্রের মধ্যকার সংগ্রামের মধ্যে অব্যাহত।

ইতিমধ্যে পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। ভারতীয় শাসকশ্রেণী আর লাল সরকারের, বামফ্রন্ট সরকারের ভূত দেখে না। এই ধরনের সরকারের দীর্ঘ অস্তিত্বকে তারা আর তাদের শ্রেণীস্বার্থের প্রতি বিপদ হিসাবে মনে করে না। বিপরীতে, গণআন্দোলনগুলির বিরুদ্ধে এই সরকারগুলিকে বেশি বেশি করে ব্যবহার করা যাচ্ছে। সুতরাং যারা এই সরকারগুলির মধ্যে এখনও বিপ্লবী প্রবণতা খোঁজেন, তারা মুর্খের স্বর্গে বাস করছেন। অবশ্য এই প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে সংসদীয় সীমানার মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক উপরিকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের দাবিতে এই সরকারগুলি সোচ্চার হয়েছে। এই রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সিপিআই(এম) পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় তার গণভিত্তিকে বাড়াতে পেরেছে এবং নতুন নতুন শক্তিকে, বিশেষ করে যুবকদের সমাবেশিত করতে সফল হয়েছে। সিপিআই-ও বাধ্য হয়েছে কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে এবং কিছু আন্দোলন গড়ে তোলার পথে গেছে। তাই “রাজীব হঠাও” ইস্যুতে বাম দলগুলির রাজনৈতিক উদ্যোগের ফলে তাদের সাথে যৌথ কার্যকলাপের সম্ভাবনা বেড়েছে।

এখন আমাদের পার্টির বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি বিচার করা যাক। মধ্যবর্তী এই পর্বে আমাদের পার্টির মধ্যে নয়া বাম ও নৈরাজ্যবাদী ধারণাগুলি মাথাচাড়া দেয়। এই ধারণাগুলি ধীরে ধীরে দেশের মাটি থেকে, কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল ধারা থেকে আমাদের পার্টিকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। এই প্রক্রিয়ার পরিণতিতে খোদ পার্টিরই বিলোপ ঘটত। এমনকি আজও বিভিন্ন গ্রুপ এই সমস্ত ধারণা নিয়ে চলেছে এবং ফলস্বরূপ প্রান্তিক রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। কেউ অধঃপতিত হয়েছে পুঁথিবাগীশ গোষ্ঠীতে, কেউ জাতিসত্তা বা সংখ্যালঘুদের আন্দোলনকে আঁকড়ে ধরেছে, আবার কেউ কেউ কিছু দূরবর্তী এবং বিছিন্ন পাহাড়ে ও জঙ্গলে সশস্ত্র কার্যকলাপ পরিচালনা করার নামে নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যাপার হল তারা এই পরিস্থিতিকে নিয়তি হিসাবে মেনে নিয়েছেন। এক সর্বভারতীয় পরিপ্রেক্ষিত ছাড়া, চলমান দেশজোড়া রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ ছাড়া, নিছক স্থানীয় ও আংশিক সংগ্রামগুলির, তা সে যতই জঙ্গী হোক, কোনো তাৎপর্য কমিউনিস্টদের কাছে নেই। পনেরো বছরের কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে আমরা ছিন্নভিন্ন অবস্থা থেকে একটি কেন্দ্রীভূত ও ঐক্যবদ্ধ পার্টি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি, সংগ্রাম ও সংগঠনের ক্ষেত্রে একপেশে ধারণাকে অতিক্রম করে সংগ্রামের বিভিন্ন রূপের সমন্বয়ের চেষ্টা চালাচ্ছি, চেষ্টা চালাচ্ছি স্থানীয়তাবাদের সীমানাকে অতিক্রম করে দেশজোড়া রাজনৈতিক সংগ্রামে বিপ্লবী গণতন্ত্রের ধারা হিসাবে নিজেদের জোরালো আত্মঘোষণার জন্য। বিলোপের মুখ থেকে ফিরে এসে সিপিআই(এমএল) নতুন জীবন লাভ করেছে। এই পরিস্থিতি বিভিন্ন বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া চালানোর সুযোগ বাড়িয়েছে, বামপন্থী দলগুলির সঙ্গে বিভিন্ন স্তরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ও যৌথ কার্যকলাপ চালাতে শর্ত সৃষ্টি করেছে এবং তাদের গণভিত্তিকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে আমাদের প্রচারকে আরও বাস্তবসম্মত করেছে। সিপিআই, সিপিআই(এম) বা বামফ্রন্ট সরকারগুলিকে নিছক নাকচ করার মধ্যেই যা সন্তুষ্ট থাকে সেই পেটিবুর্জোয়া বিপ্লববাদে নিমগ্ন হওয়ার পরিবর্তে আমরা আমাদের সমালোচনাকে আরও নির্দিষ্ট করেছি। এর আগেও আমরা নীচ থেকে ব্যাপক বাম ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলেছিলাম, কিন্তু তা এগোতে পারেনি, কেননা তার জন্য দরকার ছিল ওপর থেকেও কিছু চুক্তি করা। কৌশলের এই বিকাশ নীচতলা থেকে বাম ঐক্য গড়ে তোলার কাজে কার্যকরী অগ্রগতি ঘটাতে পারে। বিপ্লবী সংকট গভীর হওয়ার সাথে সাথে ঐতিহাসিক নিয়ম হিসাবে ব্যাপক বামপন্থী জনগণ বিপ্লবী ধারার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং বিভিন্ন বাম দলগুলি বা তাদের বড় একটি অংশ সেই ধরনের পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে যা পরোক্ষভাবে হলেও বিপ্লবী গণতন্ত্রের পক্ষে যাবে। যদি আমরা আজ থেকে বাম ঐক্যের জন্য শর্ত সৃষ্টি করতে আমাদের প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখি, তবে ভবিষ্যতে কনফেডারেশন গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিজেদের হাতে রাখতে সক্ষম হব।

আমাদের স্লোগান আমাদের শিক্ষা দেয় যে আমরা ভারতের বাম আন্দোলন থেকে আলাদা নয়, বরং বাম আন্দোলনের মধ্যকার বিপ্লবী ধারা। এই স্লোগান আমাদের জন্য বিরাট বিপ্লবী সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয় এবং এই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে আমাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার দাবি জানায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের শ্লোগানের কী প্রাসঙ্গিকতা আছে? আমরা দেখছি শাসক শ্রেণীর উভয় রাজনৈতিক সংগঠন কংগ্রেস ও ন্যাশন্যাল ফ্রন্ট বামেদের ব্যবহার করতে সচেষ্ট। কংগ্রেস যেখানে বাম শক্তিকে বিভক্ত করতে ও তাদের নিষ্ক্রিয় সহযোগীতে পরিণত করতে জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করার পুরোনো খেলা খেলছে, ভি পি সিং সেখানে “বামপন্থীরা আমার স্বাভাবিক মিত্র” ঘোষণা করে বামপন্থী শক্তিগুলিকে তাঁর পিছনে সামিল করতে চাইছেন। অতীতে ফ্যাসি-বিরোধী জোটের নামে কংগ্রেসের সহযোগী হয়ে সিপিআই মারাত্মক ভুল করেছিল এবং আজ যুক্তরাষ্ট্রীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্পের নামে ন্যাশন্যাল ফ্রন্টের শোভাযাত্রায় যোগ দেওয়া একই রকম মারাত্মক ভুল হবে। আজ প্রয়োজন বাম ঐক্যকে শক্তিশালী করা এবং আমাদের স্বাধীন আত্মঘোষণার ভিত্তিতে ন্যাশন্যাল ফ্রন্টের মধ্যে মেরুকরণ ঘটানোর চেষ্টা চালানো। ন্যাশন্যাল ফ্রন্ট এক অস্থায়ী রাজনৈতিক মঞ্চ এবং তার শরিকদের মধ্যে জনতা পার্টি ও লোকদল গুরুতর অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে। সুতরাং বাম শক্তিগুলির স্বাধীন উদ্যোগ এক শক্তিশালী বিরোধীপক্ষ হিসাবে তাদের উত্থান ঘটাবে। কনফেডারেশনের শ্লোগানের ভিত্তিতে এই প্রচারাভিযানকে আমরা বাম-ঘেঁষা জনগণের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলতে পারি।

সর্বোপরি, সিপিআই(এম)-এর থেকে স্বাধীনভাবে নিজেদের পরিচিতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার এবং এমনকি বামফ্রন্ট সরকারের জনবিরোধী পদক্ষেপগুলির বিরুদ্ধে সমালোচনা করার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা বামফ্রন্ট শরিকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। সিপিআই বিভিন্ন রাজ্যে সিপিআই(এম)-এর থেকে আলাদাভাবে নিজেদের কর্মসূচি গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই সমস্ত শরিকরা সাধারণভাবে, এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও, আমাদের সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া করতে এগিয়ে আসছে। এমনকি সিপিআই(এম)-এর মধ্যেও বিভিন্ন স্তরে আমাদের পক্ষে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রবণতা রয়েছে। কনফেডারেশনের স্লোগান এই সমস্ত প্রবণতাগুলিকে তীব্রতা দিতে বাধ্য।

সারসংক্ষেপ করলে বলা যায়, মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, এক ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিচার থেকেও এক বাম ও গণতান্ত্রিক কনফেডারেশ গড়ে তোলার জন্য আমাদের স্লোগান নিশ্চিতভাবেই যথাযথ। কিন্তু এই সমস্ত কার্যকলাপের নেতৃত্বের কেন্দ্র হিসাবে আমাদের পার্টি যদি কোনো কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, যদি স্বাধীনভাবে গণআন্দোলন গড়ে তোলার কাজে অবহেলা করা হয়, তাহলে আমরা এই লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। সুতরাং আজকের আওয়াজ হোক : পার্টিকে দুর্বল করার সমস্ত চক্রান্ত নির্মূল করুন, আমাদের স্বাধীন গণভিত্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলুন এবং এক বাম ও গণতান্ত্রিক কনফেডারেশন গড়ে তোলার সংগ্রামে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চলুন।

(জানুয়ারি ১৯৮৮, চতুর্থ পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট থেকে)

এখানে আমরা পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকারের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের কথা বিশেষভাবে মাথায় রেখে সিপিআই(এম)-এর রাজ্যে রাজ্যে সরকার গঠনের কৌশল ও তার নির্দিষ্ট প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করবো।

এই ধরনের সরকার গঠন সম্পর্কে সিপিআই(এম)-এর কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে : (১) গণআন্দোলনের মধ্য থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পার্টির নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজ্যে সরকার গঠন করা যেতে পারে। এই কৌশল হল সংগ্রামের এক উত্তরণশীল রূপ। (২) এই ধরনের সরকারগুলি জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার উদ্দেশ্যে কতকগুলি সংস্কারমূলক ব্যবস্থা হাতে নেবে। এই কৌশল জনগণকে এক সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রামে জেগে উঠতে সাহায্য করবে। (৩) এই ধরনের সরকার চালানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জনগণ বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে শিক্ষিত হয়ে উঠবেন।

এই কর্মসূচি যখন সূত্রবদ্ধ করা হয় তখন পার্টি এই ধরনের সরকারগুলির স্থায়িত্বের সম্ভাবনা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিল না। কর্মসূচিতে তাই কিছু কিছু কল্যাণমূলক ব্যবস্থারই কেবল উল্লেখ করা হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে জনগণের এক সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠার কথা। কেন্দ্রে এই ধরনের একটি সরকার গঠনের প্রশ্নকে খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল আর সিপিআই-এর সঙ্গে বড় পার্থক্যটা ছিল ঠিক এখানেই। কারণ সিপিআই-এর কাছে বিপ্লবের পথ ছিল সম্পূর্ণভাবেই সংসদীয় পথ, যার মূল বিষয়টি হল কংগ্রেসের মধ্যেকার প্রগতিশীল অংশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কেন্দ্রে একটি সরকার গঠন।

১৯৭৭-এর পরে অবশ্য সিপিআই(এম) এক স্ববিরোধী পরিস্থিতির মধ্যে পড়ল। সে যে পশ্চিমবাংলা, কেরল ও ত্রিপুরা এই তিনটি রাজ্যে সরকার গঠন করতে সফল হল শুধু তাই নয়, ১৯৬৭-৬৯ পর্যায়ের বিপরীতে এই দফায় উপর্যুপরি তৃতীয়বার নির্বাচনে বেশ ভালোভাবে জয়লাভ করে পশ্চিমবাংলার সরকার সমগ্র এক দশক ধরে টিকে রইল। আর যদি অস্বাভাবিক কিছু না ঘটে তাহলে ত্রিপুরা সরকারও পরপর তিনবার বিজয় অর্জন করার জন্য তৈরি হয়েই রয়েছে। এছাড়া পাঁচ বছরের ব্যবধানে কেরলে আবার ফিরে এসেছে বাম ও গণতান্ত্রিক সরকার। ১৯৭৭-এর পর থেকে, কেন্দ্রীয় সরকার অথবা বলা যায় শাসকশ্রেণীগুলির দিক থেকেও এই সব সরকার উৎখাত করার জন্য কোনো সংবিধান-বহির্ভূত পদক্ষেপ দেখতে পাওয়া যায়নি, সংসদীয় খেলার নিয়ম কানুনই বরং মোটামুটি মেনে চলা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই নিরবচ্ছিন্ন শাসন ‘উত্তরণশীল সরকারের’ উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। কিছু কিছু কল্যাণমূলক ব্যবস্থা চালু করা এবং জনগণকে বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে শিক্ষিত করে তোলাটাই যথেষ্ট বলে প্রমাণিত হয়নি। পার্টি তাই কেন্দ্রের কাছ থেকে আরও বেশি অর্থ ও ক্ষমতা এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের দাবির উপরই সবচেয়ে জোর দিয়েছে। বিগত দশ বছর যাবৎ এটাই হয়ে রয়েছে পার্টির কেন্দ্রীয় স্লোগান তথা রাজনৈতিক চরিত্র নির্বিশেষে সমস্ত রাজ্য সরকারগুলির একটি যুক্তমোর্চা রচনা করার জন্য মূল রণনীতি (প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে, শ্রী জ্যোতি বসু প্রায়শই বহু কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও ঐক্যবদ্ধ হন)। জনগণকে যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তা হল কেন্দ্র বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার বিরুদ্ধেই বৈষম্য করে এবং আরও বেশি অর্থ ও ক্ষমতা থাকলে রাজ্য সরকার জনগণের জন্য সত্যি সত্যিই আরও অনেক বেশি কিছু করতে পারে। এই প্রচার প্রায়শই এই জাত্যাভিমানী প্রচারের কাছাকাছি পৌঁছে যায় যে বাংলা ও বাঙালিরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলার স্বার্থরক্ষার জন্য তাই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে লড়াই চালাতে এমনকি পশ্চিমবাংলার কংগ্রেস(ই) সংসদ সদস্য ও বিধায়কদেরও সহযোগিতা চাওয়া হয়, যার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে অশোক সেন-এর সঙ্গে সাম্প্রতিক আঁতাত।

তার উপরে বাংলার ‘শিল্পায়নের’ দায়িত্বও পড়েছে সরকারের কাঁধে। এর জন্য, ধর্মঘট ও জঙ্গী শ্রমিক আন্দোলনকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি সরকারকে দেশীয় একচেটিয়া ঘরানা ও বহুজাতিক সংস্থাগুলির সহযোগিতা চাইতে হয়েছে। শিল্পের ক্ষেত্রে পশ্চিমবাংলা  গুরুতর সংকটে ভুগছে বলে এই ‘দায়িত্বের’ বোঝা আরও ভারী হয়ে উঠেছে। শিল্পে রুগ্নতার ঘটনা রাজ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত এমন কোনো রাস্তা নেই যাতে বর্তমান অবস্থায় শ্রমিকশ্রেণী নিজের কাঁধে শিল্পায়নের দায়িত্ব তুলে নিতে পারে। কেবলমাত্র একচেটিয়া ও বহুজাতিক সংস্থাগুলির পক্ষেই এখন এই কাজ করা সম্ভব। বিষয়টাই তাই আজ শিল্পে শান্তি বজায় রাখার আহ্বানে এসে ঠেকেছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই আহ্বান পশ্চিমবাংলায় সিটুর চরিত্রকে আমূল পাল্টে দিয়েছে। শ্রমিকদের দ্বারা সিটুর এই নির্দেশ অমান্য করার ঘটনা প্রায়শই রাজ্য সরকারের দমনের সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘকাল এই নীতি অনুসরণ করে চলার ফল হিসাবে দেখা যাচ্ছে শ্রমিকশ্রেণীর থেকে পার্টির ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা, যার প্রকাশ ঘটেছে পর পর কয়েকটি নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যে। পার্টি অবশ্য ইন্দিরা হত্যার পরবর্তী অস্বাভাবিক হাওয়ার অজুহাত দিয়ে ১৯৮৪-র লোকসভা নির্বাচনে প্রায় সমস্ত বড় বড় ট্রেড ইউনিয়ন নেতার পরাজয়ের সাফাই গাইতে চেয়েছে। আর ১৯৮৭-র বিধানসভা নির্বাচনে বেশ কয়েকটি শ্রমিক কেন্দ্রে পরাজয়ের কারণ হিসাবে অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে বিরাজমান তথাকথিত জাতপাতভিত্তিক, সাম্প্রদায়িক এবং হিন্দি জাত্যাভিমানী মনোভাবকে দায়ী করা হয়েছে। নিজস্ব অস্তিত্বের বস্তুগত শর্তের চাপে, বামফ্রন্ট সরকার আরও বেশি বেশি করে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ম্যানেজারের মতো আচরণ করছে; অথবা আরও ভালোভাবে বলতে গেলে সে নিজের কাঁধে সংকট সামাল দেওয়ার দায়িত্ব তুলে নিয়েছে।

প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে পরিচালনা করা, শ্রমিক ও কৃষকদের কিছু কিছু অংশের প্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়া এবং জুনিয়র ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জাতীয় সংখ্যালঘু ইত্যাদির মতো সমাজের নানা বিক্ষুব্ধ অংশের আন্দোলনের মোকাবিলা করার দায়িত্ব সরকারের কাঁধে এসে পড়েছে। এই দায়িত্ব পুলিশ প্রশাসনকে মজবুত করা এবং পুলিশ অফিসার ও তাদের দমনমূলক মনোভাবকে সমর্থন করার অপ্রীতিকর রাস্তায় সরকারকে যেতে বাধ্য করেছে। গণআন্দোলন মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গিও একান্ত গতানুগতিক। গোর্খা আন্দোলন দমন করার জন্য কেন্দ্রের কাছ থেকে সে আরও বেশি বেশি সিআরপিএফ চেয়ে পাঠিয়েছে এবং যে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন পশ্চিমবাংলায় প্রয়োগ করবে না বলে অঙ্গীকার করেছিল, তাও কাজে লাগিয়েছে।

গ্রামাঞ্চলে অবশ্য সিপিআই(এম) এখনও বিপুল গণ সমর্থন ভোগ করে এবং সে তার নিজের সামাজিক ভিত্তিকে বাড়িয়ে নিতেও সফল হয়েছে। অপারেশন বর্গা, পঞ্চায়েত এবং বিভিন্ন ত্রাণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সে কিছু কিছু কৃষিসংক্রান্ত সংস্কার ঘটিয়েছে এবং ছোটো ছোটো জোতগুলির প্রতি সরকারি সহায়তার মাধ্যমেও কৃষি-উন্নয়ন সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোয় এই ব্যাবস্থাগুলির একটিই মাত্র ফল হতে পারত এবং হয়েও ছিল তাই, অর্থাৎ পুঁজিবাদী কৃষির বিকাশে উৎসাহ দান।

আর একজন সিপিআই(এম) তাত্ত্বিক অবশ্য ১৯৮৭-র শারদীয়া দেশহিতৈষী-তে রাজ্যের গ্রামীণ চিত্রের ব্যাপারে অনেকটা বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন রেখেছেন। তাঁর মতে –

১। গ্রামাঞ্চলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আয়ের তারতম্য কমানো যায়নি।

২। প্রতিটি এলাকায় এমন সব ঘটনা দেখতে পাওয়া যাবে যেখানে বর্গাদার জমির মালিককে স্বেচ্ছায় জমি ছেড়ে দিয়েছে এবং যে সব গরিব কৃষকরা পাট্টা পয়েছেন তাঁরা মধ্য কিংবা ধনী কৃষককে বার্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে জমি লিজ দিয়ে দিয়েছেন।

৩। কৃষকদের জমি হারিয়ে ভূমিহীনদের দলে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করা যায়নি, বরং সেটা এক জটিল রূপ নিয়েছে।

৪। মজুর ভাড়া করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। কৃষিশ্রমিকদের সংখ্যা অনেকখানি বেড়ে গেছে। নিয়মিতভাবে রেল স্টেশনগুলিতে ও গ্রামীণ বাজারে জড়ো হয়ে তারা নিজেদের শ্রমক্ষমতা বিক্রির চেষ্টা করছেন – এটা এক পরিচিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সবই আসলে পুঁজিবাদী অর্থনীতি গড়ে ওঠা এবং আধুনিক জোতদার, ধনী কৃষক ও পুঁজিবাদী ক্ষেতকারীদের আয় বৃদ্ধি পাওয়া তথা তাদের আরও সংহত হয়ে ওঠার লক্ষণ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের নিজস্ব অধ্যয়ন প্রমাণ করেছে যে পুরোনো ধরনের জমিদারতন্ত্র এবং অংশত বাঁধা মজুর রাখার ব্যবস্থাটি গুরুতরভাবে ধাক্কা খাওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাদী অর্থনীতি কিছুটা চাঙ্গা হয়েছে। সমবায় সংস্থার ঋণ এবং অন্যান্য ঋণ বা কৃষি উপকরণের সিংহভাগই পুঁজিবাদী ক্ষেতকারীরা দখল করে নিচ্ছেন। সিপিআই(এম)-এর নির্দিষ্ট কৃষি কর্মসূচি একটা ভারসাম্য রক্ষা করার প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থাৎ একদিকে ধনী কৃষক অর্থনীতির বিকাশে সহায়তা করা এবং অন্যদিকে কিছুদিন অন্তর কৃষিশ্রমিকদের মজুরি কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া। মধ্য কৃষক অর্থনীতি স্থিতাবস্থার মুখে পড়েছে। মোটের উপরে সিপিআই(এম) সর্বভারতীয় স্তরে ধনী কৃষক সহ সমস্ত কৃষকদের ঐক্য ও লাভজনক দামের দাবির উপরে ইদানিং অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রয়েছে অন্য জায়গায়। এত বছর ধরে এই সব সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকছে কিসের জোরে? আর শাসকশ্রেণীগুলিই বা কেন নির্বাচনী বিধিনিয়ম মেনে চলছে এবং এই সব সরকারকে “জনগণের সচেতনতা ও সংগঠনের মান উন্নত করতে বা বুর্জোয়া জমিদার রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে তাঁদের শিক্ষিত করে তুলতে দিচ্ছে”? সিপিআই(এম) নেতৃবৃন্দের চটজলদি জবাব হল : বাংলার জনগণের লড়াকু সচেতনতাই সেটা হতে দিচ্ছে না। তাঁরা কখনই ঘটনার অন্য দিকটি অর্থাৎ এই সমস্ত সরকারগুলিকে কাজকর্ম চালাতে দেওয়ার ব্যাপারে শাসকশ্রেণীর নতুন ও উন্নত কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন না।

নিঃসন্দেহে পশ্চিমবাংলার বামফ্রন্ট গণভিত্তি ভোগ করে এবং কংগ্রেস(ই) এখনও পর্যন্ত একটি অপদার্থ ও অসংগঠিত শক্তিই হয়ে রয়েছে (যদিও এটা মনে রাখতে হবে যে কংগ্রেস(ই) এখনও নির্বাচনে একাই প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি ভোট পায় এবং শুধুমাত্র ৫ শতাংশ ভোট এদিক ওদিক হলেই পাল্লাটা তাদের অনুকূলে ঝুঁকে পড়বে)। শাসকশ্রেণীগুলি যে এই সরকারকে চালিয়ে যেতে দিচ্ছে তার পিছনে এটিও এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বস্তুত বামফ্রন্টের গণভিত্তি আছে বলেই শিল্পে শান্তি সুনিশ্চিত করার জন্য তাকে বেছে নেওয়াটা হল বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। শাসকশ্রেণীগুলির আধিপত্যের ক্ষেত্রে এই বামফ্রন্ট এক বিপদ হিসাবে দেখা দিতে পারে কি? এই প্রশ্নে এইটুকু বলাটাই যথেষ্ট যে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য কিছু কল্যাণমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার একান্ত সাধারণ কর্মসূচি আসলে ভারতবর্ষের প্রায় সবকটি সরকারেরই কর্মসূচি। এধরনের কর্মসূচি কার্যকরী করার হারটিই কেবল বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম হয়। এর বাইরে যে জিনিসটা সিপিআই(এম) প্রচার করে বেড়ায় সেটা হল বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা। শাসকশ্রেণীগুলি এই সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে শিক্ষিত করে তোলা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের সরকারগুলির দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকাটা আসলে জনগণকে সংসদীয় গণতন্ত্রের সীমাহীন সম্ভাবনা সম্বন্ধেই বেশি শিক্ষিত করে তোলে। রাষ্ট্রব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে শিক্ষা ধীরে ধীরে প্রথমে রাজ্য সরকারগুলির সীমিত ক্ষমতার বিষয়ে এবং তারপর সীমিত অর্থভাণ্ডার সংগ্রান্ত শিক্ষায় রূপান্তরিত হয়েছে।

বর্তমান পর্যায়ে শাসকশ্রেণীগুলির রণনীতি এইসব সরকারগুলিকে ফেলে দেওয়ার জন্য চক্রান্ত করা নয় – যেমনটি সিপিআই(এম) নেতৃবৃন্দ জনগণকে অনবরত বিশ্বাস করাতে চান। বরঞ্চ রণনীতিটা হচ্ছে তাদের উপর লাগাতার চাপ সৃষ্টি করা যাতে তারা একটা দায়িত্বশীল সরকার হয়ে উঠতে পারে। আর এই প্রশ্নে সমস্ত বুর্জোয় প্রচারের মূল বিষয়বস্তু ঠিক এটাই। অভিজ্ঞতা থেকে তারা শিখেছে যে সিপিআই(এম)-এর উপর এই চাপ দিলে কাজ হবে। নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে একটা বাম সরকারকে ধীরে ধীরে একাত্ম করে নেওয়ার মতো চমৎকার নমনীয়তা বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থার অবশ্যই রয়েছে এবং বামফ্রন্ট সরকারের ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটছে। এই জরুরি প্রশ্নটিই কিন্তু সিপিআই(এম) কখনও তোলে না।

দায়িত্বশীল রাজ্য সরকার চালানো থেকে কর্মসূচির পরবর্তী যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না অর্থাৎ কেন্দ্রে সরকার গঠন করা, যেখানে সমস্ত ক্ষমতা নিহিত রয়েছে। তিনটি রাজ্য সরকার হাতে থাকায় এবং রাজীব সরকারের সংকট তীব্র হতে থাকায় পার্টির কাছে পরবর্তী পর্যায়ের তাত্ত্বিক কসরৎ দেখানোর মতো অবস্থা পেকে উঠেছিল। পশ্চিমবাংলার পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রধান নায়ক এবং নতুন লাইনের প্রধান স্থপতি জ্যোতি বসুর ভাষায় : “কেন্দ্রীয় কমিটি যে শুধু রাজীব সরকারের পদত্যাগ ও নতুন করে নির্বাচন করার দাবি রেখেছে তাই নয়, সে এক বিকল্প সরকার গঠন করার কথাও বলেছে। কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তে এই ধরনের একটা সরকারের চরিত্র কেমন হবে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে”।

এরপরে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন : “কেন্দ্রীয় কমিটির মত হল এই যে আমাদের দেশের জনগণ এমন একটা সরকার চান যার ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, যে সরকার সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলা করতে দৃঢ়সংকল্প এবং কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে, গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করতে ও সমস্ত ধরনের দুর্নীতি নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর; যে সরকার যথাযথ কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্ক, জোট নিরপেক্ষতা ও বিশ্বশান্তি রক্ষার পক্ষে দাঁড়ায়; যে সরকার জাতীয় ঐক্য রক্ষা করবে ও দেশের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টিকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির বিরোধিতা করবে; যে সরকার লাভজনক দাম এবং বেকার ও প্রয়োজনের থেকে কম মজুরি পান এমন লোকজনদের আশু ত্রাণের ব্যবস্থা করবে”।

এর পরেই জ্যাতি বসু ঘোষণা করেছেন, “আমাদের পার্টি এই ধরনের সরকার গঠনের জন্য সবরকম সাহায্য দেবে”।

জ্যোতি বসুর মতে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির এই ঐক্য বা “ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রন্টের” এই সরকার “জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট”ও নয় কিংবা “বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট”ও নয়। এরপরে তিনি পার্টি সভ্যদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে “আমরা আমাদের মূল লক্ষ্য (জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন করা) থেকে বিচ্যুত হইনি এবং কখনও তা হবোও না”।

এই ঘটনাটা এড়িয়ে যাওয়ার অবশ্য কোনো উপায় নেই যে এই “ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রন্ট” হল সিপিআই(এম)-এর কৌশলের ক্ষেত্রে একটা নতুন সংযোজন। আর যেভাবে তারা ভি পি সিং-এর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং কংগ্রেসের এমপি-দের ও কংগ্রেসের মধ্যকার “নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের” কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের জন্য জেগে উঠে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য লাগাতার আবেদন রেখে যাচ্ছে তাতে এই “ধর্মনিপেক্ষ সরকারের” সমগ্র মর্মবস্তুটি বেশ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। সংসদীয় পথ ধরে কংগ্রেসের প্রগতিশীল (ধর্মনিরপেক্ষ পড়ুন) অংশের সাথে হাত মিলিয়ে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকার গঠনের যে অবস্থান সিপিআই-এর রয়েছে, সিপিআই(এম)ও যে তার খুব কাছাকাছি চলে আসছে সেটাই এর থেকে বেরিয়ে আসছে। আর এভাবেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ হল।

(লিবারেশন, জানুয়ারি ১৯৮৪ থেকে)

এতদিনে প্রায় সকলেই জেনে গিয়েছেন যে জাতীয় পর্যায়ে একটি গণফ্রন্ট গড়ে তোলা সম্পর্কে আমাদের পার্টির ধারণার উপর বিলোপপন্থী এবং নৈরাজ্যবাদী উভয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তীব্র আক্রমণ নেমে এসেছে। বিলোপপন্থী দৃষ্টিকোণ থেকে বিরোধিতার ভিত্তি হল এই যে ইন্দিরা গান্ধীর কর্তৃত্ববাদ/ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে ফ্রন্ট মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের কিছু কিছু অংশকে এবং সংসদীয় বিরোধী গোষ্ঠীকে নিজের পরিধির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেনি। অন্যদিকে পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভাঙ্গার ‘বুনিয়াদী লাইন’ অনুসরণের নামে নৈরাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণ যে কোনো রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনেরই বিরোধিতা করে থাকে। ফ্রন্ট গঠনের বিরোধিতার এই দুই ‘চরম’ দৃষ্টিকোণের মিলে যাওয়ার নিদর্শনও নেহাৎ কম নেই। সিওসি (পার্টি ইউনিটি) নামক পার্টি গোষ্ঠী তাদের পার্টি ইউনিটি পত্রিকার আগস্ট, ১৯৯৩ সংখ্যায় তৃতীয় পার্টি কংগ্রেসের লাইনের যে সমালোচনা করেছেন তাই নিয়ে এখানে আমরা আলোচনা করব। আমাদের বিশ্বাস, নৈরাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেই তাঁদের এই সমালোচনার উদ্ভব। এই সমালোচনামূলক পর্যালোচনা করতে গিয়ে গণফ্রন্ট গঠন সংক্রান্ত তাত্ত্বিক সূত্রগুলি আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে বলে আমাদের আশা।

জাতীয় রাজনৈতিক মোর্চা কেন প্রয়োজন?

পার্টি ইউনিটি (পি ইউ) গোষ্ঠীর দাবি তাঁরা সংকীর্ণ স্থানীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে এসেছেন এবং এ ব্যাপারে তাঁরা একমত যে ‘জাতীয় পর্যায়ে আংশিক চরিত্রের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক গণআন্দোলনে জনগণকে সংগঠিত করা ও নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য উত্তরণশীল চরিত্রের বিভিন্ন জাতীয় মঞ্চ গড়ে তোলা সম্ভব এবং উচিত’। (বাঁকা হরফ আমাদের)

আর, “শ্রেণীসংগ্রাম নির্দিষ্ট তীব্রতা লাভ করলে এবং জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (পিডিএফ) গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলি অর্জিত হলে” তখন কী ঘটবে – এই প্রশ্রের কোনো উত্তর তাঁরা দেননি।

তারপর দেখা যাক। “সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে এক সময় বৈপ্লবিক কর্মধারা এবং সশস্ত্র সংগ্রামকে সংগ্রামের প্রধান রূপ হিসাবে নিয়ে পিডিএফ আত্মপ্রকাশ করে” এবং এই পিডিএফ আবার “জাতীয় পর্যায়ে আংশিক সংগ্রামগুলিকে পরিচালনা করার মঞ্চ হিসাবেও কাজ করতে পারে।”

পিডিএফ গড়ে তোলার প্রশ্নে তাঁরা দাবি করেন যে সত্তরের পার্টি লাইনকে তাঁরা দুটি দিক থেকে শুধরে নিয়েছেন। প্রথমত “দেশের অন্তত কয়েকটি এলাকায় লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা” – এই কঠোর শর্তটিকে পাল্টে নিয়ে তাঁরা নতুন শর্ত আরোপ করেছেন “গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা থাকা চাই, তবে এই এলাকাগুলি মুক্তাঞ্চল নাও হতে পারে।” ঈশ্বরই জানেন এই দুই শর্তের মধ্যে পার্থক্যটা কী দাঁড়ালো। ‘সশস্ত্র সংগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা’ যদি থেকে থাকে তবে কি এটি স্বাভাবিক নয় যে তার মধ্যে কয়েকটি এলাকা লাল এলাকা হয়ে উঠবে? অথবা ঘুরিয়ে বলতে গেলে, কয়েকটি লাল এলাকা গড়ে না তুলে সশস্ত্র সংগ্রামকে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়াটা কি আদৌ সম্ভব?

দ্বিতীয়ত, সত্তরের পার্টি লাইনে যুক্তমোর্চা গঠন সম্পর্কে যে সঙ্কীর্ণ কর্মনীতির কথা বলা হয়েছিল তার বিপরীতে তাঁরা একটি সার্বিক কর্মনীতি হাজির করছেন। এই সামগ্রিকতার সংজ্ঞা হল : “এসমা, এনএসএ, প্রেস বিল, মূল্যবৃদ্ধি, সাম্রাজ্যবাদী শিবিরগুলি কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া অসম্মানজনক বিভিন্ন শর্তের কাছে নতি স্বীকার ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তুলতে সংসদীয় বিরোধীগোষ্ঠী সমেত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শক্তির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।”

এক কথায়, হয় আপনার থাকবে জাতীয় পর্যায়ে আংশিক চরিত্রের গণতান্ত্রিক গণআন্দোলন সংগঠিত করা ও সেগুলিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সংসদীয় বিরোধীগোষ্ঠীকে নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় মঞ্চ নতুবা সশস্ত্র সংগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি পিডিএফ।

পিডিএফ সম্পর্কে তাঁরাই স্বীকার করে নিয়েছেন যে পরিস্থিতি এখনও পেকে ওঠেনি এবং ধরে নেওয়া যেতে পারে যে অন্তত অদূর ভবিষ্যতে পেকে ওঠার কোনো সম্ভাবনাও নেই। আমাদের পার্টি কোনোমতেই পরিস্থিতি পেকে ওঠেনি এই অজুহাতে স্বতস্ফূর্ততার আরাধনা করতে রাজি নয় – রাজি নয় “আংশিক চরিত্রের গণতান্ত্রিক গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একটি জাতীয় মঞ্চ” নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে। ঘটনা হল, এই সশস্ত্র সংগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা যেমন আমাদের নেই তেমনই আবার দেশের বিভিন্ন অংশে কৃষকদের প্রতিরোধ সংগ্রামের বেশ কয়েকটি এলাকা আমাদের রয়েছে। ভারতীয় জনগণের বেশি কিছু অংশের উপর আমাদের রয়েছে মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক প্রভাব। আমরা, ভারতের বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের মধ্যে একটি জরুরি রাজনৈতিক কর্মধারা ঠিক করে নিই তাহলে আমরা প্রকৃতই একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠতে পারি, পারি সংশোধনবাদীদের সমেত সমগ্র সংসদীয় বিরোধীপক্ষকেই গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার জন্য কার্যকরী প্রচেষ্টা চালাতে, পারি সাধারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একটি বিপ্লবী গণতান্ত্রিক ছাপ রেখে যেতে, জাতীয় রাজনীতির জ্বলন্ত প্রশ্নগুলি সম্পর্কে আমাদের বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি জোরের সাথে তুলে ধরতে। আর এইভাবেই পিডিএফ গড়ে তোলার লক্ষ্যেও আমরা এক ধাপ এগোতে পারব। লক্ষ্য করুন আমরা বলেছি পিডিএফ-এর লক্ষ্যে একটি ধাপ – পিডিএফ নয়। পিডিএফ গড়ে তোলা হল একটি প্রক্রিয়া; আপাতত যা কিছু আমাদের হাতে আছে, আসুন তাই নিয়েই সেই লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ আমরা নিই। এই প্রথম পদক্ষেপ নিছক জাতীয় পর্যায়ে “আংশিক চরিত্রের গণআন্দোলন” নিয়েই মাথা ঘামাবে না, বরং “স্বাধীনভাবে জনগণের সমাবেশ ঘটানো” ও দেশব্যাপী রাজনৈতিক সংগ্রামের ওপর গুরুত্ব আরোপ করবে।

অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং জীবন্ত বর্তমানের মধ্যে বাস করে আমাদের পার্টি ভবিষ্যতের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর এই একটি পদক্ষেপকে ঘিরেই শুরু হয়ে গেছে যত বাকবিতণ্ডা। আর পিডিএফ সম্পর্কে যাবতীয় বাক্যবিস্তার সত্ত্বেও বাস্তব জীবনে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে ‘বুর্জোয়া বিরোধী পক্ষের’ হাতে স্বৈরতন্ত্র-বিরোধী রাজনৈতিক উদ্যোগকে সঁপে দেওয়া এবং ‘জাতীয় পর্যায়ে আংশিক চরিত্রের গণতান্ত্রিক গণআন্দোলন পরিচালনা ও সংগঠিত করার জন্য সংসদীয় বিরোধীপক্ষকে নিয়ে জাতীয় স্তরের মঞ্চ’ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকার মধ্য দিয়ে বিলোপপন্থী ও নৈরাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এক জায়গায় মিলে যাচ্ছে।

যে গণফ্রন্টের কথা আমরা বলেছি, তার মধ্যে কেবল নয়া গণতন্ত্রের সামাজিক শক্তিগুলিই থাকবে। এটি হল একটি নীতির প্রশ্ন। দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের পতাকা তাকে বৃহৎ বুর্জোয়া ও বৃহৎ জমিদারদের প্রভাবাধীন জনগণকে জয় করে নিতে সাহায্য করবে মাত্র এবং আলোকপ্রাপ্ত জমিদার ও কিছু কিছু বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরও সমর্থন এনে দেবে। তবে ‘বুর্জোয়া ও সংশোধনবাদী বিরোধীপক্ষের’ অন্তর্ভুক্ত দল ও গণসংগঠনগুলির সাথে ইস্যুভিত্তিক যৌথ কার্যকলাপের সম্ভাবনাকে আমরা কখনই নাকচ করে দিচ্ছি না। এই যৌথ কার্যকলাপের রূপ কেমন হবে, তাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে কীভাবে কাজে লাগিয়ে নেওয়া যাবে, তাদের মধ্যে কী ধরনের ফাটল ধরানো যাবে, সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে ছোটোখাটো দলগুলিতে এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি নেতার মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটবে – এ সবই নির্ধারিত হবে ফ্রন্ট তাদের সম্পর্কে কী কৌশল অবলম্বন করছে তার দ্বারা। এই বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা খুবই কম এবং এটি স্বাভাবিক যে কিছু ভুলভ্রান্তিও ঘটবে। আমরা এই ভ্রান্তিগুলি থেকে শিক্ষা নেব এবং আমাদের কর্মনীতিগুলিকে উত্তরোত্তর নিখুঁত করে তুলব।

ফ্রন্ট ও ঘাঁটি এলাকা

নকশালবাড়ি থেকে শুরু করে কৃষক সংগ্রামগুলির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে নকশালবাড়ি, শ্রীকাকুলাম বা বীরভূম কোনোখানেই সশস্ত্র কৃষক সংগ্রাম এক বা দুই বছরের বেশি স্থায়ী হয়নি। আর ১৯৭৬ সালের মধ্যে সম্ভবত একমাত্র বিহারের ভোজপুর বাদে আর সর্বত্রই কৃষক সংগ্রামের এলাকাগুলি ধাক্কার সম্মুখীন হয়। ১৯৭৭ সালের পরেই আবার নতুন করে এই ধরনের এলাকা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু হয়। পার্টি লাইনকে ঠিকঠাক করে নেওয়ার দরুণ কৃষক সংগ্রামের এলাকাগুলি এখন আরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকছে। বিহারের পাটনা-গয়া-ভোজপুর বলয়ে, কোথাও অগ্রগতি, কোথাও পিছু হটার মধ্যে দিয়ে কৃষকদের প্রতিরোধ সংগ্রামগুলিকে টিকিয়ে রাখা গেছে, বিশেষত পাটনা-নালন্দা-গয়া অঞ্চলের কৃষক অভ্যুত্থান সাম্প্রিতককালে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। ভারতের অন্যান্য বহু স্থানেও আমরা এ ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, অন্যান্য গোষ্ঠীগুলিও চেষ্টা চালাচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাফল্যও অর্জিত হয়েছে।

কিন্তু তবুও বিহারে কৃষক সংগ্রামের সবচেয়ে অগ্রসর এলাকাকেও অদূর ভবিষ্যতে ঘাঁটি এলাকায় পরিণত করার কাজ হাতে নেওয়া যাবে না। মধ্য কৃষকদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং জমিদারদের প্রতাপশালী জাতের মধ্য ও উচ্চ-মধ্য স্তরের ব্যাপক অংশকে জয় করে নিয়ে আসার জন্য জাতপাতের সংস্কারকে নির্মূল করার প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য এখনও লাভ করা যায়নি। সশস্ত্র সংগ্রামকে উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ও লাল এলাকা গড়া শুরু করার আগে জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সমাবেশিত করা ও শ্রেণীগত ও সামাজিক ভারসাম্যকে আমাদের অনুকূলে নিয়ে আসার পথে আমাদের আরও বহুদূর এগোতে হবে। আনন্দের কথা, জাহানাবাদে কর্মরত পিইউ গোষ্ঠীর কমরেডরা তাঁদের গোড়ার দিকের কয়েকটি উদ্ভট ধারণাকে বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং কিছু বাস্তব সিদ্ধান্তে তাঁরা পৌঁছাতে পেরেছেন। পার্টি ইউনিটি পত্রিকার অক্টোবর ১৯৮২ সংখ্যায় প্রকাশিত একটি সারসংকলনে তাঁরা বলছেন “সশস্ত্র কার্যকলাপের প্রকৃতি ও মাত্রাকে অবশ্যই গণআন্দোলনের বর্তমান স্তরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও তার আরও বিকাশের পক্ষে সহায়ক হতে হবে।” আর “বর্তমানে সাধারণভাবে আংশিক ইস্যুগুলিতেই আন্দোলন চলছে। আইনি সুযোগ-সুবিধাগুলিকে এবং শত্রুশিবিরের বিভিন্ন দ্বন্দ্বকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক জনগণকে সমাবেশিত করা তাই এই পর্যায়ে অত্যন্ত জরুরি।” সুতরাং সশস্ত্র সংগ্রামকে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া বা লাল এলাকা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নির্ধারক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বর্তমানে তথা আগামী বেশ কিছুদিনের জন্য যেটা প্রয়োজন তা হল আমাদের শক্তিগুলিকে সংরক্ষিত রাখা, ধাপে ধাপে তাদের বিকশিত করে তোলা এবং সংগ্রামের এলাকাগুলিতে শ্রেণীশক্তিগুলির ভারসাম্যকে আমাদের অনুকূলে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করা। ভারতের সমস্ত চিন্তাশীল বিপ্লবীরাই, যাঁরা শত প্ররোচনা সত্ত্বেও নিশীথ-আজিজুলদের পথে যেতে নারাজ, এ বিষয়ে একমত।

তবে এই উপলব্ধিটুকুই যথেষ্ট নয়। ঘাঁটি এলাকা গড়তে হলে বা সশস্ত্র সংগ্রামকে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দিতে হলে অনুকূল জাতীয় পরিস্থিতিও প্রয়োজন। চেয়ারম্যান মাওয়ের ভাষায় চীনে লাল এলাকা সমূহের অস্তিত্ব ও বিকাশের অন্ত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল শাসকশ্রেণীগুলির বিভিন্ন অংশের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংঘাত ও যুদ্ধ। কিন্তু ভারতবর্ষের পরিস্থিতি অন্যরকম।

উত্তরাধিকার সূত্রে ভারতীয় শাসকশ্রেণীগুলি একটি কেন্দ্রীভূত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোর অধিকারী। পার্লামেন্টের মাধ্যমে তাদের দ্বন্দ্বগুলিকে তারা মোটামুটি একটি সীমানার মধ্যে আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সার্বজনীন ভোটাধিকার এবং ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্রের’ বহিরঙ্গসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলিও জনগণের বিদ্রোহকে ঠাণ্ডা করে রাখে এবং সোশ্যাল-ডেমোক্রেসীর জন্মের ঊর্বর ভূমি রচনা করে। থেকে থেকে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যাবস্থাকেও তীব্র টানাপোড়েনের সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে এগিয়ে এসেছেন। বর্তমান পর্যায়ে শাকশ্রেণীগুলির বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংঘাত বেড়ে চলেছে, নতুন সামাজিক শক্তিগুলি ক্ষমতার কাঠামোয় নতুন ভারসাম্যের দাবি জানাচ্ছে, বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে ও জাতীয় সংহতির পক্ষে আকাশ ফাটিয়ে আওয়াজ উঠছে, জাতীয় দলগুলির বিপরীতে আঞ্চলিক দলগুলি তাদের সরব অস্তিত্ব ঘোষণা করছে এবং সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠছে। বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলির কাঠামোর মধ্যে এইসব সংঘাতকে আটকে রাখা ক্রমেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক বনাম যুক্তরাষ্ট্রীয় চরিত্র, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি বিতর্ক রাজনৈতিক সংকটেরই বিভিন্ন বহিঃপ্রকাশ – যা সাংবিধানিক সংকট রূপে নিজেকে প্রকাশ করছে।

এই ক্রমবর্ধমান রাজনীতির সংকটের পর্যায়ে নিছক নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে বসে না থেকে তৃতীয় পার্টি কংগ্রেস এই দৃঢ় সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে সামাজিক শক্তিসমূহের ভারসাম্যকে বিপ্লবের অনুকূলে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য জাতীয় রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে আমাদের সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে। আর এই কারণেই গণফ্রন্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনাতেও পার্টি কংগ্রেস সম্মতি জানিয়েছে।

পিইউ কমরেডরা এ বিষয়ে একমত যে পার্টি কংগ্রেসের রিপোর্ট যে দুটি ধারার (কৃষকদের প্রতিরোধ সংগ্রাম ও ভারতীয় জনগণের বিভিন্ন অংশের গণতান্ত্রিক গণআন্দোলন – সম্পাদক) উল্লেখ করা হয়েছে সে দুটি আজ আমাদের দেশে সমান্তরালভাবেই এগিয়ে চলেছে। কিন্তু পার্টি কংগ্রেস যখন ঘোষণা করে যে দুটি ধারাকে মেলাতে হবে তখনই দেখা যায় তাদের আপত্তি। এখন, এই মেলানো বলতে কী বোঝাচ্ছে? গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটে এলাকা গড়ে তোলা আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কর্তব্য এবং মুহূর্তের জন্যও পার্টি এ প্রশ্নে এতটুকু শৈথিল্য দেখাবে না। আর গণফ্রন্টেরও অক্ষরেখা হবে ঠিক এটিই। জাতীয় স্তরে রাজনৈতিক মোর্চা গড়ে তোলা ঘাঁটি এলাকা গঠনের কাজ থেকে বিচ্যুত হওয়া নয়; বিপরীতে, ভারতের বর্তমান নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সম্ভবত গণফ্রন্টের এই ঘোরা পথের মাধ্যমেই কেবল এই কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

গণফ্রন্টের চূড়ান্ত কর্মসূচিতে অবশ্যই নয়াগণতন্ত্রের কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে (শুধু যদি সেদিকে লক্ষ্য করার মতো যথেষ্ট ধৈর্য আপনাদের থাকে আর আপনারা যদি এই নীতিটুকু মেনে চলেন যে ভালোভাবে কোনো লেখাকে পড়ে নিয়ে তবেই একমাত্র তার সমালোচনা করা চলে)। ফ্রন্ট সংসদ-বহির্ভূত সংগ্রামগুলিকে সংগ্রামের প্রধান রূপ হিসেবে ঘোষণা করেছে আর সশস্ত্র সংগ্রাম নিশ্চয়ই তার মধ্যে পড়ে। তবে যেহেতু ফ্রন্টকে তার যাত্রা শুরু করতে হচ্ছে আজকের পরিস্থিতিতে, যে পরিস্থিতি পরিপক্ক নয় বলে আপনারাই স্বীকার করে নিয়েছেন, তাই বর্তমানে আশু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে রাজনৈতিক সমাবেশের উপরেই ফ্রন্টকে বেশি জোর দিতে হবে। তাকে জোর দিতে হবে সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও সেগুলি দেওয়ার আপাত গণতান্ত্রিক রূপগুলির মুখোশ উন্মোচিত করার উপর, ঘোষণা করতে হবে যে ফ্রন্ট তার দিক থেকে সংগ্রামের শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিগুলিতেই বেশি আগ্রহী তবে জনগণের আন্দোলনগুলি শেষপর্যন্ত কোন চেহারা নেবে তা নির্ভর করছে সরকার এইসব আন্দোলনকে কিভাবে দেখছে তার উপর। জাতীয় পর্যায়ে শ্রেণীশক্তিগুলির পারস্পরিক অবস্থানে ফ্রন্ট যা কিছু পরিবর্তন ঘটাতে পারবে তাই ঘাঁটি এলাকা গঠনের সংগ্রামে নতুন প্রেরণা যোগাবে। ঐ পরিবর্তিত পরিস্থিতি আবার দাবি জানাবে যে ফ্রন্ট তার সর্বোচ্চ কর্মসূচি ও তাকে বাস্তবায়িত করার জন্য বিভিন্ন জঙ্গী পদক্ষেপের উপর বেশি বেশি করে গুরুত্ব দিক – এই সবকিছুই অভ্যুত্থান ও সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া তথা পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙ্গে ফেলা অবধি এগিয়ে যাবে। এই প্রক্রিয়ায় গণফ্রন্ট নিজেকে একটি পরিপূর্ণ পিডিএফ-এ পরিণত করবে। আমাদের পার্টি কংগ্রেসের মতে এটিই হবে ফ্রন্টের মৌলিক দিশা।

আর এটিই হল পুরো বিষয়টির আসল সারমর্ম – যা কেউ কেউ বুঝতে অস্বীকার করেন, কেননা তাঁরা নিজেদের অতীতের বাঁধনে বাঁধা পড়ে রয়েছেন।

ফ্রন্ট ও নির্বাচন

পিইউ সমালোচনী আমাদের পার্টি কর্মসূচিতে ‘সংসদীয় সংগ্রাম’-এর বিষয়টি যুক্ত করার নির্মম সমালোচনা করেছে এবং ভবিষ্যৎ বাণী করেছে যে আমাদের পার্টি অবশ্যই ‘সংসদীয় পাঁকে নিমজ্জিত হবে’। একথা ঠিকই যে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এই ধরনের অধঃপতনের ভুরি ভুরি নিদর্শন রয়েছে আর এ বিষয়ে জনগণ যদি আমাদের পার্টি সম্পর্কে আশঙ্কা পোষণ করেন তবে তাঁদের দোষ দেওয়ার কিছু নেই, বরং এক দিক থেকে আমাদেরও এ নিয়ে কিছু আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু কীভাবে এই বিপদ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে? আবার ব্যাপক গেরিলা কার্যকলাপ শুরু করে, এই মুহূর্তেই বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করে? মহাদেব মুখার্জী সর্বাত্মক গেরিলা এ্যাকশনে নেমেছিলেন, নিশীথ গোষ্ঠী বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল – কিন্তু এত সব করে শেষে তাঁরাই ডুবলেন জঘন্যতম সুবিধাবাদের পাঁকে। পুরোনো কাসুন্দি আমরা ঘাঁটতে চাই না, তবে এটি অনেকেরই জানা আছে যে আমাদের বিরোধিতা করে ঐ মহাদেব-নিশীথদের প্রতিই আপনারা আপনাদের সহানুভূতি উজাড় করে দিয়েছিলেন।

প্রতিকার তাহলে কোথায়?

সত্তরের দশকে আমরা ‘নির্বাচন বয়কটের’ মহান পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলাম, ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সশস্ত্র সংগ্রামের বিকাশ সাধন আর লাল এলাকা গড়ে তোলার কাজে। সেই মহান অভ্যুত্থানই উত্তর-সাতচল্লিশ ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম তথাকথিত ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্রে’র প্রত্যেকটি প্রচলিত প্রতিষ্ঠানের সামনে এক জোরদার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল, জনগণের ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্রগুলি গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিল। আর এখানেই নিহিত রয়েছে সেই সময়ের বিরাট অভ্যুত্থানের সুগভীর তাৎপর্য। ‘নির্বাচন বয়কট’-এর আওয়াজ ছাড়া এত কিছু কোনোমতেই সম্ভবপর ছিল না। এটা আমাদের পার্টি এবং শহীদদের এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। যে দলত্যাগীরা অতীতের ভুল সংশোধনের নামে মহান ঐতিহ্যে কলঙ্ক লেপে দিতে চায়, তারা যতই বিরক্ত হোক না কেন আমরা চিরকাল এই ঐতিহ্যকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছি।

কিন্তু আমাদের সেই বিপ্লবী প্রচেষ্টা পরাজিত হল, আমাদের সকলকেই মানিয়ে নিতে হল সমকালীন সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ধাক্কার প্রথম আভাস পাওয়ার সাথে সাথে এই মানিয়ে নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করলেন। বিপ্লবী ঐতিহ্য, বিপ্লবী শহীদদের মর্যাদা তাঁরা ধুলোয় লুটিয়ে দিলেন, এমনকি সিপিআই(এমএল)-এর মহান লাল পতাকাকে পরিত্যাগ করতেও দ্বিধা বোধ করলেন না। শত্রুর কাছে এভাবে নির্লজ্জের মতো হাঁটু গেড়ে যারা ক্ষমা প্রার্থনা করে তাদের দলত্যাগী ছাড়া আর কি-ই বা বলা যায়? তাঁরা যতই ‘সবার আগে এবং পুরোপুরি সমস্ত ভুল সংশোধন করে ফেলার’ বড়াই করুন না কেন আমরা তাঁদের সঠিকভাবেই ঘৃণা করি। আমাদের মধ্যে রয়েছেন অন্যরাও, যাঁরা বিপ্লবী, যাঁর শেষ অবধি লড়াই চালিয়ে গেছেন, লড়তে লড়তেই চিরশয্যা নিয়েছেন কিন্তু শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। আজ তাঁরা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের হৃত শক্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় এবং আরও একবার চূড়ান্ত আঘাত হানার অপেক্ষায় রত, তাঁরা আজ বাধ্য হচ্ছেন সমাজের প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে। যথেষ্ট ইস্ততত করে এবং ধাপে ধাপেই এই আপোশ তাঁরা করছেন এবং এই কারণেও বিভিন্ন কোণ থেকে (এর মধ্যে আপনারাও রয়েছেন) নেহাৎ কম ব্যঙ্গ বিদ্রুপ তাঁদের সহ্য করতে হয়নি। তাঁদের আজকের কৌশল হল অতীতের কৌশলেরই ধারাবাহিক ও যুক্তিপূর্ণ বিকাশ।

সংসদের চরিত্রের উপর ভিত্তি করে অর্থাৎ এই সংসদ আধা-ঔপনিবেশিক নাকি স্বাধীন বুর্জোয়া দেশের সংসদের মতো এই বিচারের ভিত্তিতে সংসদ সম্পর্কিত কৌশল নির্ধারণ করতে যাওয়া হল এক নিছকই তাত্ত্বিক পণ্ডশ্রম। আমাদের সংসদ আধা-ঔপনিবেশিক – শুধু এই কারণে এর মুখোশ খুলে দেওয়া ও একে ভাঙ্গার কাজ এতটুকুই গুরুত্ব হারায় না, বিশেষত যখন সেই সংসদ সংশোধনবাদের বিকাশে এক অনুকূল বিষয়ীগত শর্ত যোগাচ্ছে। অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি আছে না নেই কেবলমাত্র এই ভিত্তিতেই আমাদের সংসদ সংক্রান্ত কৌশল নির্ধারণ করা যেতে পারে।

সংসদ সম্পর্কে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন হল মূলত কৌশলগত প্রশ্ন। আধা-ঔপনিবেশিক দেশে যেখানে আশু বিপ্লবী পরিস্থিতি সর্বদাই বিরাজমান এবং তাই কমিউনিস্টরা সর্বদাই ঘাঁটি এলাকা গঠনের পথে এগোতে পারেন বলে ধরে নেওয়া হয় সেখানে এই কৌশলগত প্রশ্নে রণনীতিগত মাত্রার সংযোজন ঘটে বলে মনে করা হয়। কিন্তু এটি মাথায় রাখতে হবে যে চীন বিপ্লবের পর তা থেকে শিক্ষা শুধু বিপ্লবীরাই নেননি, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদও নিয়েছে। ভারতকে সে বেছে নিয়েছে তার পরীক্ষাগার তথা প্রদর্শনকেন্দ্র হিসাবে। ভারতীয় পরিস্থিতির নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসমূহের সঙ্গে একযোগে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের এই চক্রান্ত এবং সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদে অধঃপতন সহ অন্যান্য বহু বিষয়ের সম্মিলিত ফল হিসাবে তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলির তুলনায় ভারতে সংসদ এবং অনুরূপ প্রতিষ্ঠানগুলি অনেক বেশি সময় ধরে টিকে থেকেছে। মৌলিক পথ মূলগতভাবে এক হলেও নির্দিষ্ট কৌশলের বহু প্রশ্নেই ভারতীয় বিপ্লবী চীন বিপ্লবের নিছক নকল হতে পারে না। অন্যান্য কারণ বাদ দিলেও শুধু এই একটি কারণেই তা হওয়া সম্ভব নয় যে আমাদের বিপ্লব ঘটছে আশির দশকের ভারতবর্ষে, চল্লিশের দশকের চীনে নয়। এই সমস্ত বিষয় এবং বিশেষত বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখলে, যে পরিস্থিতি সমস্ত চিন্তাশীল বিপ্লবীর মতেই, এই মুহূর্তে লাল এলাকা গঠনের কাজে নামার মতো উপযুক্ত নয়, এই প্রয়োজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আমাদের নির্বাচন সংক্রান্ত কৌশল পুনর্বিবেচনা করে দেখতে হবে। নীতিগতভাবে অন্তত নির্বাচনের প্রশ্নকে কৌশল সংক্রান্ত প্রশ্ন হিসাবেই দেখা উচিত। বাস্তব পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানোর মতো করে আমাদের সাধারণ কৌশলকে ঠিকঠাক করে নেওয়ার সাথে সাথে নির্বাচনের ব্যাপারে ঠিক কী করা দরকার – এই নির্দিষ্ট কৌশল সম্পর্কেও আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং তা করার সময় পশ্চিমী ধরনের সংসদের সঙ্গে ভারতীয় সংসদের চরিত্রগত পার্থক্যগুলিকে উপযুক্ত গুরুত্ব দিয়েই খেয়াল রাখতে হবে। এই নীতিগত স্বীকৃতির অর্থ কিন্তু এই নয় যে যত্রতত্র এখনই আমরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য ছুটে যাব বা যাবতীয় অনীতিনিষ্ঠ আপোশ করার পথে পা বাড়াব। এই প্রশ্নে পিসিসি তার নেতিবাচক দৃষ্টান্তের দৌলতে এক ভালো শিক্ষক হিসেবে আমাদের সামনে রয়েছে। কর্মনীতিতে পুনর্বিন্যাসের অর্থ বিপ্লবী সংগ্রাম বর্জন করা নয় বা পশ্চিমের দেশগুলির মতো পার্লামেন্টের ভেতর থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়া তথা দীর্ঘদিন ধরে দেশব্যাপী অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুতি চালানোর কর্মনীতি অনুসরণ করাও নয়।

বর্তমানে যখন জনগণের ক্ষমতার বিকল্প মডেল আপনার হাতে নেই এবং এই মুহূর্তে তা গড়ে তোলার কাজেও আপনি যখন নামতে পারছেন না, তখন জনগণের রাজনৈতিক চেতনার মানকে ক্ষমতা দখলের রাজনীতির উপলব্ধির স্তরে উন্নীত করতে হলে এই নেতিবাচক পথকে উপেক্ষা করা নিজেদের ধ্বংসের ঝুঁকি নেওয়ারই সামিল। আপনার প্রতিনিধিরা শত্রুপক্ষের সংসদের ভেতরে যান, সেখানে বক্তৃতা দেন, আর বাইরে থেকেও চলে প্রচার – এই দুইয়ের মধ্যে দিয়ে সংসদের স্বরূপ উদ্ঘাটিত করা হয়। অর্থাৎ জনগণকে আমাদের এটি বুঝিয়ে দিতে হবে শাসকশ্রেণীর কোন নির্দিষ্ট জোট সংসদের মধ্যে দিয়ে শাসন চালাচ্ছে এবং কীভাবে। এই কাজ বাইরে থেকেও ভালোভাবেই চালানো যায়। তবে ভেতর থেকে কমিউনিস্ট প্রতিনিধিদের কাজ, যদি তা ঠিকভাবে সংগঠিত করা যায়, এই মুখোশ উন্মোচনকারী প্রচার অভিযানের ধার আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

আপনি ‘নির্বাচন বয়কট’-এর ডাকও দিতে পারেন, কিন্তু তাহলে আপনাকে এখনই সর্বশক্তি নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, নামতে হবে ঘাঁটি এলাকা গঠনের কাজে। তত্ত্বে আপনি আপনার কল্পজগতে বাস করতে পারেন কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে তো কোনো মাঝামাঝি রাস্তা নেই। আপনি যদি একদিকে নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানান আর অন্যদিকে আন্দোলনের বর্তমান পর্যায়কে আংশিক সংগ্রামের (তা যে মাত্রাতেই হোক না কেন) পর্যায় বলে বর্ণনা করেন, তাহলে বলতে হবে আপনি নিজেকেই ঠকাচ্ছেন – মিথ্যা তর্কের জাল বুনছেন। এই ক্ষেত্রে বয়কটের আহ্বান হবে নিছকই এক নিষ্ক্রিয় আহ্বান এবং বাস্তব বিচারে এতে জনগণকে কোনো না কোনো বুর্জোয়া কর্মনীতির পেছনে চলতেই বাধ্য করা হবে।

কৃষকদের প্রতিরোধ সংগ্রামের এলাকা গঠনে একনিষ্ঠভাবে নিয়োজিত একটি গোপন পার্টি কাঠামো, সংসদ-বহির্ভূত সংগ্রামকেই সংগ্রামের মূল রূপ হিসেবে তুলে ধরে এমন একটি গণফ্রন্ট, সরকারি বিভিন্ন ছাড় ও সংস্কারের মুখোশ খুলে দেওয়ার স্বার্থেই কেবলমাত্র নির্বাচনী অভিযানকে কাজে লাগানো, এবং শুধুমাত্র গণউদ্যোগের দ্বার উন্মুক্ত করা তথা গণআন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য নিয়েই কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা – এই শর্তগুলিই পারে একটি পার্টিকে সংসদ-সর্বস্বতার পাঁকে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখতে। এছাড়া অন্য কোনো সহজ পথ নেই আর বামবুলি-সর্বস্বতা কেবল অধঃপতনকেই ত্বরান্বিত করতে পারে।

বারবার শুধু ‘মৌলিক পথ’-এর কথাই বলে গেলে আপনি কখনোই কাঙ্খিত লক্ষ্যের এতটুকুও কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবেন না। সময় এসেছে নতুন পরীক্ষায় নামার। আর কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের মধ্যে সুস্থ বিতর্ক প্রকৃত অগ্রগতির পথই সুগম করে দেবে, তার মধ্যে দিয়েই গড়ে উঠবে যথার্থ পার্টি ইউনিটি।

পিইউ গোষ্ঠীর মাননীয় নেতৃবৃন্দ, বন্যার জলে পথ যখন ডুবে থাকে তখন, কখনও কখনও উত্তরে যাবার জন্য দক্ষিণগামী গাড়িতেই কিছুদূর পর্যন্ত যেতে হয়। বামবুলি-সর্বস্বতা ও বাম ভান করার মধ্যে (পার্টি ইউনিটির সমালোচক আমাদেরকে বাম ভান করে চলার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন, তবে বামবুলি আউড়ানো থেকে রেহাই দিয়েছেন) বিশেষ কোনো পার্থক্য আছে কিনা আমাদের জানা নেই; যদি থাকে তাহলে উভয় অপরাধেই আপনারা অপরাধী।

(১৯৮২ ডিসেম্বর, তৃতীয় পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট থেকে, সংক্ষেপিত)

ভারতবর্ষের বর্তমান পরিস্থিতি যেমন বিপ্লবী সংকটের জন্ম দিচ্ছে তেমনই তা সংসদীয় ও সাংবিধানিক সংকটের দ্বারাও চিহ্নিত। ভারতের সংবিধান ও সংসদীয় গণতন্ত্র কোনো বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ফসল ছিল না, তাই এর মধ্যে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের প্রাণশক্তিও কোনোদিনই দেখা যায়নি। তবে অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ সময়ে একে কিছুটা টিকিয়ে রাখা ও শাসক পার্টির স্বার্থে কাজে লাগানো হয়েছিল কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিতে পুরোপুরি উৎখাত করে দেওয়া হয়। আর আজ যখন ইন্দিরা স্বৈরতান্ত্রিক চক্র এইসব প্রতিষ্ঠানকে প্রহসনে পরিণত করেছে, এমনকি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের দিকে এগিয়ে চলেছে তখন বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা আর বুর্জোয়া বিরোধী দলগুলি এ নিয়ে বিরাট হৈ চৈ লাগিয়ে দিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন ভারতীয় জনগণের সমগ্র গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিশা হওয়া উচিত বুর্জোয়া সংবিধান ও বুর্জোয়া পার্লামেন্টের পবিত্রতা রক্ষা। হরেক রকম বিকল্প ফেরী করা হচ্ছে, প্রত্যেকেই দাবি করছে যে সংবিধান ও সংসদের এই পবিত্রতা রক্ষা করতে একমাত্র সেই সক্ষম। সিপিআই(এম) সংশোধনবাদীরাও তাদের পরিচালিত সরকারের ভিত্তিতে জাতীয় বিকল্পের এক মডেল হাজির করেছে এবং এর নাম দিয়েছে বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট। এ বছর তাদের বিজয়ওয়াড়া কংগ্রেসে তাঁরা ঘোষণা করেছেন – “বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলা ও বাস্তবায়িত করা এমন এক পরিস্থিতিতে শুরু হয়েছে, যেখানে অন্যান্যরা সিপিআই(এম) বা শ্রমিকশ্রেণী কাউকেই নেতা হিসাবে মেনে নেননি – তাদের কেবলমাত্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ও সমান অংশীদার হিসেবেই মেনে নিয়েছেন। এই সমস্ত শক্তিগুলির মধ্যে ঐক্য বাড়ার সাথে সাথে এবং সামনে রাখা কর্মসূচিকে বাস্তবায়িত করার জন্য সংগ্রামের সাথে সাথে শ্রমিকশ্রেণীর গুরুত্ব ও প্রভাব নিশ্চিতভাবেই বাড়বে। কিন্তু শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব বহু দূরের বস্তুই থেকে যাবে এবং তা শক্তিগুলির আন্তঃসম্পর্কের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থাতেই অর্জন করা যাবে।” একথা থেকে এটা পরিষ্কার বেরিয়ে আসছে যে সিপিআই(এম) শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে জনগণতন্ত্রের কর্মসূচি পুরোপুরি ত্যাগ করেছে এবং যা তার কাছে ‘বহু দূরের লক্ষ্যবস্তু’। ‘বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’-এর উত্তরণশীল পর্যায়ের নামে এই পার্টি যার ওকালতি করেছে তা হল বুর্জোয়া সংবিধান ও সংসদীয় গণতন্ত্রের ‘বিশুদ্ধতা’ ও পবিত্রতা রক্ষা করা। এই উদ্দেশ্যে তারা বিরোধী দলগুলির সাথে মিলে সরকার গড়তে চায় নেতৃত্বকারী শক্তি হিসাবে নয় বরং সমপর্যায়ের বা অন্তত গুরুত্বপূর্ণ শরিক হিসাবে।

জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলির – তা সে যতই ক্ষুদ্র বা আনুষ্ঠানিক হোক না কেন – ওপর স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির যে কোনো আক্রমণের বিরোধিতা আমরা সর্বদাই করব নিশ্চয়। কিন্তু জনগণতন্ত্রের দিকে যে কোনো উত্তরণকালকে উত্তরণ বলে অভিহিত করা যায় শুধু তখনই, যখন তা জনগণকে সংসদীয় গণতন্ত্র সম্পর্কে মোহমুক্ত হতে সাহায্য করে। এমনকি কমিউনিস্টরাও যখন বুর্জোয়া পার্লামেন্টে অংশ নেয় তখন তার উদ্দেশ্য থাকে ভেতর থেকে একে ভাঙ্গা – একে রক্ষা করা বা শক্তিশালী করা নয়। তাই একথা পরিষ্কার যে সিপিআই(এম)-এর উত্তরণকাল হল সংসদীয় গণতন্ত্রে ডুব দিয়ে জনগণতন্ত্রকে বর্জন করার দিকে উত্তরণ। আর ছোটোখাটো পার্থক্য বাদ দিলে, এই সূত্রায়নে সিপিআই(এম) ও সিপিআই একই জায়গায় আছে, ফলে বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের মাধ্যমে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব ও জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পর্কে দুটি পার্টির ধারণা এক হয়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে অন্যান্য বিষয়ে সিপিআই(এম) ইতিমধ্যেই পিছু হঠতে হঠতে সিপিআই-এর লাইনে পৌঁছে গেছে; বাম ও গণতান্ত্রিক মোর্চা উভয়ের মধ্যেকার প্রধান প্রধান রণকৌশলগত ফারাকগুলিকেও দূর করে দিয়েছে। তাই ডাঙ্গের বহিষ্কারের পরে দুটি পার্টি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে কাছাকাছি  এসে গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে ভারতের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের দৃঢ়তার সাথে জনগণতন্ত্রের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। এবং এই লক্ষ্য পৌঁছানোর জন্য উপযুক্ত রূপ ও পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হবে। আজ যখন অ-পার্টি শক্তিগুলির অনেকেই সামনে এগিয়ে আসছেন এবং গণতন্ত্রের জন্য ব্যাপক আকাঙ্খা ও সংগ্রাম দেখা যাচ্ছে ও এমনকি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরাও তাতে অংশ নিচ্ছেন তখন সর্বহারা পার্টির কর্তব্য হল এমন রূপে, এমন স্লোগান দিয়ে তার নিজের ‘জাতীয় বিকল্প’র পতাকা তুলে ধরা যা ব্যাপকতম গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারবে। এরকম একটি মোর্চা অবশ্যই মূলত সংসদ-বহির্ভূত হবে; নিজের বিস্তার, সংহতি সাধন ও বিজয়ের জন্য জনগণের সংগ্রামের ওপর নির্ভর করবে এবং কেবলমাত্র গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সামাজিক শক্তিগুলিকেই অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক শ্রেণীগুলি, বুদ্ধিজীবী ও বুর্জোয়াদের প্রগতিশীল অংশকেই অন্তর্ভুক্ত করবে। এই মোর্চা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামে বিরোধী বুর্জোয়া পার্টিগুলি ও গণসংগঠনগুলির সঙ্গেও সমঝোতা করবে, তবে তাদের সঙ্গে একই কর্মসূচিভিত্তিক কোনো ফ্রন্টে যাবে না। এইসব পার্টির কিছু কিছু ব্যক্তির সঙ্গে এবং এরকম কোনো কোনো পার্টির সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের কিছু কিছু বিশেষ ইস্যুতেও এই ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে। বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা এবং অন্যান্য বিপ্লবী পার্টি ও সংগঠন, গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলি ও গণতান্ত্রিক-দেশপ্রেমিক ব্যক্তিরাও এই মোর্চায় থাকবেন। প্রবাসী ভারতীয় জনগণের মধ্যেকার গণতান্ত্রিক-দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের এবং সংগঠনগুলিকেও অবশ্যই এই মোর্চায় রাখতে হবে। বর্ণ বৈষম্য ও অন্যান্য বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁদের সংগ্রামকে এই মোর্চা সমর্থন করবে এবং তাদের মাধ্যমে ভারতীয় জনগণের ওপর প্রতিটি দমন-পীড়ন ও অগণতান্ত্রিক আইন সম্পর্কে বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাবে।

এই মোর্চাকে অবশ্যই শাসকশ্রেণীগুলির মধ্যেকার বিভিন্ন দ্বন্দ্বকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে শিখতে হবে এবং সমস্ত ধরনের বুর্জোয়া ও সংশোধনবাদী সমন্বয়গুলির বিপরীতে নিজেকে বিকল্প হিসাবে তুলে ধরতে হবে। আর মোর্চার ভেতরে সর্বহারা পার্টিকে বুর্জোয়া উদারনৈতিক প্রবণতার  বিরুদ্ধে অবিচলভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, যেমন – মোর্চাকে অ-রাজনৈতিক বা গতানুগতিক বা সংসদীয় অথবা সামাজিক সংস্কারের মোর্চায় পরিণত করার প্রবণতা, শাসকশ্রেণীর কোনো অংশের সাথে অনীতিনিষ্ঠ আপোশ করার প্রবণতা ইত্যাদি। জঙ্গী গণসংগ্রাম ও ক্ষমতা দখলের চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে এই মোর্চাকে সুস্পষ্ট পথনির্দেশ দেওয়ার কাজও পার্টিকেই করতে হবে।

শুরুতে আমাদের ধারণা ছিল এই যে শ্রমিক, কৃষক ও পেটি বুর্জোয়া ছাড়া অন্যদেরও নিয়ে মোর্চা গড়ে উঠবে অন্তত কয়েকটি জায়গায় লাল রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেই। লাল রাজনৈতিক ক্ষমতার এলাকাগুলিই হল শ্রমিক-কৃষক ঐক্যের নির্দিষ্ট প্রকাশ। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ব্যাপারটা দাঁড়াল অন্যরকম। লাল রাজনৈতিক ক্ষমতার এলাকা আমরা গড়ে তুলতে বা ধরে রাখতে পারিনি, কিন্তু সর্বাহারা পার্টি ১৫ বছর ধরে এই লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে গেছে। আর আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ঐ একই গণতান্ত্রিক লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দুটি প্রবণতা, দুটি বাস্তব ঘটনা সামনে এসে গেছে। একদিকে, বিহারের কিছু কিছু অঞ্চলে এবং সম্ভবত অন্ধ্রেও রয়েছে কমবেশি স্থায়ী কৃষকদের প্রতিরোধ সংগ্রামের এলাকাগুলি – যেখানে শ্রেণীশত্রুদের ওপর লাল সন্ত্রাস কায়েম করা হয়েছে, অতীতেও এরকম অনেক এলাকা গড়ে উঠেছিল যা পরে ধ্বংস হয়ে গেছে বা ধাক্কা খেয়েছে এবং বর্তমানে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় আছে। অপরদিকে রয়েছে ব্যাপক ভারতীয় জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলির এক প্রবণতা – যে সব আন্দোলন জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় ঘটাচ্ছে, এমনকি জাতীয় চরিত্রও অর্জন করছে। ১৯ জানুয়ারির ধর্মঘট বা এমনকি বিহার প্রেস বিলের কথা ধরা যাক! এটি কি এক সর্বভারতীয় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়নি? কেবল সাংবাদিকরাই নন, জনগণের অন্য সমস্ত অংশও এই বিলের বিরোধিতায় সোচ্চার হয়েছেন। কারণ, তাঁরা এটা অনুভব করতে পারছেন যে এই বিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হেনেছে। আজ সংবাদপত্রের সেন্সর ব্যবস্থা চালু হচ্ছে, কাল কাউকেই কথা বলতে দেওয়া হবে না। আর এইভাবে দেখা দিয়েছে গণতান্ত্রিক আকাঙ্খার, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এই প্রবণতা। এখন, এইসব আন্দোলনকে পথভ্রষ্ট করার জন্য বিরোধী দলগুলি, সংশোধনবাদীরা ও স্বার্থপর লোকজনেরা চেষ্টা চালাবে। আর ঠিক এই কারণেই এগিয়ে আসতে হবে সর্বহারাশ্রেণীকে। ১৫ বছর ধরে সর্বহারা শ্রেণী কৃষকদের সঙ্গে থেকেছেন তাঁদের সংগঠিত করেছেন, ব্যাপ্তিতে ও মাত্রায় অভূতপূর্ব বিপ্লবী সংগ্রামে তাঁদের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং আজও তাঁরা প্রতিরোধ সংগ্রামের এলাকাগুলি ধরে রেখেছেন। অতএব উপরোক্ত দুটি প্রবণতাকে একত্রে মেলাতেই হবে। প্রতিরোধ সংগ্রামের এলাকাগুলির ভিত্তিতে একটি সর্বভারতীয় গণফ্রন্ট গড়ে তুলতেই হবে।

কেন এই মোর্চাকে প্রতিরোধ সংগ্রামের এলাকাগুলির ওপর ভিত্তি করতে হবে? কারণ এই এলাকাগুলি কেবল আমূল পরিবর্তনের (radical) কৃষি কর্মসূচির ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে আর আমূল পরিবর্তনের কৃষি কর্মসূচি ছাড়া কোনো সর্বহারা নেতৃত্বও গড়ে উঠতে পারে না। শুধু তাই নয়, এই এলাকাগুলি যুক্তমোর্চার কাজের মডেলও হয়ে উঠবে।

কেউ কেউ বলছেন, মধ্যবর্তী শক্তি ব্যাপারটি কী? আমাদের বক্তব্য হল, মধ্যবর্তী শক্তি হলেন তাঁরা, যাঁরা আমাদের আর শত্রুদের মাঝামাঝি অবস্থানে আছেন। শ্রমিকশ্রেণীর পেটি বুর্জোয়া নেতা, জাতিসত্তার নেতা, নাগরিক স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত ব্যক্তি, বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী, হয়তো কিছু কিছু ধর্মীয় ও নিপীড়িত জাতের নেতা ইত্যাদি যাঁরা বিভিন্ন  রূপে ও মঞ্চে সংগঠিত আছেন। তাঁরা যে দোদুল্যমানতা দেখাবেন তা খুবই স্বাভাবিক; কখনও হয়তো তাঁরা আমাদের কাছে আসবেন, আবার অন্যসময়ে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে টেলিগ্রাম পাঠাবেন। কিন্তু এজন্য কি আমরা দায়ী? আমরা আগেই বলেছি যে তাঁরা মধ্যবর্তী অবস্থানে আছেন। তাঁদের রয়েছে অ-পার্টি ধ্যানধারণা। অ-পার্টি ধারণা কী? লেনিনের কথায়, তা হল সমাজতন্ত্রবিরোধী বুর্জোয়া ধারণা। কমিউনিস্টদের এ ধারণার বিরোধিতা করতেই হবে। কিন্তু এ সত্ত্বেও অ-পার্টি সংগঠনগুলি রয়েই যাচ্ছে, আর সত্যি কথা বলতে কী, গোটা গণতান্ত্রিক বিপ্লবই বহিরঙ্গের দিক থেকে এক অ-পার্টি রূপ – এক মোর্চার রূপ বহন করে। কিন্তু এর মধ্যে চলতে থাকবে সর্বহারা ধারণা ও বুর্জোয়া ধারণার মধ্যে সংগ্রাম, ভেতরে ও বাইরে পার্টিগুলির মধ্যেকার সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই নির্ধারিত হবে পুরো ব্যাপারটির মর্মবস্তু। পার্টিকে স্বাধীনভাবে তার সংগ্রামের এলাকাগুলি ধরে রাখতে হবে আবার এই মোর্চার ভেতরেও কাজ করতে হবে।

এখন, এটা ঠিকই যে এই মোর্চা প্রতিরোধ সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে আছে এবং এর বিস্তার ও বিকাশ সশস্ত্র সংগ্রাম ও ঘাঁটি এলাকা গঠনের বিকাশ ঘটানোয় সহায়ক হবে। কিন্তু কীভাবে এই মোর্চা এগিয়ে যাবে, কোন রূপে এর বিকাশ ঘটবে? এর নিজের বিকাশের নিয়মগুলি কী? এই প্রশ্নে আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে আছি। শুরুতে আমরা কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের কিছু কিছু অংশ ও ভারতের অনেকগুলি জায়গা থেকে মধ্যবর্তী শক্তিদের নিয়ে একটি মোর্টা গড়ে তুলেছি। একটা ছোটো পার্টির পক্ষে এ এক বিরাট সফলতা। সিপিআই(এম)-এর রাজ্যে রাজ্যে সরকার গড়ে তোলার শ্লোগানের বিপরীতে এই মোর্চাকে এগিয়ে আসতে হবে জনগণের সরকার গড়ার স্লোগান নিয়ে – প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের স্লোগান নিয়ে। এমন সময় আসতে পারে যখন জনপ্রিয় প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সংবিধানসভা আহ্বান করার জন্য অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের স্লোগানও এই মোর্চাকে তুলতে হতে পারে। অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের প্রশ্ন অভ্যুত্থানের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। ওপর থেকে অভ্যুত্থান সংগঠিত করার মধ্যে দিয়ে পার্টি ওপর আর নীচ – দুদিক থেকেই শ্রেণীসংগ্রামকে মেলানোর পরিকল্পনা করে। আর এই পরিপ্রেক্ষিতেই এসে পড়ে সংসদীয় নির্বাচনকে কাজে লাগানোর প্রশ্ন। একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচনের বিষয়কে অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলা যায় – তখন সরকারের ওপরেই নির্বাচন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য সময় যখন সংবিধানসভা ও অস্থায়ী বিপ্পবী সরকারের স্লোগানগুলি দীর্ঘদিনের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই তখন নির্বাচনকে কাজে লাগানোর কথা ভাবা যেতে পারে। আর সম্ভাবনা যদি অন্যরকম হয় তাহলে এটা করা ঠিক হবে না।

(ডিসেম্বর ১৯৯২, পঞ্চম পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত)

১। সিপিআই(এমএল) ১৯১৭ সালের কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে পরিচালিত মহান অক্টোবর বিপ্লবের পতাকাকে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরছে। ঐ বিপ্লব শুধুমাত্র পৃথিবীর প্রথম সফল সর্বহারা বিপ্লবই ছিল না, তা এশিয়ায় এক নতুন চেতনার জন্ম দিয়েছিল। ৭৫ বছর পরে ঐ বিপ্লব আজ পরাজিত, কিন্তু তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য চিরদিন অম্লান থাকবে।

২। সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র গঠনে এবং ফ্যাসিস্ত আগ্রাসনের কবল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করতে কমরেড স্তালিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা সিপিআই(এমএল) অবশ্যই স্বীকার করে।

তবে স্তালিনের মধ্যে ভালোমাত্রায় অধিবিদ্যা ছিল এবং এটিই তাঁর দুঃখজনক ভুলগুলির মুখ্য উৎস হিসাবে কাজ করেছে।  তাঁর সময়কালে আন্তঃপার্টি গণতন্ত্র এবং সমাজের অভ্যন্তরে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রেরও গুরুতর বিকৃতি ঘটেছিল।

৩। ষাটের দশকের প্রথমদিকে “মহাবিতর্ক” চলাকালীন মাও জে দং ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টি আধুনিক সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম চালিয়েছিলেন, সিপিআই(এমএল) তার পক্ষে দাঁড়ায়।

সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণী সংগ্রামের অস্তিত্ব ও কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে তার প্রতিফলন, পুঁজিবাদের প্রত্যাবর্তনের বিপদ এবং সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যে এখনও অমীমাংসিত চরিত্রের সংগ্রাম সম্পর্কে কমরেড মাও-এর বক্তব্যগুলি ইতিহাসের নিরীখে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। এইভাবে মাও-এর চিন্তাধারা স্তালিনীয় অধিবিদ্যা এবং ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদের নেতিকরণের মধ্য দিয়ে বিকাশলাভ করে এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে।

মাও-এর সংগ্রাম ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনকে বিরাটভাবে প্রভাবিত করে। আধুনিক সংশোধনবাদের যাবতীয় ভারতীয় সংস্করণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আমাদের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টির উদ্ভবে মাও-এর চিন্তাধারার প্রভূত অবদান রয়েছে।

৪। সমাজতন্ত্রের নতুন প্রাণ সঞ্চারের জন্য ব্রেজনেভ-উত্তর সোভিয়েত ইউনিয়নে অতি বৃহৎ শক্তির অবস্থানের আমূল পরিবর্তন, অনমনীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলির পুনর্নিমাণ একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। তাই গর্বাচভ যখন ‘পেরেস্ত্রৈকা’ ও ‘গ্লাসনস্ত’-এর প্রয়োগে নামেন তখন বিশ্বের কমিউনিস্টরা, প্রগতিশীল শক্তিগুলি ও গণতান্ত্রিক মানুষ তাঁকে ব্যাপক সমর্থন জানান। কিন্তু ক্রমশ বোঝা যায় যে উদারনৈতিক বুর্জোয়া মতাদর্শ ও পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতেই গর্বাচভ কাজ করছেন। সিপিআই(এমএল) তাই দলত্যাগী হিসাবে গর্বাচভকে ধিক্কার জানাচ্ছে।

৫) সিপিআই(এমএল) যে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র ও অতিবৃহৎ পার্টির ধারণার তীব্র বিরোধী। আন্তর্জাতিক বিষয়গুলিতে নিজস্ব উপলব্ধির ভিত্তিতে এক স্বাধীন নীতির অনুসরণে সে বিশ্বাসী। ভিয়েতনামের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও উন্নত করার জন্য চীনা প্রয়াসকে আমরা যেমন স্বাগত জানাই, তেমনই আবার উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ে চীনা বিদেশনীতি সমালোচনা না করে আমরা পারি না।

৬) ভারতের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একটি বহুদলীয় ব্যবস্থা সমন্বিত সর্বহারা রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে সিপিআই(এমএল) নাকচ করে দেয় না। একমাত্র অনুশীলনের প্রক্রিয়াতেই ঐ রাষ্ট্রের চরিত্র ও রূপ নির্ধারিত হতে পারে।

৭) বিশ্ব-বুর্জোয়াদের সর্বাত্মক আক্রমণের মুখে মার্কসবাদের সপক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো, মার্কসবাদের বিপ্লবী অন্তর্বস্তুকে পুনরুদ্ধার করা ও ভারতীয় বিপ্লব সম্পন্ন করার প্রক্রিয়ায় তাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলাকে সিপিআই(এমএল) তার অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলে মনে করে।

(১৯৯১ সালে প্রকাশিত একটি পুস্তিকা)

সিপিআই(এমএল)-এর উত্থান : এক নতুন পথের সূচনা

সুবিধাবাদী ও বিপ্লবী ধারার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম ভাঙ্গন হয় ১৯৬৪ সালে এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) নামে একটি নতুন পার্টি গঠিত হয়। কিন্তু বিপ্লবী ধারার প্রতিনিধিদের এটি উপলদ্ধি করতে খুব বেশি সময় লাগেনি যে আন্দোলনের মধ্যপন্থী ধারার প্রবক্তারাই নতুন পার্টির নেতৃত্ব দখল করেছে এবং এই নেতৃত্ব সুবিধাবাদী ধারা অনুসরণ করতে বদ্ধপরিকর। সমগ্র পার্টি জুড়ে এক আন্তঃপার্টি সংগ্রাম শুরু হয়ে গেল। অবশ্য কেন্দ্রীভূতভাবে এই সংগ্রাম চালিয়ে গেলেন কমরেড চারু মজুমদার ১৯৬৫-৬৬-র মধ্যে লেখা তাঁর বিখ্যাত আটটি দলিলের মাধ্যমে।

দেশব্যাপী গণআন্দোলন ফেটে পড়ার এই পর্যায়ে উত্তর-সাতচল্লিশ ভারতীয় রাজনীতি প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিল। পশ্চিমবাংলায় সিপিআই(এম)-এর আধিপত্য সমন্বিত যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসীন হল এবং পার্টি নেতৃত্বের রণনীতিগত দিক থেকে সুবিধাবাদী পথে উত্তরণ সম্পূর্ণ হল। এর বৈপরীত্যে, বিপ্লবী ধারার প্রতিনিধিরা আন্তঃপার্টি সংগ্রামের সীমানা পেরিয়ে গণসংগ্রামগুলিকে, বিশেষত কৃষক আন্দোলনকে, বিপ্লবী রণনৈতিক গতিধারায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালালেন। পার্টির মধ্যে চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন অংশটি দ্বারা সংগঠিত নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থান সিপিআই(এম)-এর মধ্যে দুই রণনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত লাইনের মধ্যে প্রথম চূড়ান্ত সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করল।

সমাজগণতন্ত্রী বিশ্বাসঘাতকতার চিরাচরিত প্রথার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ক্ষমতাসীন পার্টি বুলেট দিয়েই প্রত্যুত্তর দিল এবং পার্টির ভিতরকার চাপা বিদ্রোহ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সারা ভারতের বিপ্লবী কমিউনিস্টরা পার্টি থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে সারা ভারত বিপ্লবী কমিউনিস্টদের সমন্বয় কমিটি (এআইসিসিসিআর) নামে নতুন কেন্দ্রের চারপাশে সমবেত হওয়ার সাথে সাথে সিপিআই(এম)-এর মধ্যে প্রথম বড় ধরনের ভাঙ্গন ঘটল। ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল সিপিআই(এমএল)-এর গঠন এই নতুন কেন্দ্রকে এক সংগঠিত ও কেন্দ্রীভূত রূপ প্রদান করল। ১০৭০ সালে মে মাসে কলকাতায় সিপিআই(এমএল)-এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় এবং কমরেড চারু মজুমদার ২১ জন সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

পরবর্তী দু-বছরের ইতিহাস হল ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে অতুলনীয় বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের কাহিনী। চীন বিপ্লবের আদলে গ্রামাঞ্চলের নির্বাচিত এলাকাগুলিতে গেরিলা যুদ্ধ, লালফৌজ ও ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা চালানো হল। এর পাশাপাশি সহায়ক আন্দোলন হিসাবে বিশেষত পশ্চিমবাংলায় ও কলকাতা শহরে ছাত্র ও যুবদের এক শক্তিশালী আন্দোলন বিকশিত হয়েছিল এবং এই আন্দোলন তথাকথিত বাংলার নব জাগরণের সময় থেকে গড়ে ওঠা শাসক শ্রেণীর মতাদর্শের সমগ্র ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল।

অবশ্য, চমকপ্রদ বিপ্লবী প্রাণশক্তি এবং তীব্রতা সত্ত্বেও সিপিআই(এমএল) আন্দোলনের এই প্রথম পর্যায় ভারতীয় সমাজের বিপ্লবীকরণের জটিল সমস্যার বিশদ ও সুসংহত সমাধান দিতে পারেনি। অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মধ্যে আন্দোলন শীঘ্রই বিপর্যয় ও ধাক্কার মুখে পড়ে।

সত্তর দশকের মধ্যভাগ : নানা ভাঙ্গন ও বিভ্রান্তির মধ্যে পার্টিকে বাঁচিয়ে রাখা হল

১৯৭২-এর মাঝামাঝি এসে গোটা পার্টি প্রায় পঙ্গু হয়ে গেল। সমগ্র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল। অবশিষ্ট পার্টি শক্তিগুলি বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত অবস্থায় পড়ে গেল। আর পার্টি লাইনের প্রশ্নে চারদিকে বিরাজ করছিল বিভ্রান্তি।

এই সন্ধিক্ষণে, ১৯৭৪-এর ২৮ জুলাই কমরেড চারু মজুমদারের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হল। এই কমিটি গঠিত হয় মাত্র তিনজন সদস্যকে নিয়ে – সাধারণ সম্পাদক কমরেড জহর এবং কমরেড বিনোদ মিশ্র ও কমরেড রঘু (স্বদেশ ভট্টাচার্য)। এই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতি আনুগত্য দেখাল পুনর্গঠিত বিহার রাজ্য কমিটি, যে কমিটি ভোজপুর ও পাটনা জেলার কয়েকটি ব্লকের বিকাশমান কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিল, আর আনুগত্য দেখাল নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ নেতৃত্বকারী টিম যা তখন পার্টিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রাণপণ সংগ্রাম করে চলেছে এবং পূর্ব উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লীর কমরেডদের একাংশ।

যদিও খুব শীঘ্রই পার্টি আবার এক বড় ধাক্কা খেল, বিহারে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পার্টির বহু নেতা, ক্যাডার ও যোদ্ধা নিহত হলেন। ১৯৭৫-এর নভেম্বরে পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড জহরও ভোজপুরের এক গ্রামে পুলিশী আক্রমণের মোকাবিলায় শহীদের মৃত্যু বরণ করলেন। কমরেড বিনোদ মিশ্র সাধারণ সম্পাদক হলেন, আর ১৯৭৬-এর ফেব্রুয়ারি মাসে বিহারের গয়া জেলার একটি গ্রামে অনুষ্ঠিত হল পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস। পার্টি কংগ্রেস ১১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত করল, কমরেড বিনোদ মিশ্র হলেন সাধারণ সম্পাদক। এই পার্টিই পর্যায়ক্রমে তার ইংরেজি কেন্দ্রীয় মুখপত্রের নামানুসারে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন গোষ্ঠী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে।

১৯৭৭ সাল পর্যন্ত আমরা মূলত পুরোনো লাইনই অনুসরণ করেছিলাম, বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর উপর গেরিলা আক্রমণ এবং বিপ্লবী কমিটিগুলির মাধ্যমে জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতা সংগঠিত করার উপর। বিহারের ভোজপুর ও পাটনা জেলা, পশ্চিমবাংলার নকশালবাড়ি ও বাঁকুড়া জেলা এবং উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর ও বালিয়া জেলায় আন্দোলনকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লাগাতার প্রচেষ্টা চালানো হল। কিন্তু বীরত্বপূর্ণ কাজকর্ম ও মহান আত্মত্যাগ সত্ত্বেও পার্টি লাইন স্পষ্টতই ছিল বাম হঠকারী (Left-Adventurist) চরিত্রের এবং গণউদ্যোগের দ্বারকে কোনো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উন্মুক্ত করতে এই লাইন ব্যর্থ হয়েছিল। আমাদের কঠোর প্রচেষ্টাগুলির ফসলকে সংহত করতেও পার্টি পারেনি।

সমগ্র দেশবাসীর কাছে ঐ দিনগুলি ছিল চরম নিপীড়নের অন্ধকারময় দিন, যাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল জরুরি অবস্থার মাধ্যমে। আর আমাদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ, বিশেষত ভোজপুরে, বাস্তবে জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলনের অংশ হয়ে গিয়েছিল। তত্ত্বগত দিক থেকেও পার্টি কংগ্রেস বিরোধী এক যুক্তমোর্চা গড়ে তোলার ধারণা আঁকড়ে ধরেছিল, যদিও বাস্তবে তা অনুশীলন হতে পারেনি।

যাই হোক, ঐ দিনগুলিতে যখন সিপিআই কংগ্রেসের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিল, সিপিআই(এম) সম্পূর্ণভাবে অকার্যকরী হয়ে পড়েছিল এবং সিপিআই(এমএল)-এর অন্যান্য গোষ্ঠীগুলি ছত্রভঙ্গ অবস্থায় ছিল, তখন সমগ্র বাম শিবিরের মধ্যে কেবল আমাদের পার্টিই চরম নিপীড়নের কঠিন পরিস্থিতিতেও লাল পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল। অবশেষে ১৯৭৭ সালে যখন পর্দা সরে গেল, ভোজপুরের আকাশে লাল তারা আর আমাদের ছোট্ট সংগঠন, সারা দেশের বিপ্লবীদের এবং নতুন জীবন পাওয়া ভারতীয় সংবাদ জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ইতিমধ্যে আসাম ও ত্রিপুরাতেও পার্টির কাজ বিস্তার লাভ করেছিল এবং অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও কেরালা থেকেও কমরেডরা পার্টিতে যোগ দিলেন। ১৯৭৯ সালের মধ্যেই আমাদের পার্টি সর্বভারতীয় চরিত্র অর্জন করল।

পুরোনো ভুলগুলিকে শুধরে নেওয়ার মাধ্যমে নতুন শক্তি সঞ্চয়

১৯৭৮ সালে পার্টি এক শুদ্ধিকরণ আন্দোলন শুরু করে। এটি শুরু হয়েছিল শুধুমাত্র কাজের ধারাকে শুধরে নেওয়ার সীমিত উদ্দেশ্য নিয়ে, কিন্তু শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের প্রাণশক্তি রাজনৈতিক লাইনকেও রেহাই দিল না। পার্টি লাইন ও অনুশীলণের মধ্যে বড় বড় পরিবর্তন ঘটতে লাগল এবং এগুলিকে ১৯৭৯-র জুলাই মাসে ভোজপুরের একটি গ্রামে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ পার্টি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নির্দিষ্টি রূপ দেওয়া হল। ঐ সম্মেলন গণসংগঠনের মাধ্যমে প্রকাশ্য গণকার্যকলাপের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এই সন্ধিক্ষণে নকশালবাড়ি আন্দোলনের দুই ধারার মধ্যে বিতর্ক তীব্রতর রূপ পরিগ্রহ করে, যে দুটি ধারার প্রতিনিধিত্ব করছিল আমাদের সংগঠন এবং অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি (পিসিসি)। বিভিন্ন গোষ্ঠীর এক সুবিধাবাদী জোট পিসিসি যে তৎপরতায় অতীতের সমস্ত ভুলগুলি শুধরে নেওয়া শুরু করে তার জন্য সে প্রচুর প্রশংসা ও সমর্থন লাভ করে। এর কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব সত্যনারায়ণ সিং ১৯৭০ সালেই আন্দোলন থেকে সরে গিয়ে বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের সঙ্গে মাখামাখি শুরু করেন। তিনি জরুরি অবস্থার সময়ে জয়প্রকাশের পিছন পিছন চলার ওকালতি করেন, ১৯৭৭ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চরণ সিং-এর সঙ্গে একটি সমঝোতা করেন এবং হিংসা পরিত্যাগের মুচলেখা দিয়ে নকশালপন্থী বন্দীদের জেল থেকে বেরিয়ে আসতে বলেন, এবং পরিশেষে কংগ্রেস বিরোধী কুলাক ও বৃহৎ বুর্জোয়াদের সঙ্গে ঐক্যের প্রবক্তায় পরিণত হন।

একেবারে শুরু থেকেই আমরা দেখিয়ে এসেছি যে, পিসিসি-র সামগ্রিক প্রেক্ষিত হচ্ছে বিলোপবাদী এবং তারা প্রকৃতপক্ষে আন্দোলনের মৌলিক বিপ্লবী মানসিকতাকে “শুধরে” দিতে চাইছে। আমরা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলাম যে বিভিন্ন গোষ্ঠীর এই সুবিধাবাদী আঁতাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না। অবশ্য, একটি ঐক্যের চেহারা প্রদর্শন করে এবং দীর্ঘদীন ধরে জমে থাকা সংগ্রাম ও সংগঠনের রূপের পরিবর্তনগুলি করার মাধ্যমে পিসিসি ভালো সংখ্যক বিপ্লবী শক্তিকে শুরুতে তার দিকে টানতে সক্ষম হয়। কিন্তু শীঘ্রই তার স্ব-ঘোষিত তাত্ত্বিকদের হাজির করা অবাস্তব তত্ত্বের গোলকধাঁধায় পিসিসি আটকে পড়ে এবং যত সংখ্যক গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল তার চেয়েও বেশি সংখ্যক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায়।

ইতিমধ্যে, আমাদের পার্টি যে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত শুদ্ধিকরণ অভিযান শুরু করে তা ফল দিতে থাকে। বিভিন্ন খোলা রূপের গণকার্যকলাপ শুরু করার ফলে কৃষক জনগণের জঙ্গী প্রতিরোধ সংগ্রাম ব্যাপ্তি ও তীব্রতা উভয় দিক থেকেই নতুন উচ্চতায় পৌঁছয় এবং পিসিসি থেকে বিপ্লবী শক্তি আমাদের পার্টিতে যোগ দিতে শুরু করে। পিসিসি-র চ্যালেঞ্জ ঐখানেই শেষ হয়ে যায়।

অন্য বিলোপবাদী কসরতটি ফেরী করতে থাকেন নকশালবাড়ির আর এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা কানু সান্যাল। তিনি সিপিআই(এমএল) এবং তার ঐতিহ্যকে খোলাখুলি নিন্দা করেন এবং প্রাক-সিপিআই(এমএল) সমন্বয়ের পর্যায়কে পুনর্জীবিত করার কথা বলেন। তিনি কেবলমাত্র পড়ে থাকা কিছু শক্তিকে সমাবেশিত করতে সমর্থ হন এবং আমাদের সংগঠনকে কখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারেননি।

এই সমস্ত বিলোপবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অবশেষে আমরা সিপিআই(এমএল)-এর সর্বাপেক্ষা বৃহৎ গোষ্ঠী হিসাবে আবির্ভূত হই।

আইপিএফ গঠন : রাজনৈতিক আত্মঘোষণায় এক নতুন উল্লম্ফন

ইতিমধ্যে পার্টি জাতীয় রাজনৈতিক আঙ্গিনায় তার উপস্থিতি ঘোষণার চরম প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করে। কেন্দ্রে প্রথম অকংগ্রেসী সরকার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যর্থ হওয়া এবং ইন্দিরা রাজত্বের প্রত্যাবর্তনের পরে জাতীয় রাজনৈতিক বিকল্প নিয়ে জাতীয় স্তরে বিতর্ক শুরু হয়ে যায় এবং এক বিপ্লবী গণতান্ত্রিক প্রেক্ষিত থেকে এই চলমান বিতর্কে হস্তক্ষেপ করার জন্য আমরা একটি গণরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

অন্যান্য কমিউনিস্ট বিপ্লবী সংগঠনগুলির সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে ঐ ধরনের মঞ্চ গড়ে তোলার জন্য দ্বি-পাক্ষিক এবং বহু-পাক্ষিক উভয় স্তরেই আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো হয়। ১৯৮১ সালে আমাদের পার্টি সিপিআই(এমএল)-এর প্রায় সমস্ত বড় গোষ্ঠীগুলি সহ ১৩টি কমিউনিস্ট বিপ্লবী সংগঠনের একটি সভা অহ্বান করে। আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করার সেই ছিল প্রথম এবং শেষ প্রয়াস। একই সাথে আমরা অ-পার্টি গণআন্দোলনের উদীয়মান মধ্যবর্তী শক্তিগুলির সঙ্গে ব্যাপকভাবে আন্তঃক্রিয়া চালানোর প্রক্রিয়াও শুরু করি। এই সমস্ত প্রচেষ্টাগুলির পরিণতি হিসাবে অবশেষে ১৯৮২-র ২৪-২৬ এপ্রিল দিল্লীতে তিনদিন ব্যাপী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ইন্ডিয়ান পিপলস ফ্রন্ট গঠন হয়।

১৯৮২-র ডিসেম্বরে বিহারের গিরিডি জেলার একটি গ্রামে পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই পার্টি কংগ্রেস যথেষ্ট প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্রের ছিল এবং কংগ্রেস ১৭ জন পূর্ণ সদস্য ৮ জন বিকল্প সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচন করে। কেন্দ্রীয় কমিটি কমরেড বিনোদ মিশ্রকে সাধারণ সম্পাদক হিসাবে পুনর্নির্বাচিত করে। এক তীব্র বিতর্কের পর পার্টি কংগ্রেস নির্বাচনে অংশগ্রহণের কৌশল গ্রহণ করে। পার্টি কংগ্রেস অবশ্য কৃষক জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রামকে মূল যোগসূত্র হিসাবে আঁকড়ে ধরার এবং সমস্ত সংসদীয় কার্যকলাপকে অ-সংসদীয় গণসংগ্রামের অধীনে রাখার সংকল্প পুনরায় ঘোষণা করে। পার্টি ১৯৮৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম অংশগ্রহণ করে, অবশ্য আইপিএফ-এর পতাকা নিয়ে।

আইপিএফ-এর গঠন পার্টির সামনে রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং অগ্রগতির নতুন রাস্তা খুলে দেয়। শীঘ্রই বিভিন্ন রাজ্যের রাজধানীতে প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে গণসমাবেশ এবং গণবিক্ষোভ সংগঠিত করা পার্টি অনুশীলনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রথমবার পার্টির ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে ব্যাপক জনগণকে রাজনৈতিক সংগ্রামে সমাবেশিত করে পার্টি বিমূর্ততার জগত থেকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কার্যকলাপের জগতে প্রবেশ করতে বড় আকারে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। একদিকে পার্টির রাজনৈতিক পরিচালনার মাধ্যমে এবং দৃঢ় কমিউনিস্টদের বিভিন্ন নেতৃত্বকারী পদে বসিয়ে গণরাজনৈতিক সংগঠনের উপর কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বকে সুনিশ্চিত করা হয়, আর অন্যদিকে গণরাজনৈতিক সংগঠন (MPO) বিভিন্ন ধারার রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলির সঙ্গে ব্যাপকতর আন্তঃক্রিয়া বাড়িয়ে তুলে পার্টিকে তার প্রভাব বাড়াতে ও নিজস্ব সামাজিক ভিত বিস্তৃত করতে সাহায্য করে।

জনপ্রিয় গণবিপ্লবী পার্টির আদলে একটি বিশেষ রূপের যুক্তমোর্চা হিসাবে আইপিএফ তত্ত্ব ও অনুশীলন উভয় দিক থেকেই ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে আমাদের পার্টির বিরল সাফল্যগুলির অন্যতম স্মারক। ভারতীয় রাজনীতিতে আইপিএফ তার নিজস্ব স্থান করে নিয়েছে এবং পার্টির সমস্ত ব্যবহারিক রাজনৈতিক কার্যকলাপ তার মাধ্যমেই চলতে থাকে।

চতুর্থ পার্টি কংগ্রেস এবং বাম মহাজোটের আহ্বান

১৯৮৮-র জানুয়ারি মাসে বিহারের হাজারিবাগ জেলার একটি গ্রামে পার্টির চতুর্থ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও তার বর্ধিত উপলব্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পার্টি বেশ কিছু সেকেলে ধ্যানধারণা ও গতানুগতিক অবস্থানের আমূল সংস্কার ঘটায় এবং এইভাবে ভারতীয় রাজনীতির মূল ধারায় প্রবেশ করা ও তাকে নতুন চেহারা দেওয়ার পথ পরিষ্কার করে। কমিউনিস্ট বিপ্লবী অর্থাৎ নকশালপন্থী গোষ্ঠীগুলির ঐক্যের একঘেয়ে বুলি পরিত্যাগ করে পার্টি কংগ্রেস প্রধান প্রধান বাম পার্টিগুলির সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাম ও গণতান্ত্রিক মহাজোটের আহ্বান রাখে। কংগ্রেস ২১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত করে, আর কেন্দ্রীয় কমিটি ৫ সদস্যের রাজনৈতিক ব্যুরো ও সাধারণ সম্পাদক হিসাবে কমরেড বিনোদ মিশ্রকে নির্বাচিত করে।

১৯৭০ দশকের সিপিআই(এমএল) আন্দোলন এতদিনে দুটি নির্দিষ্ট ধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে – একটি ধারার প্রতিনিধিত্ব করছে আমাদের পার্টি, যে ধারা তত্ত্ব ও অনুশীলন উভয় দিক থেকেই নৈরাজ্যবাদী বিচ্যুতির বিরুদ্ধে ব্যাপক ও ধারাবাহিক সংগ্রাম চালিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে পুনরুজ্জীবিত করেছে এবং পার্টিকে কমিউনিস্ট ঐতিহ্য, বিপ্লবী গণসংগ্রাম ও পুরোমাত্রায় রাজনৈতিক উদ্যোগের পথে ফিরিয়ে এনেছে। অন্য ধারার প্রতিনিধি হল মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র, দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটি, পার্টি ইউনিটি ও পিসিসি-র কিছু গোষ্ঠী, যারা এই নৈরাজ্যবাদী বিচ্যুতিগুলিকে এক পুরোদস্তুর তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে পূর্ণতা দিয়েছে। এই নৈরাজ্যবাদী চ্যালেঞ্জ সমগ্র সিপিআই(এমএল) আন্দোলনের মধ্যে গত কয়েক বছরে নিজেকে সংহত করেছে এবং আমাদের পার্টির অগ্রগতির পথে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবশ্য, আমাদের পার্টির মধ্যে, নৈরাজ্যবাদী বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় বিলোপবাদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। চতুর্থ পার্টি কংগ্রেসের পরে পরেই বিলোপবাদী প্রবণতা কুৎসিতভাবে মাথাচাড়া দেয়। এক দক্ষিণপন্থী সমর্পণবাদী অবস্থান থেকে শুরু করে এই প্রবণতা সুবিধাবাদী বামেদের সঙ্গে আমাদের পার্টির মৌলিক পার্থক্যকে মুছে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এই প্রবণতা এখানেই থেমে থাকল না বরং খুব শীঘ্রই বিপ্লবী গণতন্ত্র ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মধ্যেকার সমস্ত পার্থক্যই মুছে দেওয়ার কথা বলল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের ঘটনাবলীর বিকাশে উৎসাহিত হয়ে এই প্রবণতা মার্কসবাদ এবং কমিউনিস্ট পার্টিকেই পরিত্যাগ করার কথা বলল এবং পুরোদস্তুর সংস্কারমূলক এক কর্মসূচির ওকালতি করল। এদের প্রধান প্রবক্তা বর্তমানে এক পরিসংখ্যান কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য সামাজিক অনুসন্ধানে রত আছেন, যার উদ্দেশ্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলির উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে সাহায্য করা।

আমাদের পার্টি দৃঢ়ভাবে এই বিলোপবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করে পার্টিকে ভাঙ্গার সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ করে দিয়েছে। সত্যি কথা বলতে গেলে, চতুর্থ কংগ্রেসের পরবর্তী বছরগুলিতে পার্টির এক গুণগত বিকাশ লক্ষ্য করা গেছে। ১৯৮৯-এর সংসদীয় নির্বাচনে পার্টি সংসদে প্রথম মার্কসবাদী-লেনিনবাদী প্রতিনিধি পাঠাতে সমর্থ হয় এবং ১৯৯০-এর বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে বিহার বিধানসভায় এক ভালো আকারের বিধায়ক গোষ্ঠী গঠন করতে সফল হয়।

১৯৯০-এর ৮ অক্টোবর রাজধানী দিল্লীতে আইপিএফ আহুত জমায়েতের সাফল্য সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বিষয়। এই জমায়েত বিপ্লবী মার্কসবাদের অবিনশ্বর সত্তাকে তুলে ধরেছে এবং জাতীয় রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে বিপ্লবী বামপন্থীদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে সামনে এনেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের বিশাল জমায়েত বাম শিবিরের অভ্যন্তরে শক্তির পুনর্বিন্যাস শুরু করে দিয়েছে। এই জমায়েত বাম ঐক্যের দুই কৌশলগত লাইন ও অবস্থানের মধ্যেকার সংগ্রামকে সামনে এনেছে – ভারতীয় সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক রূপান্তরণের জন্য বামপন্থীরা বুর্জোয়াশ্রেণী ও বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করবে, না তাদের নিজেদেরই নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালানো এবং শুধুমাত্র গণসংগ্রামের উপর নির্ভর করা উচিত।

বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবাংলায় ব্যাপক সংখ্যক শক্তি সিপিআই ও সিপিআই(এম) থেকে বিপ্লবী গণতন্ত্রের পতাকাতলে সমাবেশিত হচ্ছে, আর প্রায় সমস্ত প্রধান বামপন্থী পার্টিগুলির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের বিকাশ ঘটানো গিয়েছে এবং যৌথ কার্যকলাপ ও এক বাম মহাজোটের বিকাশ ঘটানোর জন্য পথের অনুসন্ধান চলছে।

সিপিআই(এম) এবং সিপিআই(এমএল)-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্যগুলিকে আয়ত্ত করা

সিপিআই(এম) এবং আমাদের পার্টির মধ্যে মৌলিক পার্থক্যগুলির পুনরুল্লেখ করা এখানে হয়তো অসঙ্গত হবে না। ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে সুবিধাবাদী ধারা সর্বাগ্রে চিহ্নিত হয় ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী সম্বন্ধে তার চরিত্রায়ণের দ্বারা। বিভিন্ন শব্দ ও ভাষার কারুকাজের আবরণে সুবিধাবাদী ধারা ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর ‘জাতীয়’ চরিত্রের উপরই মূলত গুরুত্ব দেয় এবং এইভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রামে ও ভারতীয় সামাজের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটানোয় বুর্জোয়াশ্রেণীর নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। এই তত্ত্ব রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ক্ষেত্রের মধ্যে দ্বন্দ্বকে বাড়িয়ে দেখার এবং কখনও ফ্যাসিবাদ বিরোধী ফ্রন্ট এবং কখনও গণতান্ত্রিক অথবা ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রন্টের নামে বিভিন্ন বুর্জোয়া-জমিদার পার্টিগুলির লেজুড়বৃত্তির ওকালতি করার দিকে পরিচালিত করেছে।

সুবিধাবাদী ধারার মতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রধান দ্বন্দ্ব (মার্কিন) সাম্রাজ্যবাদ বনাম (সোভিয়েত) সমাজতন্ত্রের। প্রধান আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বকে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে টেনে নিয়ে আসায় তা ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর তথাকথিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী তত্ত্বকেই যুক্তিযুক্ত করেছে, কেননা ভারতীয় বুর্জোয়াশ্রেণী সোভিয়েত ব্লকের সঙ্গে সবসময়েই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

তৃতীয়ত এবং ভারতীয় বুর্জোয়াশ্রেণীর চরিত্র সম্বন্ধে তার উপলব্ধি অনুসারে, সুবিধাবাদী ধারা গণতান্ত্রিক রূপান্তরণের জন্য প্রধান শক্তি হিসাবে শ্রমজীবী কৃষকশ্রেণীর ব্যাপক জনতাকে সংগঠিত করতে অস্বীকার করে। বিপরীতে, এই ধারা কুলাক লবির সঙ্গে এক সমঝোতা গড়ে তুলেছে, এই সমঝোতাই বিভিন্ন আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে তার স্থায়ী রাজনৈতিক সম্পর্কের পিছনে কাজ করে চলেছে।

সবশেষে, প্রথম তিনটি নির্দিষ্ট বিষয়ের অবিচ্ছেদ্য অতিরিক্ত অঙ্গ হিসাবে এই সুবিধাবাদী ধারা আমাদের দেশের জরুরি সামাজিক সংস্কার ঘটানোর জন্য বু্র্জোয়া প্রতিষ্ঠানগুলির উপরই প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল। এটাই সুবিধাবাদী বামকে পঙ্গু করেছে, লেনিন যাকে বলেছেন সংসদ-সর্বস্বতা।

এর বিপরীতে, বিপ্লবী ধারা সবসময়েই ভারতীয় বুর্জোয়াশ্রেণীর মুৎসুদ্দি চরিত্রের উপর জোর দিয়েছে এবং তা থেকে বুঝিয়েছে যে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রামের নেতৃত্ব সর্বহারাকেই দিতে হবে এবং বুর্জোয়াদের উপর নির্ভরতা আমাদের কোনো কাজেই আসবে না। তৃতীয় বিশ্ব বনাম সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্বই প্রধানতম – এই উপলব্ধিই বিপ্লবী ধারাকে ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা’কে পরখ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে সোভিয়েত ব্লকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিমাপের বদলে আঞ্চলিক সংহতি ও তৃতীয় বিশ্বের স্বার্থের প্রতি তার দায়বদ্ধতার স্বাধীন কষ্টিপাথরে। বিপ্লবী ধারা গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য কৃষি বিপ্লবকেই অক্ষ হিসাবে দেখে এবং কৃষি শ্রমিক ও শ্রমজীবী কৃষক জনতার জঙ্গী গণআন্দোলন সংগঠিত করার উপর সর্বাপেক্ষা জোর দেয়। আর সংসদ-সর্বস্বতার বিপরীতে অ-সংসদীয় সংগ্রামের উপরই বিপ্লবী ধারা মূলত নির্ভর করে।

বিপ্লবী ও সুবিধাবাদী ধারার মধ্যে সংগ্রামের এগুলিই মূল রূপরেখা। একে আমরা ভারতীয় পরিস্থিতিতে মেনশেভিক ও বলশেভিক কৌশলের মধ্যে বিতর্কের ধারাবাহিকতা বলতে পারি।

১৯৬৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত সিপিআই(এম)-এর বিকাশ কেবলমাত্র সুবিধাবাদী পথে তার যাত্রাকে সুনির্দিষ্ট করেছে। সিপিআই তার অবস্থানকে কৌশলগত দিক থেকে কিছুটা ঠিকঠাক করে নেওয়ায়, আন্তর্জাতিক পার্থক্যগুলি পিছনে চলে যাওয়ার এবং প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে দু-দল একসঙ্গে চলার ফলে ১৯৬৪ সালের যৌক্তিকতা আজ এক বড় প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। অপরদিকে, সিপিআই(এম)-এর মধ্যে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে এবং পার্টি থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় সমস্ত বিক্ষুব্ধ শক্তি পার্টি নেতৃত্বকে ১৯৬৪-র কর্মসূচি থেকে বিচ্যুতির জন্য অভিযুক্ত করছে। এইভাবে ১৯৬৪-র ভাঙ্গনের রাজনৈতিক যৌক্তিকতা আজ অর্থহীন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, বিপ্লবী অবস্থানকে একেবারে বিপরীত মেরুতে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ভারতীয় বুর্জোয়াদের মুৎসুদ্দি চরিত্রকে প্রসারিত করে বুর্জোয়া শ্রেণীর কোনো অংশের সাথে যে কোনো ধরনের কৌশলগত সমঝোতাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও বিচ্যুতি দেখা যায় তিন বিশ্বের তত্ত্বকে অন্ধভাবে অনুসরণ করার ফলে, সমস্ত ধরনের মার্কিনপন্থী শক্তিগুলিকে নিয়ে এমনকি কোনো কোনো পরিস্থিতিতে মার্কিনকে নিয়েও, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী একটি ফ্রন্ট গড়ে তোলার কথা বলে ঐ তত্ত্বকে অবাস্তব পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কৃষি বিপ্লবকে ভাবা হয়েছিল সম্পূর্ণভাবে চীন বিপ্লবের অনুসরণে এবং অ-সংসদীয় সংগ্রামের মুখ্য ভূমিকাকে এইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল যে, সংসদীয় সংগ্রামের সমগ্র ধারা চিরতরে বর্জনীয়। বিপ্লবী জোয়ারের পরিস্থিতিতে এই উপলব্ধিগুলি কিছুটা কাজ দিয়েছিল, কিন্তু আন্দোলনের প্রকৃত পশ্চাদপসরণের সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে ঐ স্লোগানগুলিতে অনড় থাকার প্রাণপণ প্রচেষ্টা শূন্যগর্ভ নৈরাজ্যবাদী বুলিসর্বস্বতা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি।

বহুবিধ কার্যকলাপ এবং প্রকাশ্য পার্টি অনুশীলনের ক্রমবর্ধমান পুনরারম্ভ

সমাজতন্ত্রের ধারাবাহিক গভীর সংকট এবং নবোদ্যমে বুর্জোয়া আক্রমণের মুখে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে রক্ষা করার জন্য পার্টি ১৯৯০-এর জুলাইয়ে দিল্লীতে বিশেষ সম্মেলনে প্রায় কুড়ি বছর বাদে পুনরায় প্রকাশ্য কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই অনুযায়ী পার্টির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য মুখপত্রগুলি খোলাভাবেই প্রকাশিত হতে শুরু করেছে; প্রকাশ্য সমাবেশ ও বিক্ষোভ প্রদর্শনে পার্টি পতাকা উড়ছে; মার্কসবাদের সপক্ষে সেমিনার করা হচ্ছে, ক্রমেই বেশি বেশি সংখ্যক মানুষকে প্রাথমিক মার্কসবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য এবং গণসংগ্রাম থেকে উঠে আসা বহুসংখ্যক শক্তিকে পার্টিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এক ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে।

পার্টি সারা ভারত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন কাউন্সিল (এআইসিসিটিইউ) নামে সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গঠন করেছে এবং রাজ্য স্তরের কৃষক সমিতিগুলির কাজগুলিকে একটি জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে সমন্বয় সাধন করার পরিকল্পনা করেছে। ছাত্রফ্রন্টে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস এ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ) নামে জাতীয় স্তরের সংগঠন ইতিমধ্যেই গঠন করা হয়েছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মহিলা ও সাংস্কৃতিক ফ্রন্টেও জাতীয় স্তরের সংগঠন গড়ে তোলার কর্মসূচি রয়েছে।

পার্টি তার নিজস্ব মুখপত্রগুলি, আইপিএফ মুখপত্র এবং পাটনা থেকে প্রকাশিত হিন্দী সাপ্তাহিক সমকালীন জনমত-এর মতো জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে এক প্রচার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ১৯৮৬-তে প্রকাশিত হয় রিপোর্ট ফ্রম দি ফ্লেমিং ফিল্ডস অফ বিহার (Report from the Flaming Fields of Bihar), এটি রাজ্যের পরিবর্তিত কৃষি ও সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিহারের বিকাশমান বিপ্লবী কৃষক আন্দোলনের এক বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনা। বইটি ভারত এবং ভারতের বাইরে বিপ্লবী ও বিদ্বৎ সমাজে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। বর্তমানে পার্টি ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস গভীরভাবে অধ্যয়ন করছে এবং এই ইতিহাস পাঁচখণ্ডে প্রকাশ করার পরিকল্পনা আছে।

পার্টি আসামের কার্বি আংলঙের সংখ্যালঘু জাতিসত্তা অঞ্চলে স্বশাসিত রাজ্য দাবি কমিটি (Autonomous State Demand Committee) নামে একটি গণরাজনৈতিক সংগঠনের বিকাশ ঘটিয়েছে এবং স্বশাসিত জেলা প্রশাসন পরিচালনা সহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্মই এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আমরা যেমন জাতীয় সংখ্যালঘুদের বিশেষ বিশেষ সমস্যার উপর নির্দিষ্ট মনোযোগ দিই এবং বিভিন্ন জাতিসত্তা, দলিত ও পশ্চাদপদ জাতিসমূহের এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ন্যায্য ক্ষোভগুলির মর্যাদা দিই, তেমনি আবার আন্দোলনের প্রান্তিকীকরণের তীব্র বিরোধিতা করি এবং ব্যাপক ভারতীয় জনগণের ও দেশ হিসাবে ভারতবর্ষের ঐক্যের জন্য কঠোর প্রচেষ্টা চালাই।

আমাদের পার্টি বিপ্লবী কৃষক সংগ্রামগুলি গড়ে তোলা এবং জমিদার ও কুলাকদের নিজস্ব সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের আক্রমণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার উপরই সর্বাধিক মনোযোগ দিয়ে থাকে। জনগণের বিপ্লবী চেতনার স্তরকে ক্রমাগত উন্নত করা, তৃণমূল স্তরে জনগণকে সমাবেশিত করা ও তাদের মধ্যে জঙ্গী মেজাজ গড়ে তোলা আমাদের পার্টির মূল লক্ষ্য, এবং এগুলিই সমস্ত ধরনের সুবিধাবাদী, সমাজগণতান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিষেধক।

আত্মনির্ভরতা ও একে অপরের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ভিত্তিতে ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আমাদের পার্টি, নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার নীতির উপর ভিত্তি করেই এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এবং একই সঙ্গে পারস্পরিক হস্তক্ষেপ-না-করার নীতি এবং ভারতীয় আধিপত্যের যে কোনো বহিঃপ্রকাশের বিরোধিতা করার আমাদের দায়বদ্ধতা ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়েছে।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে আমাদের পার্টির দুটি প্রতিনিধিদল ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে চীনে গিয়েছিল। ফিলিপাইনস এবং পেরুর কমিউনিস্ট পার্টি ও গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলির সঙ্গে আমরা কমরেডসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছি। বিদেশের বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারিত করার অনেক বেশি সম্ভাবনা এখন এসেছে। বিশ্বের সর্বত্র কমিউনিস্ট পার্টি ও বিপ্লবী গণআন্দোলনগুলির সঙ্গে উষ্ণ বন্ধুত্ব ও সংহতির বিকাশ ঘটানোর দিকে আমরা চেয়ে আছি।

আমরা অবশ্য স্বনির্ভরতার নীতিকে সবসময় তুলে ধরেছি এবং ভবিষ্যতেও তা তুলে ধরব। যে কোনো বিদেশী শক্তি অথবা বিদেশী অর্থপুষ্ট দেশীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নিতে আমরা ধারাবাহিক ও সচেতনভাবে অস্বীকার করেছি এবং ভবিষ্যতেও করব। কোনো পার্টি দ্বারা নির্দেশিত হতে আমরা অস্বীকার করি এবং আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা, নীতি ও কার্যপ্রণালী রচিত হয়েছে কেবলমাত্র ভারতীয় পরিস্থিতি সম্বন্ধে আমাদের নিজস্ব অধ্যয়নের ভিত্তিতে।

সিপিআই(এমএল) লিবারেশন : ভারতের বিপ্লবী কমিউনিস্ট ঐতিহ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকারী

সিপিআই(এমএল) লিবারেশনই হল সিপিআই(এমএল) গোষ্ঠীগুলির মধ্যে একমাত্র –

ক) যারা ১৯৭৪-এ পুনর্গঠনের পর থেকে ধারাবাহিকতা এবং ঐক্য বজায় রেখেছে।

খ) যাদের আসাম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণ উড়িষ্যা (কোরাপুট-গঞ্জাম অঞ্চল), উপকূলবর্তী অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, দক্ষিণ কেরালা, বাঙ্গালোর, বোম্বাই, ছত্তিশগড়, দিল্লী, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ ও বিহার সহ সর্বভারতীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা আছে।

গ) যারা নিয়মিত পার্টি কংগ্রেস এবং আঞ্চলিক ও জেলা স্তর পর্যন্ত সম্মেলনগুলি করে আসছে এবং বিভিন্ন স্তরে যথাযথভাবে নির্বাচিত কাঠামোর দ্বারা পরিচালিত হয়।

ঘ) যারা পার্টি কর্মীদের চেতনার স্তরকে উন্নত করার এবং বিভিন্ন পার্টি কাজ পরিচালনায় তাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণকে সুনিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত পার্টি শিক্ষা ও শুদ্ধিকরণ ও সংহতকরণ অভিযান চালিয়ে থাকে।

ঙ) যাদের কেন্দ্রীয় মুখপত্র ইংরাজী ও হিন্দিতে নিয়মিত প্রকাশিত হয় এবং তার সঙ্গে আছে আঞ্চলিক ভাষায় রাজ্য মুখপত্রগুলি, পার্টি পুস্তিকা এবং অন্যান্য পত্র-পত্রিকা প্রকাশনার ব্যবস্থা।

চ) যারা সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে সংসদীয় বিক্ষোভ পর্যন্ত সংগ্রামের সমস্ত রূপেরই অনুশীলন করে এবং গোপন থেকে ব্যাপকতর খোলা গণসংগঠন পর্যন্ত বিভিন্ন রূপের সাংগঠনগুলি পরিচালনা করে থাকে, সমস্ত ফ্রন্টে ও জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে গণকার্যকলাপ চালায় এবং বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যৌথ কার্যকলাপ চালায় এবং এক ক্রমবর্ধমান গণসংগ্রামের স্রোতে এগুলির সমন্বয় ঘটায়।

ছ) যারা কয়েকটি দেশের কমিউনিস্ট ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বমূলক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে।

এ সমস্ত কারণে আমার নিজেদের সাধারণভাবে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের এবং নির্দিষ্টভাবে সিপিআই(এমএল)-এর বিপ্লবী ধারার প্রকৃত উত্তরাধিকারী বলে এবং নিজেদের সিপিআই(এমএল)-এর প্রতিনিধিত্ব করার ও তার হয়ে কাজ করার একমাত্র পার্টি হিসবে দাবি করি।