[ সিপিএন(ইউএমএল)-এর পার্টি কংগ্রেসে প্রদত্ত ভাষণ (সংক্ষেপিত)। লিবারেশন, এপ্রিল ১৯৯৩ থেকে ]

গতকাল কংগ্রেসের এই মঞ্চ থেকে মার্কসবাদ ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রাসঙ্গিকতা সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলে যখন একটি দলিল উপস্থাপিত হচ্ছিল, অনেক প্রতিনিধিই তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। এই ধরনের বিজাতীয় ধ্যান-ধারণার প্রতি বিশেষত নেপালের তরুণ কমিউনিস্ট বন্ধুরা যে ক্রোধ ও ঘৃণা ব্যক্ত করেছেন তা আমাকে যথেষ্ট আলোড়িত করেছে।

আপনাদের কংগ্রেসের কোনো বিশেষ দলিল সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করছি না। সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনকেই ক্লিষ্ট করছে এমন এক প্রবণতার কথাই আমি বলছি। এ হল সেই বিলোপবাদী প্রবণতা যার বিরুদ্ধে আমাদের পার্টিকেও সাম্প্রতিক অতীতে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। আজ প্রতিটি কমিউনিস্ট পার্টিকেই এই বিলোপবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। অন্যান্য দলিলগুলির অনুধাবনে ঐ একই কমরেডরা যে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন তাও আমাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে। ধ্যানধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গির এই জীবন্ত আন্তঃক্রিয়া ছাড়া আমরা আমাদের শত্রুকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করতে পারব না, পারব না আমাদের মতাদর্শগত প্রতিপক্ষকে যোগ্য জবাব দিতে।

সমাজতন্ত্র অবশ্যই এক গুরুতর সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। কমরেডগণ, এই সংকটের গুরুত্বকে খাটো করে দেখা বা তাকে আমল না দেওয়া কোনো কাজের কথা নয়। মার্কসবাদের প্রতি আমাদের আস্থাকে শুধুমাত্র পুনর্ঘোষণা করে এবং মার্কসবাদ অপরাজেয় বিবৃতি দিয়ে কোনো উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না। মূল বিষয় হল বর্তমানের সমস্যাবলীর প্রতি মার্কসীয় উত্তর খোঁজা,  মূল বিষয় হল মার্কসবাদের বিপ্লবী আত্মার পুনরুদ্ধার। যাঁরা বলেন যে কিছু দেশে বর্তমানে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে বলেই কমিউনিজম সংকটে পড়েছে, তাঁদের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি না। কমিউনিজমকে যাঁরা দারিদ্রের দর্শন বলে বোঝেন তাঁরা নিজেদের দর্শনের দারিদ্র্যই প্রকাশ করেন। কমিউনিজম বস্তুত প্রাচুর্যের দর্শন। মানুষের প্রয়োজনের পরিপূর্ণ নিবৃত্তি সুনিশ্চিত করার জন্য বস্তুসামগ্রীর সুপ্রচুর লভ্যতা হল কমিউনিজমের পূর্বশর্ত।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিপ্লব আজকের দুনিয়ায় যে বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটিয়ে চলেছে তা কমিউনিজমের দিকে মানবজাতির অপ্রতিহত যাত্রার প্রয়োজনীয় বস্তুগত শর্তও সৃষ্টি করেছে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের বিকাশ দৈহিক শ্রম ও মানসিক শ্রমের মধ্যে ব্যবধান মুছে ফেলার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। প্রয়োজনীয় ভিত্তি প্রস্তুত হয়ে চলেছে, শুধু পুঁজিপতি ও সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে উৎপাদনের উপকরণগুলির নিয়ন্ত্রণকে আমাদের ছিনিয়ে নিতে হবে যাতে অপ্রতিহত ও অবিকৃতভাবে উৎপাদিকা শক্তিগুলির বিকাশ ঘটতে পারে।
আপনারা যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র আপনাদের কমিউনিস্ট পার্টিই তার নিজস্ব সরকার গঠনের মতো অবস্থায় পৌঁছেছে। আমরা যারা ভারতবর্ষ এবং এশিয়ায় বসবাস করি, আর শুধু এশিয়া কেন, পৃথিবীর কমিউনিস্ট আন্দোলনে আপনাদের দলের ওপর আমাদের সকলেরই আস্থা রয়েছে। ঐক্যবদ্ধভাবে ও সাহসের সঙ্গে আপনারা আপনাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবেন বলে আমরা আশা করি। আমরা আপনাদের চমৎকার সাফল্য কামনা করি। আপনাদের লাল সেলাম জানাই।

(ডিসেম্বর ১৯৯২-এর পঞ্চম পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট থেকে)

১। বিগত পাঁচ বছরে দুনিয়াজুড়ে যে ঘটনাপ্রবাহ বয়ে গিয়েছে তার তাৎপর্য প্রকৃতই বিশ্ব-ঐতিহাসিক। বিংশ শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের বিজয়ের যে আশা লেনিন দেখেছিলেন তার বিপরীতে ৭৫ বছরের তিক্ত সংগ্রামের পর আজ পুঁজিবাদী আপাতদৃষ্টিতে সমাজতন্ত্রের উপর বিজয় অর্জন করেছে।

পুঁজিবাদের এই আপাত বিজয়ে উৎফুল্ল বুর্জোয়া মতাদর্শের বিশিষ্ট প্রবক্তা ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা একটি “একক, সুসংবদ্ধ, বিবর্তনশীল প্রক্রিয়া” অর্থে ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করে দিয়েছেন। ফুকুয়ামার মতে “উদারনীতিবাদী পুঁজিবাদের থেকে উন্নত কোনো সামাজিক রূপের কথা আর ভাবা যায় না” এবং “এর পরেও সমাজে যে বৈষম্য থেকে যাবে তার মূলে থাকবে মানুষে মানুষে প্রতিভার স্বাভাবিক তারতম্য, অর্থনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম বিভাজন এবং সংস্কৃতি”।

পুঁজিবাদ ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ব্যবস্থাতেও উত্তেজনা থাকবে, ফুকুয়ামা আমাদের বলছেন, তা উদ্ভূত হবে শ্রেণীগত বিরোধের কারণে নয় ‘বরং অসমান মানুষকে সমান চোখে দেখার ও সমান স্বীকৃতি দেওয়ার যে প্রবণতা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের রয়েছে সেই প্রবণতা থেকেই’। এই অশান্তি কি আবার উদারনৈতিক গণতন্ত্রকে কোণঠাসা করে ফ্যাসিবাদকে ডেকে আনবে না যে ফ্যাসিবাদ অসমান জনগণের প্রতি অসম আচরণ করে থাকে? ফুকুয়ামা এ প্রশ্নে নীরব থাকলেও ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের সাথ সাথে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালীতে নাৎসীবাদ আবার স্পষ্টতই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যদিও এবার নিশানা বহিরাগত জনসমুদয়।

২। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ছিল একই সঙ্গে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধের সূচনা, পরবর্তীকালে যা দুই বৃহৎশক্তির মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসাবে সামনে এসেছে। দুই সামরিক জোট ন্যাটো ও ওয়ারশ প্যাক্ট ইউরোপের বুকে এমন এক মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয়েছিল যে তা লাগামহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং বিশাল পরিমাণে পারমাণবিক বোমা মজুত করে তুলেছিল যা দিয়ে সমগ্র মানব জাতিকে কয়েকবার ধ্বংস করে ফেলা যায়।

৩। সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতান্ত্রিক ব্লকের মধ্যেকার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সোভিয়েত নেতৃত্ব সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও কেন্দ্রাভিমুখ আরোপ করেছিল যা সমস্ত সমাজবাদী দেশ, কমিউনিস্ট পার্টি ও তৃতীয় বিশ্বের আন্দোলনকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পিছনে দাঁড়ানোরই দাবি করে। কিন্তু বাস্তব জীবনে, এটি সমাজতান্ত্রিক শিবিরে ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছিল। ১৯৬৮ সালে চেকোশ্লোভাকিয়ার উপর আক্রমণ এবং পরবর্তীকালে সীমাবদ্ধ সার্বভৌমত্বের ধারণার উদ্ভব কার্যত পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে সোভিয়েতের তাঁবেদারে পরিণত করেছিল।

৪। বৃহৎশক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুতই নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। চীনের সঙ্গে স্থায়ী উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়া, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে জাতীয় ভাবাবেগের বিরাগভাজন হয় পড়া, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সাথে সামরিক জোটে আবদ্ধ হওয়া ইত্যাদির পর শেষপর্যন্ত সে আফগানিস্তানে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে।

অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহু পূর্বেই তার স্পন্দন হারিয়ে ফেলেছিল এবং স্থবির হয়ে পড়েছিল। পচনের প্রক্রিয়া অনেক আগেই শুরু হলেও তা বৃহৎশক্তিসুলভ দম্ভের আড়ালে লুকানো ছিল। ঐ বুদবুদের বিস্ফোরণ অনিবার্যই ছিল। ১৯৮০ দশকের মধ্যভাগে সোভিয়েতের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার সাথে সাথে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির একের পর এক সোভিয়েত কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে এবং ফলত সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে থাকে। বৃহৎ শক্তিসুলভ অবস্থা টলমল হয়ে পড়ার পর কোনো বন্ধনই আর অবশিষ্ট থাকল না যা সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে।

৫। রোমানিয়া, যুগোশ্লাভিয়া ও আলবেনিয়াও, আগে অথবা পরে, নিজ নিজ পথে সোভিয়েত পতনকে অনুসরণ করল। ইউরো কমিউনিজমের তথাকথিত বাহ্যিক চেহারাটি পরিবর্তনের হাওয়ার প্রথম ধাক্কাতেই মুখ থুবড়ে পড়ল এবং তাদের সমাজতান্ত্রিক অন্তর্বস্তু উন্মোচিত হয়ে গেল। ইউরোপের প্রায় সমস্ত সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলি রাতারাতি ভোল পার্টে বিভিন্ন ধারার ও বিভিন্ন মাত্রার সমাজতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি প্রবাদের ডাইনোসোরের মতোই তার গতি হারিয়ে ফেলেছিল। পেরেস্ত্রৈকা ও গ্লাসনস্তের মধ্যে সে নিজের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন সৃষ্টি করে ফেলে।

৬। ঠাণ্ডা লড়াই পরবর্তী যুগে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে জার্মানি। পূর্ব জার্মানিকে পশ্চিম জার্মানির মধ্যে অঙ্গীভূত করে ফেলা হয়েছে এবং পূর্ব জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধান হোনেকার এখন বিচারের অপেক্ষায় জার্মানির কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। নতুন ‘ঐক্যবদ্ধ’ জার্মানি যুগোশ্লাভিয়ার ভাঙ্গনে প্ররোচনা সৃষ্টি করতে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। সংক্ষেপে বলা যায় যে যুদ্ধ পরবর্তী যুগে জার্মানির বিরুদ্ধে যেসব নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়েছিল তা ভেঙ্গে পড়েছে এবং ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ের কাঠামোর ভেতর ও বাইরে জার্মানির আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বেড়েই চলেছে।

৭। ১৯৮০-র দশকে জাপান এক অর্থনৈতিক অতিবৃহৎ শক্তি হিসাবে নিজেকে সংহত করেছে এবং এই দিক থেকে তার স্থান কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। এই অর্থনৈতিক বলে বলীয়ান হয়ে জাপান আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করতে সচেষ্ট হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যের আসন পাওয়ার লক্ষ্যে নিরাপত্তা পরিষদের পুনর্বিন্যাসের জন্য ওকালতি করা এবং রাষ্ট্রসংঘের এক শান্তি উদ্যোগে সামিল হয়ে দেশের সীমানার বাইরে কাম্পুচিয়ায় সৈন্যবাহিনী পাঠানোর উদ্দেশ্যে সংবিধান সংশোধন করা – অন্যান্য বিষয় ছাড়াও এগুলি স্পষ্টভাবেই ঐ উদ্দেশ্যকে প্রতীয়মান করছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি এবং তার সঙ্গে মার্কিন ছত্রছায়া দুর্বল হয়ে পড়ায় জাপান সামরিকীকরণের এক উচ্চাকাঙ্খী কর্মসূচিতে নেমে পড়েছে। তার সামরিক বাজেট এখন পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম।

৮। জাপানের পাশাপাশি ‘এশীয় শার্দুলেরাও’ অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ান দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যাণ্ড ও ইন্দোনেশিয়াও তাদের থেকে এখন খুব একটা পিছিয়ে নেই। একসাথে বিশ্ব বাণিজ্যের দশ শতাংই হয় তাদের মাধ্যমে। আমেরিকা ও ব্রিটেনের পড়ন্ত অর্থনীতির তুলনায় এশিয়াকে ৯০-এর দশকের অতিবৃহৎ বাজার হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে।

৯। বিশ্ব অর্থনীতির নতুন শক্তিকেন্দ্র হিসাবে চীন আত্মপ্রকাশ করেছে যার বার্ষিক বৃদ্ধির হার ৯০-এর দশকে জাপান ও কোরিয়াকে অতিক্রম করে যাবে বলে আশা করা যায়। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তিতে চীনও উন্নয়নশীল বিশ্বের অংশ হিসাবে বিশ্ব রাজনীতিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ১০০০ মেগাটনের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা, পর্যবেক্ষক হিসাবে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগ দেওয়া, জাপানী অগ্রগতিকে মাথায় রেখে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং খুব সম্প্রতি মার্কিন আপত্তি অগ্রাহ্য করে পারমাণবিক রি-এ্যাক্টর বিক্রি করার জন্য ইরানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া – এগুলি সাম্প্রতিক সময়ে চীনের কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

১০। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের মতাদর্শগত বিজয়ী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার বিশ্ব আধিপত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে গদগদভাবে ‘নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার’ ওকালতির মধ্য দিয়ে। ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ নির্দিষ্টভাবে এই ইঙ্গিতই বহন করে। ইরাকের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক মার্কিন কার্যকলাপ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করছে যে রাষ্ট্রপুঞ্জের নির্দেশে কুয়েতকে মুক্ত করার অজুহাত ছিল আসলে তার প্রকৃত মতলবকে আড়াল করার কৌশলমাত্র। অবশ্য, আমেরিকার আধিপত্য বিভিন্ন শিবির থেকে বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছে এবং তার দুরাকাঙ্খা যাইই হোক না কেন বাস্তব জীবনে সে এক পতনোম্মুখ বৃহৎশক্তি মাত্র।

১১। সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগ হিসাবেই বর্তমান যুগকে আজ সবচেয়ে ভালোভাবে চরিত্রায়িত করা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন এবং সোভিয়েত শিবিরের অবলুপ্তির পর সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী দেশগুলির দ্বন্দ্ব আজ আর আলাদা করে বিশ্বের একটি বড় দ্বন্দ্ব হিসাবে থাকছে না। অন্যদিকে, সাম্রাজ্যবাদ ও তৃতীয় বিশ্বের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব কিন্তু ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের ওপর সোভিয়েত আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা যেমন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যে বিভাজনই ডেকে এনেছিল তেমনি সাম্রাজ্যবাদ বনাম তৃতীয় বিশ্বের দ্বন্দ্বকে সমাজতন্ত্র বনাম সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্বের অধীনস্থ করে রাখার চেষ্টাও কেবলমাত্র তৃতীয় বিশ্বকে বিভক্তই করেছিল, যার ফলস্বরূপ তৃতীয় বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকা দুর্বল ও বিকৃতই হয়ে পড়ে। আজ যখন সোভিয়েত প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে তৃতীয় বিশ্বকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে, তখন তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে এক ঐক্য ও সংকল্পও দেখা যাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের মধ্যকার সোভিয়েত ঘেঁষা দেশগুলির দরকষাকষির ক্ষমতা নিশ্চয়ই মার খেয়েছে, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে তারাও দ্রুতই নিজেদের সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস ও হৃত শক্তির পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে চলেছে। তাছাড়া আজকের অবশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি তৃতীয় বিশ্বেরই প্রতিনিধিত্ব করে এবং প্রধানত সেই সামর্থের ওপর দাঁড়িয়েই তারা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। বর্তমান ঐতিহাসিক যুগে, সাম্রাজ্যবাদ ও তৃতীয় বিশ্বের মধ্যকার দ্বন্দ্বই তাই প্রধান দ্বন্দ্ব হিসাবে থাকছে।

 

(লিবারেশন, অক্টোবর ১৯৯১ থেকে)

ইউরোপে কমিউনিজমের শেষ দুর্গটিরও পতন ঘটেছে। ক্যু বা ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একে রক্ষা করার শেষ মরিয়া প্রয়াস করাল ভবিষ্যতকে ত্বরান্বিত করেছে মাত্র।

একদা কমিউনিজমের ভূত ইউরোপকে তাড়া করে বেড়াত, আর আজ ইউরোপের ভূত সর্বত্র কমিউনিজমকে তাড়া করছে। ইউরোপে কমিউনিজমের মৃত্যু কি এশিয়ায় কমিউনিজমের ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করবে? চীন কতদিন পুঁজিবাদের আগ্রাসনকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে? ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এর কেমন প্রভাব পড়বে? এই ধরনের নানা প্রশ্ন আমাদের দেশের কমিউনিস্টদের ও মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবীদের মন তোলপাড় করছে এবং জনগণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘটনাবলী থেকে শুরু করা যাক। সফল সর্বহারা বিপ্লবের প্রথম দেশ, মহান লেনিনের দেশে সমাজতন্ত্র যে ধাক্কা খেয়েছে তা সমস্ত কমিউনিস্টদের কাছেই অত্যন্ত হৃদয়-বিদারক ঘটনা। দুর্বল চিত্তের কমিউনিস্টদের ক্ষেত্রে তা হতাশা, এমনকি পার্টি ছেড়ে দেওয়ার কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। কিন্তু মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের কাছে তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শ্রেণী সংগ্রাম অর্থাৎ সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যে সংগ্রামের অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী চরিত্রকেই প্রকট করেছে মাত্র।

মার্কিনী চক্রান্ত বা গর্বাচভ ও ইয়েলেৎসিনের মতো কয়েকজন ব্যক্তির ওপর দোষারোপ করে লাভ নেই। মূল বিষয় হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুঁজিবাদ যেখানে তার ধাক্কা সামলিয়ে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে পেরেছে, সমাজন্ত্র সেখানে অগ্রগতির একটা পর্যায়ের পর দুনিয়াকে আর কিছুই দিতে পারেনি। ক্রমে ক্রমে সে পরিণত হয় এক অচলায়তনে। শ্রমিকশ্রেণী সহ সমস্ত স্তরের জনগণই তা প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেন। সমাজতান্ত্রিক শৃঙ্খল প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ে এবং যেখানে তার বিকৃতি সর্বাধিক অর্থাৎ প্রথমে পূর্ব ইউরোপে ও পরে সোভিয়েত রাশিয়ায় তা ভেঙ্গে পড়ে।

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করার জন্য ব্যাপক পারমাণবিক অস্ত্র-ভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়েছিল। সামরিক দিক থেকে মার্কিনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া এমনকি তাকে টপকে যাওয়াই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে পড়ে। আর এই প্রক্রিয়াতেই ঘটে এক বিচিত্র ঘটনা – সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদের ওপর আধিপত্যবাদী অতিবৃহৎ শক্তির আবির্ভাব। ইতিহাসের কী পরিহাস, আঘাত যখন এল, একটি গুলিও ছুটল না, আর সোভিয়েত ইউনিয়নে পালাবদলের পালা ‘শান্তিপূর্ণ পথে বিবর্তনের’ এক চিরায়ত দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্র এই দুই ব্যবস্থার মধ্যেকার বুনিয়াদী দ্বন্দ্বকে যান্ত্রিকভাবে দুই শিবিরের মধ্যে প্রধান দ্বন্দ্ব হিসাবে চালিয়ে দেওয়ার ফলে গড়ে ওঠে সর্বোচ্চ নেতা, বৃহত্তম পার্টি ও অতিবৃহৎ শক্তির ব্যাপারটি। নিঃসন্দেহে এসবের সূচনা হয়েছিল স্তালিনের আমলেই। এই সমস্ত অদ্ভুত অবাস্তব ধারণার স্বাভাবিক অনুসঙ্গ হিসাবে সমাজতান্ত্রিক শিবিরে বিভাজন দেখা দেয়, কেননা মাও ঐ তত্ত্বকে মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং চীন সোভিয়েত আধিপত্যের কাছে নতিস্বীকার করতে রাজি হয় না। সোভিয়েত অর্থনীতির সামরিকীকরণ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ফাঁক সৃষ্টি করে আর জনগণকে পরিবেশন করা হতে থাকে কেবল ভূয়ো পরিসংখ্যান। সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রকে বিসর্জন দেওয়া হয়, শুরু হয় সবরকম মতান্তর বা বিক্ষোভকে দাবিয়ে রাখার যুগ। সেই সঙ্গে চলতে থাকে ‘কমিউনিজনের প্রথম ধাপ’, ‘বিকশিত সমাজতন্ত্র’-এর মায়াজালে জনগণকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখার চেষ্টা। এক অতি বৃহৎ শক্তিসুলভ মনোভাব মাথা চাড়া দেয়, যা পুরোনো যুগের রুশ জাতীয়তাবাদের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। এসবের আড়ালে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন, দুর্নীতিপরায়ন ও অধঃপতিত একটি কমিউনিস্ট পার্টি তথা শাসনযন্ত্র।

সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদে দীর্ঘদিন ধরে এই অতিবৃহৎ শক্তিসুলভ কাঠামো টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না, আর তাই আশির দশকের মধ্যভাগে সোভিয়েত দেশের পরিস্থিতি এক আগ্নেয়গিরির মতো হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য গর্বাচভ শুরু করেন তাঁর সংস্কারের কার্যক্রম। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। তাঁর পেরেস্ত্রৈকা ও গ্লাসনস্ত পূর্ব ইউরোপে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন নিয়ে আসে, সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে জাতিগুলির নিজস্ব আশা-আকাঙ্খা বাড়িয়ে তোলে, বিকাশ ঘটায় বেশ কিছু নতুন সামাজিক শক্তির এবং পুঁজিবাদের পুরোপুরি পুনঃপ্রবর্তনের দাবি নিয়ে ইয়েলেৎসিনের নেতৃত্বে এক নতুন মেরু গড়ে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর বেশ ভালো সুযোগ পশ্চিমী শক্তিগুলি পেয়ে যায়। তাঁর নিজেরই উস্কে দেওয়া শক্তিগুলিকে বাগে আনার জন্য গর্বাচভের সমস্ত প্রচেষ্টাই বিফল হয় এবং সমন্বয়মূলক ভারসাম্য নিয়ে আসার দুরাশায় তিনি একের পর এক অবস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন। সমাজের অর্থনৈতিক পুনর্জীবন সুদূরপরাহত থেকে যায়। সাহায্যের জন্য পশ্চিমী শক্তিগুলির কাছে তাঁকে কার্যত ভিক্ষা চাইতে হয় এবং বিনিময়ে তিনি তাদের একের পর এক রাজনৈতিক ছাড় দিতে থাকেন। ফলস্বরূপ তাঁর নিজের অবস্থান দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয় এবং ইয়েলেৎসিনের অবস্থান সুদৃঢ় হতে থাকে। নানান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তন কমিউনিস্ট পার্টিকে গুরুত্বহীন করে তোলে। পুরোনো কাঠামোর কমিউনিস্ট পার্টি বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে বেমানান হয়ে পড়ে। গর্বাচভ একটি সমাজগণতান্ত্রিক পার্টির ধারণা হাজির করেন এবং একটি নতুন ইউনিয়ন চুক্তির প্রস্তাবও রাখেন।

এই সন্ধিক্ষণে ঘটল সেই বহু-নিন্দিত ক্যু। আমাদের হাতে এমন সমস্ত তথ্য নেই যা দিয়ে আমরা বিচার করতে পারি প্রকৃত কোন ঘটনা অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দকে ঐ পন্থা অবলম্বনে প্ররোচিত করেছিল এবং পর্দার আড়ালেই বা কী কী ঘটে চলেছিল।

কিন্তু তাঁদের কট্টরপন্থী বা রক্ষণশীল হিসাবে অভিহিত করা ঠিক নয়। তাঁরা সকলেই গর্বাচভের নিজস্ব পছন্দের লোক – গর্বাচভের সংস্কারের ফসল তথা প্রধান অবলম্বন। গোটা মন্ত্রীসভাই যখন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে প্রতিভাত হচ্ছে, তখন এর অধিকতর যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা এটাই হতে পারে যে আসলে গর্বাচভই তাঁর ওপর ন্যস্ত বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারেননি। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এসে তিনি থেমে যাবেন এবং আরও অধঃপতন রোখার জন্য স্ব-অর্জিত জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করবেন বলেই মন্ত্রীসভার প্রত্যাশা ছিল। তাঁরা মনে করলেন সেই সময় এসে গেছে। কিন্তু নিজের জালে আটকে গর্বাচভ তাঁদের মতে সায় দিতে অস্বীকার করে বসলেন। সম্পর্কের আকস্মিক এই ছেদ ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা কব্জা করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প খোলা রাখল না। ব্যর্থ হওয়াই ছিল এই ক্যু-এর নিয়তি, কেননা পেরেস্ত্রৈকা-পন্থী শক্তিগুলির নেতা তখনও গর্বাচভই। আর অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দ প্রথম থেকেই এক দোদুল্যমান ও ঢিলেঢালা গ্রুপ হিসাবে থেকেছেন। ইয়েলেৎসিন এই ফাটলটি বুঝতে পেরে সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ক্যু ব্যর্থ হয় এবং জনতা নতুন নায়ক ইয়েলেৎসিনের দিকে চলে যান। ভগ্ন-হৃদয় গর্বাচভ ফিরে এসে দেখলেন তাঁর সামাজিক ভিত্তি দ্রুত সরে যাচ্ছে। ইয়েলেৎসিনকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছেড়ে দিতে তিনি বাধ্য হলেন। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় ভাঙ্গন ত্বরান্বিত হল এবং তিনটি বাল্টিক প্রজাতন্ত্র প্রকৃত অর্থেই সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ইয়েলেৎসিন কমিউনিস্ট পার্টি বিরোধী জিগির চাগিয়ে তুললেন। কয়েকদিন মূলত ইয়েলেৎসিনের হুকুমে চলার পর গর্বাচভ ইয়েলেৎসিনের সাপেক্ষে তাঁর অবস্থান দৃঢ় করার পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টিকে ভেঙ্গে দেওয়ার পদক্ষেপ আসলে তাঁর মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি সমাজগণতন্ত্রী পার্টি গড়ার (এখন অবশ্য কিছুটা ঘুর পথে) প্রস্তুতি ছাড়া আর কিছু নয়। এটা নিশ্চিত যে, কমিউনিস্ট পার্টির এক বড় অংশ গর্বাচভের পরিকল্পনায় নিজেদের রূপান্তরিত করে নেবেন। আগামী দিনগুলিতে সোভিয়েত সমাজের প্রতিনিধিত্বমূলক দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যে সহযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কীভাবে এগোয়, তা সত্যিই এক দেখার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

আমরা জানি না সোভিয়েত রাশিয়ার মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা কেমনভাবে নিজেদের সংগঠিত করবেন। আমরা এও জানি না যে, ‘কট্টরপন্থী’ ও ‘রক্ষণশীলদের’ প্রতিক্রিয়াই বা কী হবে এবং কোন কোন নাটকীয় ঘটনাবলী এখনও অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু এটা বলাই যায় যে, নভেম্বর বিপ্লবের দ্বিতীয় সংস্করণের জন্য আমাদের দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হবে।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ‘কমিউনিস্ট’ আন্দোলনের কেন্দ্র ফ্রান্স-জার্মানি-রাশিয়া হয়ে এখন সরে এসেছে চীনে। আর অন্য যে দেশটির দিকে এখন সবাই সাগ্রহে তাকিয়ে থাকবে তা অবশ্যই ভারতবর্ষ।

এবার বিতর্কের কথায় আসা যাক। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ২৮তম কংগ্রেসের যে ইতিবাচক মূল্যায়ন আমরা করেছি, তার উল্লেখ করে সিপিআই(এম)-এর তাত্ত্বিক নেতা প্রকাশ কারাত[] আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে যে, আমরা আমাদের আগেকার পুরোদস্তুর সোভিয়েত বিরোধী অবস্থান থেকে আপাদমস্তক গর্বাচভ-পন্থী হয়ে পড়েছি। একেবারে প্রথম থেকেই গর্বাচভকে সমালোচনা করার কৃতিত্ব তাঁরা দাবি করেন। বাস্তব ঘটনা কী বলে দেখা যাক। আন্তর্জাতিক মহাবিতর্কে আমরা দৃঢ়ভাবেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থানকে সমর্থন করি এবং ক্রুশ্চেভের তত্ত্বের সমালোচনা করি। ‘সম-দূরত্বের তত্ত্বে’ আমাদের কোনোদিনই আস্থা ছিল না; মাও ও চীনের পক্ষেই আমরা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াই। মাও চিন্তাধারাকেই আমরা নিজেদের পথনির্দেশিকা বলে গ্রহণ করেছিলাম – যে চিন্তাধারা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতৃত্বকারী পার্টির তত্ত্বের বিরোধিতা করেছিল, তৃতীয় বিশ্ব ও সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্বকে আজকের দুনিয়ার প্রধান দ্বন্দ্ব বলে অভিহিত করেছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের অতিবৃহৎ শক্তিসুলভ আধিপত্যকারী অবস্থানের বিরোধিতা করেছিল। স্তালিনের অধিবিদ্যার পরিবর্তে মাও-এর দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই আমরা দার্শনিক পথপ্রদর্শক হিসাবে গ্রহণ করি এবং এটাই আমাদের সমাজতান্ত্রিক সমাজের অভ্যন্তরে শ্রেণী সংগ্রামের অস্তিত্ব ও পুঁজিবাদের পুনরুত্থানের বিপদকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। ভুল আমাদের অবশ্যই হয়েছে, কখনও কখনও আমরা চরম সীমাতেও চলে গিয়েছি। কিন্তু আমাদের মূল প্রেক্ষিত কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে সিপিআই(এম) মাও-এর দার্শনিক চিন্তাকে বিদ্রুপ করেছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের অতিবৃহৎ শক্তিসুলভ অবস্থানকে অভিনন্দিত করেছে এবং চেকোশ্লোভাকিয়া, আফগানিস্তান ও কাম্পুচিয়ায় আগ্রাসনকে সর্বান্তকরণে সমর্থন জানিয়েছে। কয়েকটি ভুলের সঠিক সমালোচনা সত্ত্বেও সিপিআই(এম)-এর মূল প্রেক্ষিত মনগড়া বলেই প্রমাণিত হয়েছে।

১৯৮৭-র ডিসেম্বরে আমাদের চতুর্থ কংগ্রেসের দলিলে আমরাই প্রথম গর্বাচভের ২ নভেম্বর ভাষণের কড়া সমালোচনা করি। অনেক পরে মক্সো থেকে ফিরে তবেই সিপিআই(এম) মুখ খোলে। সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে গর্বাচভের ধারণাকে আমরা সর্বদাই তীব্র সমালোচনা করেছি। শ্রেণী সংগ্রাম ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে গর্বাচভের ধারণা লক্ষ্য করে আমরা তাঁকে ক্রুশ্চেভের আধুনিক সংস্করণ বলেই অভিহিত করেছি। আমরা স্বাগত জানিয়েছিলাম কেবল সোভিয়েত রাশিয়ার অতিবৃহৎ শক্তিসুলভ অবস্থান ভেঙ্গে ফেলা এবং চরম স্বৈরতান্ত্রিক একটি ব্যবস্থার মধ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কারের সূচনা করার মতো পদক্ষেপগুলিকে। ব্রেজনেভীয় সমাজতান্ত্রিক মডেলের প্রতি সিপিআই(এম)-এর এখনও যদি কোনো মোহ থেকে থাকে, তবে তাদের ভোলা উচিত নয় যে ঐ মডেল তার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল, ফলে তার পতনও ছিল অনিবার্য। গর্বাচভ ইতিহাসের অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছেন মাত্র। ঐ ব্রেজনেভীয় জমানাই যে ভারতে জরুরি অবস্থা ও ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে সমর্থন জানিয়েছিল – একথাও কারোর বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। ২৮তম কংগ্রেসে কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে শক্তিগুলির ভারসাম্য বাস্তবে যেমন অবস্থায় ছিল সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ইয়েলেৎসিনের বিরুদ্ধে গর্বাচভকে সমর্থন জানিয়েছিলাম মাত্র, তার বেশি কিছু নয়। আমরা জানতাম যে আজকের রাশিয়ায় আমাদের কল্পনার ঘাঁটি বিপ্লবী কমিউনিস্টদের অন্বেষণে স্রেফ মনোগতবাদ ছাড়া কিছুই নয়। ঐ অন্বেষণে সিপিআই(এম)-কে লিগাচেভ ও তার দলবলের ওপর আস্থা স্থাপনের দিকে নিয়ে যায়। আর লিগাচেভদের আসল ওজন যে কত তা ২৮তম কংগ্রেসেই উদ্ঘাটিত হয়ে গেছে।

আমরা যে ক্যু সমর্থন করিনি তার কারণ হল – আমাদের মনে এটা হয়তো বেশি খুশির ব্যাপার হতে পারে, কিন্তু সোভিয়েত রাশিয়ার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এর প্রতি বিন্দুমাত্র জনসমর্থনও জোটেনি। সোভিয়েত রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপ নিয়ে যদি আমরা হৈ চৈ না করি, সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির মৃত্যুতে আমাদের যদি কান্না না আসে তবে তার কারণ হল সে দেশের ভিতর থেকে এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে না। সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন আমরা দেখি, কিন্তু সামাজিক ব্যবস্থা হিসাবে কোনো দেশের জনগণের উপর এটা চাপিয়ে দেওয়া যায় না। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ৭৪ বছরের অভিজ্ঞতার পর সোভিয়েত জনগণ আজ যদি তা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবে সৈন্যবাহিনী, কেজিবি ও সামরিক আইনের মাধ্যমে তা চাপিয়ে দেওয়ার ওকালতি আমরা করি কী করে? ধ্বস রুখবার যথেষ্ট সময় যখন ছিল তখন কিছু করা হয়নি, আর যে কোনো সমালোচনাকেই সোভিয়েত নেতৃত্ব ও ভারতে তাদের অনুগামীরা সিআইএ-এর দালাল বলে ছাপ মেরে দিয়েছে। আজকের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মন্দের ভালোকেই আমাদের বেছে নিতে হবে এবং ঘটনাধারার যে অনুকূল মোড়ে কমিউনিস্টরা আবার উদ্যোগ ছিনিয়ে নিতে সমর্থ হবেন, সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। একমাত্র এটাই হতে পারে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। বাকি আর সবই হল প্রলাপ, নৈরাশ্যজনিত অরণ্যে রোদন।

অনেক দিক দিয়েই চীন সোভিয়েত ইউনিয়নের থেকে স্বতন্ত্র, আর এর মূল বিশেষভাবে রয়েছে মাও-এর শক্তিশালী উত্তরাধিকার। সমাজতন্ত্র (অবশ্যই প্রাথমিক স্তরে) সেখানে টিকে আছে এবং তিয়েন-আন-মেনের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ও কিছু কিছু বিকৃতি সত্ত্বেও সমাজতন্ত্রের পিছনে জনসমর্থনও রয়েছে। চীনের স্বর্ণোজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরে সমাজতন্ত্রের ওপর জনগণের আস্থা অটুট রাখার চেষ্টা করা ঠিক নয় যদিও সিপিআই(এম) ঠিক তাই-ই করতে চলেছে বলে মনে হয়। এটা যে শুধু তথ্যগত দিক থেকেই ভুল তা নয়, শেষ পর্যন্ত এর ফলে হিতে বিপরীতই হতে পারে। জনগণের কাছে আমাদের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে হবে এবং সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যে তীক্ষ্ণ আঁকাবাঁকা পথের সংগ্রাম সম্পর্কে তাঁদের শিক্ষিত করতে হবে।

সিপিআই(এমএল) যখন তার যাত্রা শুরু করে, তার উপলব্ধিতে কেবল চীন ও ক্ষুদ্র আলবেনিয়াই ছিল সমাজতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু এজন্য আমরা ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করতে বিন্দুমাত্র হতোদ্যম হইনি। আমাদের দেশে পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামই যেহেতু মূল বিষয়, তাই কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এখানে উজ্জ্বল – অবশ্যই উজ্জ্বল। উদ্বেগ যেটুকু আছে তা হল পশ্চিমবাংলার বামফ্রন্ট সরকারকে নিয়ে, যার অপকর্মের সুযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলরা কমিউনিস্ট বিরোধী জিগির চাগিয়ে তোলার চেষ্টা করবে। আমরা আশা করি, সিপিআই(এম) নেতৃত্ব সমালোচনা সম্পর্কে আরও সহনশীল হবেন, নিজেদের ভুলগুলি শুধরে নেবেন এবং মার্কসবাদকে রক্ষা করতে ও গণসংগ্রামের ময়দানে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সঙ্গে হাত মেলাবেন।

টীকা

(১) ‘দি মার্কসিস্ট’ পত্রিকার অক্টোবর-ডিসেম্বর, ১৯৯০ সংখ্যায় প্রকাশ কারাতের “সিপিআই(এমএল)/আইপিএফ – বাম ভূমিকার অন্বেষণে”

(লিবারেশন, এপ্রিল ১০০১ থেকে)

‘যুদ্ধের রাজনীতি’ নিবন্ধে আমি উল্লেখ করেছিলাম যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ বর্তমান বিশ্বের জোটগুলি ও তার দ্বন্দ্বগুলিকে প্রতিবিম্বিত করে। একইসঙ্গে তা শক্তিগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তনেরও মাধ্যম।

বিগত কয়েক বছর ধরেই সোভিয়েত রাশিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের প্রক্রিয়ায় তার অতিবৃহৎ শক্তির অবস্থান থেকে স্পষ্টতই পিছু হটেছে – আর এই পিছু হটাকে পরিহাসছলে (euphemistically) শান্তি অভিযান নামেই ভূষিত করা হচ্ছে। এছাড়াও, সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে সোভিয়েতের তত্ত্ব এবং পাশ্চাত্য দুনিয়ার সঙ্গে যে নিবিড় যোগাযোগ সে গড়ে তুলছে তা সোভিয়েত রাশিয়াকে স্পষ্টতই তৃতীয় বিশ্বের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সমস্ত ব্যবহারিক দিক থেকে, একেবারে গোড়া থেকেই পশ্চিম এশিয়ার ক্ষেত্রে মার্কিনী পরিকল্পনার এক অধস্তনকারী ভূমিকা ইচ্ছাকৃতভাবেই পালন করে এসেছে সোভিয়েত রাশিয়া। তত্ত্বগতভাবে আমরা এই সবকিছুই জানতাম আর তা সামনাসামনি খোলাখুলি রেখেছিলাম। একেবারে শেষ পর্যায়ে শান্তির এক প্রস্তাব সামনে হাজির করানোর সোভিয়েতের প্রচেষ্টা ইরাকের আত্মসমর্পণের রাস্তা প্রস্তুত করানো ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যুদ্ধোত্তর পশ্চিম এশিয়ায় নিজের একটু জায়গা করে নেওয়ার এক দুর্বল প্রচেষ্টাই তার মধ্যে নিহিত ছিল। মার্কিনীরা সোভিয়েত নপুংসকতার সারাংশ সম্পর্কে ওয়াকিবহালই ছিল। তাই তারা তা প্রত্যাখ্যান করে।

কেবল এক খণ্ডিত সংস্করণ নিয়ে সোভিয়েত তার প্রত্যুত্তর দিতে চেয়েছিল। সেটি পুনরায় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তারা মার্কিনের অনুসরণকারী হয়ে পড়ে। আমি সেই দিনই নিবন্ধটি লিখেছিলাম যেদিন সোভিয়েতের প্রস্তাব এসেছিল। আর আমি জানতাম সেটিই ছিল সাদ্দামের প্রতিরোধের পরিসমাপ্তি। সে কারণে, ইরাকের আরেকটি ভিয়েতনামে পরিণত হওয়ার আগেকার গুরুত্বের বদলে আমি সাদ্দামের সম্ভাব্য পরায়জের উল্লেখ করে যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে শক্তিগুলির সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাসের এক ছবি দিয়ে লেখা শেষ করি। সোভিয়েতের ভূমিকা নিয়ে আমার কখনই কোনো মোহ ছিল না। ইতিমধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়ন তার গৃহীত অবস্থানের যুক্তিসঙ্গত পরিণতির দিকে স্খলিত হয়েছে। এ সম্পর্কে অনেক আগে থেকেই আমাদের মূল্যায়ন থাকা সত্ত্বেও আমাদের কমরেডরা পরিবর্তিত সোভিয়েতের ভূমিকা সম্পর্কে নিজেদের মানসিকভাবে ধাতস্থ করতে পারেননি। যুদ্ধ কেবলমাত্র আসল সোভিয়েতকে বেআব্রু করেছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে এক নতুন ধরনের উদ্বেগ দৃষ্টিগোচর হয়েছে। আর আমি আমার নিবন্ধে লিখেছিলাম যে আমেরিকার সঙ্গে শান্তির পর্যায়ে ক্রমে ক্রমেই উভয়ের মধ্যে উত্তপ্ত সম্পর্কের দিকেই নিয়ে যেতে পারে। তারা প্রচুর আশা পোষণ করত বলেই সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি অত্যধিক সমালোচনায় মুখর হওয়া সিপিআই, সিপিআই(এম)-এর সাজে। আমাদের বরং লক্ষ্য রাখা উচিত, আমেরিকার সঙ্গে তার সম্পর্কের সাপেক্ষে পরিস্থিতি নতুন কোনো মোড় নেয় কিনা।

চীন সম্পর্কে বলা যায় যে, বর্তমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এক সমাজতান্ত্রিক দেশের কাছ থেকে বিশেষ ধরনের ভূমিকা প্রত্যাশা করা অলীক আকাঙ্খা ছাড়া আর কিছুই নয়। বেশ কিছুদিন যাবত চীন এটাই বোঝাতে চেয়েছে যে সোভিয়েত রাশিয়াকে প্রতিস্থাপিত করার মতো কোনো ভূমিকা নিতে আদৌ আগ্রহী নয়। যদিও তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসাবে চীন অবশ্যই সোভিয়েত রাশিয়া থেকে নিজের ফারাক টেনেছে এবং ভোটদানে বিরত থেকেছে (রাষ্ট্রসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে – সম্পাদক)। আর এইভাবেই চীন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সপক্ষে থেকেছে। আর্থিক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে চীন পাশ্চাত্য দুনিয়ার সঙ্গে বহুমুখী সম্পর্কের বিকাশ ঘটিয়েছে। আর তিয়েন-আন-মেন ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাপেক্ষে পশ্চিমী দুনিয়ার মুখোমুখি হয়ে তার আক্রমণাত্মক অবস্থান খুইয়েছে। পারস্পরিক অবিশ্বাসের সম্পর্কগুলিকে স্বাভাবিক করে নেওয়াই তার কাছে জোর দেওয়ার বিষয়। বিগত বছরগুলিতে চীন যে অবস্থায় জড়িয়ে পড়েছিল সেখান থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে খুব বেশি বিপ্লবী অবস্থান নেওয়া তার পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। এ কারণেই আমি বলেছিলাম য়ে এই যুদ্ধ বিভিন্ন দেশগুলির মধ্যেকার প্রকৃত বিদ্যমান সম্পর্কগুলিকেই কেবলমাত্র উন্মোচিত করে দিল। আমরা এ সবকিছুই তত্ত্বগতভাবে জানি। কিন্তু নাছোড়বান্দার মতো পুরোনো মোহ পিছু ছাড়ে না। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে যখন তা প্রমাণিত হয় তখন আমরা থমকে যাই এবং আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আত্মতৃপ্তি খোঁজার চেষ্টা করি। আমার মতে মোদ্দা কথা হল সম্পর্কগুলির পরিবর্তিত বিন্যাসের ওপরই আমাদের নজর রাখতে হবে। কারণ আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে চীনারা এবং একইভাবে অনেক দেশই মার্কিনের নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার বিপদ সম্পর্কে খুবই উদ্বিগ্ন। আর এই যুদ্ধ সর্বত্রই পুনরায় চিন্তা ভাবনা করার এক জোয়ার সৃষ্টি করেছে। নতুন সম্পর্কগুলি দানা বাঁধতে এখনও কিছুদিন সময় নেবে।

চীন বা রাশিয়া সম্পর্কে নিজের মতো করে সমালোচনামুখর যদি কেউ হতে চান, আপত্তি নেই। কারণ তা আমাদের পার্টি লাইনের পরিপন্থী নয়। এমনকি কিছু কমরেড যদি চীনা দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন তবে তাতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এক আবেগবর্জিত মূল্যায়নেরই পক্ষে থাকতে চাই কারণ বিশ্ব ইতিহাসের ঘটনাক্রম পরিমাপ করা হয়ে থাকে বছরের হিসাবে নয় দশকের নিরিখেই।

(লিবারেশন, এপ্রিল ১৯৯১ থেকে)

‘যুদ্ধ আর কিছুই নয়, তা হল অন্য উপায়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা’
– কার্ল ফন ক্লজবীৎস

ঠাণ্ডা যুদ্ধের পর, ফুকুয়ামা যখন ‘ইতিহাসের পরিসমাপ্তি’ ঘোষণা করছিলেন, তখন তিনি বোধহয় স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে, ইতিহাস এত তাড়াতাড়ি আবার যাত্রা শুরু করবে।

প্রায় এক মাস হল উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হয়েছে। জর্জ বুশ মনে করছেন যে এটিই হল শেষ যুদ্ধ যার পরিসমাপ্তির পর নতুন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। সাদ্দাম হুসেনের কাছে এটিই হল সব যুদ্ধের জননী, যার পরিণতিতে আরব দুনিয়া পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে এবং মুক্ত হবে প্যালেস্তাইন। ঠিক কী হবে তা এখনও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না, তবে এই যুদ্ধের অভিপ্রায় যে নিছক কুয়েতের মুক্তি নয় তা হলফ করেই বলা যায়। এই যুদ্ধ হচ্ছে বর্তমান দুনিয়ায় জোটগুলির দ্বন্দ্বের প্রতিফলন এবং আবার একই সঙ্গে সম্পর্কগুলির পুনর্বিন্যাসেরও মাধ্যম। যুদ্ধ হচ্ছে মৃত্যু ও ধ্বংসের উন্মত্ত লীলা। কিন্তু কখনও সখনও ইতিহাসে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং ইতিহাসকেই গতি প্রদান করে। উপসাগরীয় যুদ্ধ প্রকৃত অর্থেই ইতিহাসের ক্ষেত্রে অবশ্যই এক নতুন সূচনা সৃষ্টি করেছে।

১৯৯০ সালটি ছিল সমাজতন্ত্রের পরাজয় এবং সাম্রাজ্যবাদের বিজয়ের বছর। সর্বগ্রাসী শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে পূর্ব ইউরোপে ‘উদারনৈতিক বুর্জোয়া মূল্যবোধ’ বিজয়ী আত্মপ্রকাশ ঘটায়। সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র তখন মৃত্যুপথযাত্রী। আর, তিয়েন-আন-মেনের ঝাঁকানির পর, পশ্চিমী দুনিয়ার আক্রমণাত্মক অবস্থানের মুখে চীন পড়ে যায় রক্ষণাত্মক অবস্থায়। নির্জোট আন্দোলন তার সমস্ত প্রাসঙ্গিকতা খুইয়ে ফেলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্ব পুঁজিবাদ তার বিজয় কেতন ওড়ায় এবং বহু দশক পর বিশ্বকে আবার এককেন্দ্রিক হয়ে উঠতে দেখা যায়।

জর্জ বুশের তুলে ধরা নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার সহজ অর্থই হল তৃতীয় বিশ্ব এবং তার সম্পদসমূহের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৯১ সালের প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা বাজেট বিতর্কিত ‘নক্ষত্র যুদ্ধ’ খাতে ব্যয় বরাদ্দ বিগত বছরের ২.৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার। বাজেট ঘোষণায় সোভিয়েত রাশিয়া থেকে পারমাণবিক বিপদের সম্ভাবনা কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি থেকে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের অজুহাত খাড়া করে এই বরাদ্দ বৃদ্ধিকে যুক্তিসঙ্গত হিসাবে দেখানো হয়।

নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার এই মার্কিনী পরিপ্রেক্ষিত থেকে, এটি খুবই স্বাভাবিক যে ইরাকের দিক থেকে কুয়েত আগ্রাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই বরদাস্ত করবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের মতো দেশগুলি পশ্চিম এশিয়ার তেলের খনির উপর তাদের অধিকারকে জন্মগত অধিকার হিসাবেই মনে করে। মার্কিনী এজেন্ট কুয়েতের শেখ-এর পতন এবং তারই পাশাপাশি আবার শক্তিশালী এক দেশ হিসাবে ইরাকের উত্থান এবং ২০ শতাংশ তেল সম্পদের ওপর তার কর্তৃত্ব নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতি বাস্তবিকই এক সরাসরি আঘাত হিসাবেই ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবলমাত্র এক যুদ্ধের জন্যই উন্মুখ হয়ে ছিল। আর এককেন্দ্রিক বিশ্বের এক চমৎকার নিদর্শন স্বরূপ রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোলাম হিসাবেই কাজ করল। ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জোটভুক্ত দেশগুলি বহুজাতিক সেনাবাহিনীতে যোগ দিল এবং তার সঙ্গে সিরিয়া, মরোক্কো এবং মিশরের মতো আরব দেশগুলিও অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ল। পাকিস্তান পাঠাল পদাতিক বাহিনী আর ভারত যোগান দিল মার্কিন সামরিক যুদ্ধ বিমানের জন্য জ্বালানি। জার্মানি ও জাপান দিল আর্থিক সহায়তা। সোভিয়েত রাশিয়া নৈতিক সমর্থন নিয়ে এগিয়ে এলো এবং চীন অবলম্বন করল রহস্যজনক নীরবতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পুরো রাজনৈতিক উদ্যোগ চলে আসে, আর ইরাক হয়ে পড়ল একা, সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। ইয়েমেন ও কিউবার মতো কয়েকটি ছোটো দেশ বাদে আমেরিকার বিরুদ্ধে আর কাউকেই প্রতিবাদী কণ্ঠে সোচ্চার হতে দেখা গেল না। এত কিছুর পরও ইরাক লড়াই চালিয়ে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নেয়। কুয়েতের ইস্যুটির সঙ্গে প্যালেস্তাইনের প্রশ্ন যুক্ত করে এবং ইরানের সঙ্গে পুরোনো বৈরিতা মিটিয়ে নিয়ে ইরাক তার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করেই রেখেছিল।

সমস্ত নৃশংসতা নিয়েই যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। ইরাক এখন ইতিহাসের জঘন্যতম বোমাবর্ষণের মুখে দাঁড়িয়ে। আর এটিই পাশ্চাত্য সভ্যতার কুৎসিত মুখকে উন্মোচিত করেছে। ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদের মাঝখানে শতাব্দী পুরাতন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সমস্ত অবশেষ, বাগদাদ ও বাসরার মতো ঐতিহাসিক শহরগুলি এবং কয়েক শতাব্দী ব্যাপী ইসলাম সভ্যতার ধর্মীয় স্থানগুলি ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। খুন করা হচ্ছে শয়ে শয়ে শিশু, মহিলা ও সাধারণ নাগরিকদের। উন্নত প্রযুক্তির প্রতি পাশ্চাত্য দুনিয়ায় আকর্ষণ এই বীভৎসতাকে দুরদর্শনের পর্দায় এক রোমাঞ্চকর খেলায় রূপান্তরিত করেছে। মার্কিনী নেতাদের অশালীন কথাবার্তা এবং পাশ্চাত্য সংবাদ মাধ্যমগুলির ভাষা স্পষ্টতই তাদের জাতিবিদ্বেষের মনোভাবকে প্রতিফলিত করে; এই মনোভাব আর কিছুই নয়, তা তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলির আকাঙ্খা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবল ঘৃণারই অভিব্যক্তি।

মূল কথা হল, এই হচ্ছে আমেরিকার এককেন্দ্রিক বিশ্বের ছবি, যার স্বপ্ন সে এতদিন দেখে আসছে।

যদিও, স্বপ্ন অনেকক্ষেত্রে কেবলমাত্র স্বপ্নই রয়ে যায়। মার্কিনের যে সমস্ত সেনাপতিরা পূর্বে ঘোষণা করেছিলেন যে মাত্র ছদিনের মধ্যে যুদ্ধ জয় করবেন, তাঁরা আজ পর্যন্ত স্থলপথে আক্রমণ শানানোর মুরোদ দেখাতে পারেননি। সংবাদে প্রকাশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ও সাদ্দামের সপক্ষে বিশ্বের বহু দেশে গণবিক্ষোভের জোয়ার শুরু হয়েছে। একের পর এক দেশ বাধ্য হচ্ছে তাদের অবস্থান পাল্টাতে। আর, বহুজাতিক জোটের অভ্যন্তরে ফাটল বাড়ছে ক্রমশই।

সাদ্দাম হুসেনকে হয়তো সহজেই যুদ্ধে পরাস্ত করা যাবে, কিন্তু প্যালেস্তাইন ইস্যুকে তিনি কুয়েতের সঙ্গে যুক্ত করতে অনেকাংশেই সফল হয়েছেন। এখন যে কোনো শান্তি প্রস্তাবকেই প্যালেস্তাইন সমস্যার বিষয়টি বিচার-বিবেচনা করতে হবে। এমনকি সাদ্দাম পরাজিত হলেও, তাঁর জাগিয়ে তোলা আরব জাতীয়তাবাদ এমনকি আগামী দিনগুলিতে আমেরিকাকে লাগাতার তাড়িয়ে বেড়াবে। এর ভিত্তিতে, ফ্রান্স ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলি স্বাধীন রাজনৈতিক উদ্যোগের পথে পা বাড়াবে যা মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ হতে বাধ্য। মার্কিন-সোভিয়েতের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের বর্তমান পর্যায়টি এক উত্তপ্ত উত্তেজনাময় শান্তিতে পরিণত হতে পারে। আর, মার্কিন বিরোধী ঢেউ-এর যে প্লাবন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে লক্ষ্যণীয় তা নিশ্চিতভাবেই এক নতুন রাজনৈতিক মেজাজ নিয়ে আসবে।

এই যুদ্ধের পরিণতি যাই হোক না কেন, এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে মার্কিনের এককেন্দ্রিক বিশ্বের স্বপ্নের সলিল সমাধি হবে খোদ পারস্য উপসাগরেই।

(লিবারেশন, মার্চ ১৯৯০ থেকে)

মানব সভ্যতার ইতিহাস ৯০-এর দশকে প্রবেশ করল। গত দশকের শেষ বছরটিতে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে, বিশেষত পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে একের পর এক আলোড়নময় ঘটনাগুলি ঘটে যায়। এই ঘটনাগুলিতে বুর্জোয়া বিশ্ব উল্লাসে ফেটে পড়ছে। বুর্জোয়া সংবাদ মাধ্যমও সুরে সুর মিলিয়ে আরও একবার, এই শতাব্দীতে সম্ভবত তৃতীয়বার, কমিউনিজমের মৃত্যু ঘোষণা করে দিয়েছে। সর্বত্রই বুদ্ধিজীবীরা দোদুল্যমানতা দেখাচ্ছেন এবং কমিউনিস্ট পার্টি পরিত্যাগ করতে শুরু করেছেন। আমাদের পার্টির মধ্যেও এই ঘটনার প্রভাব পড়তে দেখা গেছে। পার্টির মধ্যেকার যে বিলোপবাদী ধারা সিপিআই(এমএল)-এর প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কেই প্রশ্ন তুলেছিল, তা এখন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিজ্ঞান সম্পর্কেই সংশয় ছড়াতে শুরু করেছে। এর প্রবক্তারা এখন নিজেদের কমিউনিস্ট বলতেই লজ্জাবোধ করেন, তার পরিবর্তে নিজেদের ‘গণতন্ত্রী’ হিসাবে পরিচয় দিতেই পছন্দ করছেন। এই পরিস্থিতিতে সমস্ত প্রকৃত কমিউনিস্টদের অবধারিত কর্তব্য হল মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা, উদারনীতিবাদী বুর্জোয়া মহলের সমস্ত আক্রমণ থেকে তাকে রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাগুলিকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করা এবং নতুন নতুন প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করে ও নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করা।

সিপিআই(এমএল)-এর অবস্থান সঠিক প্রমাণিত

অন্যান্য দুটি কমিউনিস্ট পার্টি অর্থাৎ সিপিআই ও সিপিআই(এম) যারা এই সেদিনও পর্যন্ত সোভিয়েত ও পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক মডেলকে দৃষ্টান্তমূলক বলে মনে করত এবং নিয়মমাফিক তাদের প্রশংসা বন্দনা করত, তাদের বিপরীতে সিপিআই(এমএল) একেবারে শুরু থেকেই এই সমস্ত ব্যবস্থাকে খুবই সমালোচনার চোখে দেখত। এটা ঠিকই যে তাদের সমালোচনা করতে গিয়ে আমরা একেবারে চরমে পৌঁছে গেছিলাম। কিন্তু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনে আমলাতান্ত্রিক বিচ্যুতি, সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র দিতে অস্বীকার করা ইত্যাদির বিরুদ্ধে আমাদের মূলগত সমালোচনা ইতিহাসের পরীক্ষায় সফল বলে প্রমাণতি হয়েছে।

সিপিআই(এমএল)-ই ছিল একমাত্র ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি যে ১৯৬৮-তে এক গণঅভ্যুত্থানকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে চেকোশ্লোভাকিয়ায় সোভিয়েত সেনা পাঠানো, রাশিয়ার আফগানিস্তান আক্রমণ ও রাশিয়ার মদতপুষ্ট ভিয়েতনামের কামপুচিয়া আক্রমণের বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানিয়েছিল। আমরা এই সমস্ত প্রশ্নে আমাদের মৌলিক অবস্থান থেকে কখনও সরে আসিনি এবং ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে আমরা সঠিকই ছিলাম।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি যখন সোভিয়েত বিরোধী ফ্রন্ট গঠন করার পক্ষে ওকালতি শুরু করল, যে ফ্রন্টে আমেরিকা ও মার্কিনপন্থী শক্তিগুলি থাকবে, আমরা তখন তাতে যোগ দিতে অস্বীকার করি। চীনা নীতি সম্বন্ধে আমরা বারবার আমাদের ভিন্নমত জানিয়েছি এবং পাশ্চাত্য দেশগুলির সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া ঘটানোর ক্ষেত্রে উদারনৈতিক বুর্জোয়া ধ্যানধারণার প্রভাবের বিরুদ্ধে এক মতাদর্শগত অভিযানের প্রয়োজনীতার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছি।

সোভিয়েত ইউনিয়নে গর্বাচেভীয় সংস্কার যখন ব্রেজনেভের সময়কার রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অধঃপতনের দিকে সকলের নজর কেন্দ্রীভূত করে ও আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনা পাঠানোর ব্যাপারটা সমালোচনামূলকভাবে পুনর্মূল্যায়ন করে তখন সেই সংস্কারের প্রেক্ষাপটেই আমরা সোভিয়েত রাশিয়াকে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী আখ্যা দেওয়ার পূর্ববর্তী অবস্থানটি পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিই।

১৯৮৭-তে অনুষ্ঠিত আমাদের পার্টির চতুর্থ কংগ্রেসে আমরা দেখিয়েছি যে ব্রেজনেভের সময়কার সোভিয়েত রাশিয়ায় যে মূলগত অধঃপতন ঘটেছিল তাকে সমালোচনা করার মধ্যে আমাদের ভুলটা ছিল না। বরং সেটা ছিল পার্টি ও ব্যবস্থার ভিতর থেকেই পরিবর্তন ঘটানোর সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ নাকচ করার মধ্যে।

আমরা অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের বৃহৎশক্তিসুলভ অবস্থানের সমালোচনা চালিয়ে গেছি এবং সাম্রাজ্যবাদকে উজ্জ্বলভাবে চিহ্নিত করা ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করার ব্যাপারে গর্বাচভের নীতির বিরুদ্ধে আমাদের সমালোচনা কেন্দ্রীভূত করেছি। বিলোপবাদী প্রবণতার প্রবক্তারা শান্তিপ্রিয়, সভ্য সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত গর্বাচেভীয় তত্ত্বের দ্বারা ভেসে যান এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে সমস্ত ধরনের সমালোচনামূলক মন্তব্য বাতিল করার আকাঙ্খা প্রকাশ করেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিনের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক বিদ্বেষমূলক প্রচার এবং সমগ্র বুর্জোয়া বিশ্বের দ্বারা রাশিয়ার ব্রেজনেভীয় জমানাকে ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির অনুরূপ সরকারকে স্তালিনপন্থী বলে দেখানোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমরা তার সঙ্গে সুরে সুর মেলাতে অস্বীকার করি। আমরা বিশ্বাস করতাম এবং আজও করি যে স্তালিন ও ব্রেজনেভের রাজত্বের মধ্যে ভালোমাত্রায় পার্থক্য করতে হবে। আমরা এখনও স্তালিন সম্বন্ধে মাও-এর এই মূল্যায়নকে মেনে চলি যে তাঁর ভুলের তুলনায় তাঁর সাফল্যের পাল্লা অনেকগুণ ভারী।

প্রথমত, রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র গঠনের ৭০ বছরের ইতিহাসে স্তালিনের সময়কালই এখনও সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। এক পশ্চাদপদ কৃষিপ্রধান দেশ থেকে সেসময় রাশিয়াকে বিশ্বের প্রথম সারির শিল্পোন্নত দেশগুলির আসনে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমগ্র ইতিহাসে এই সময়কালই সর্বাপেক্ষা দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির পর্যায় হিসাবে চিহ্নিত আর এই সামর্থ্যের উপর ভিত্তি করেই সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বাত্মক নাৎসী আক্রমণের মোকাবিলা করে। এই সময়কালকে এক অপরাধময় পর্যায় হিসাবে অভিহিত করা ইতিহাসের অপলাপ। এর বিপরীতে, ব্রেজনেভ জমানা এক সার্বিক গতিরুদ্ধতার কাল হিসাবেই চিহ্নিত।

দ্বিতীয়ত, একথা সত্যি যে পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল লাল ফৌজের ক্ষমতার জোরেই। কিন্তু একথা ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে সেই সময়ে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির অগ্রগতি হচ্ছিল এবং কেবলমাত্র তাদের নেতৃত্বাধীন জনপ্রিয় ফ্রন্টগুলিই নাৎসী দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সমস্ত দেশগুলির বুর্জোয়া-জমিদার শাসকবর্গ হয় নাৎসীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল অথবা পালিয়ে গিয়েছিল। বিপরীতে, চেকোশ্লোভাকিয়ায় সৈন্য পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এক জমানার বিরুদ্ধে জনপ্রিয় বিদ্রোহকে দমন করা।

তৃতীয়ত, একথাও সত্যি যে স্তালিনের সময়কালেই সোভিয়েত রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের মধ্যে অতিবৃহৎ শক্তির প্রতি নির্ভরশীলতা ভিত্তিক সম্পর্কের বীজ বোনা হয় এবং সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে অন্যান্য কমিউনিস্ট পার্টিগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক নেতৃত্বকারী পার্টি বনাম নেতৃত্বাধীন পার্টির বিকৃত রূপ পরিগ্রহ করে। তখনও পর্যন্ত অবশ্য কমিউনিস্ট দুনিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি যে বিপুল মর্যাদার অধিকারী ছিল, তার ফলে অন্যান্যদের মধ্যে তার নেতৃত্বকারী ভূমিকা সম্পর্কে এক জনপ্রিয় গ্রহণযোগ্যতাও ছিল। ব্রেজনেভ শাসনকালের মতো সেটি কিন্তু কোনো আরোপিত সম্পর্ক ছিল না।

চতুর্থত, স্তালিন ও তাঁর সময়কালের কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বিলাসিতা ও স্বজনপোষণের কোনো অভিযোগ ছিল না। কিন্তু ব্রেজনেভ আর পূর্ব ইউরোপ জুড়ে তার অনুচরদের বিরুদ্ধে ঐ ধরনের ভুরিভুরি অভিযোগ রয়েছে।

ট্রটস্কি বা বুখারিনের তত্ত্ব তৎকালীন পরিস্থিতিতে রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র গঠনের পক্ষে সহায়ক হত, আমরা তা মনে করি না। স্তালিনের সময়কালে সবচেয়ে গুরুতর বিচ্যুতি ঘটেছিল আন্তঃপার্টি সংগ্রামের ক্ষেত্রে যা ফলত পার্টি প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যাপক অবক্ষয়ের বিনিময়ে তাঁকে ঘিরে এক ব্যক্তি পূজার ধারার জন্ম দেয়। এর যুক্তিসঙ্গত পরিণতি হিসাবে এবং অর্থনীতির মাত্রাতিরিক্ত কেন্দ্রীভবনের ফলে পার্টি ও সরকারের কর্তাব্যক্তিরা আমলাসুলভ আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন এবং সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলিতে গুরুতর বিপর্যয় ঘনিয়ে আসে। পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, এক বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ‘একটি মাত্র দেশে সমাজতন্ত্র নির্মাণের’ মূল্য সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি ও সোভিয়েত সমাজকে ঐরকমভাবেই দিতে হয়েছিল। এটিই প্রত্যাশিত ছিল যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে পার্টি নেতৃত্ব ঐ ভুলগুলি সংশোধনের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করবেন। কিন্তু ব্রেজনেভের আমলে বিচ্যুতিগুলি অব্যাহত থাকে; যা ঐতিহাসিক বিয়োগান্তক ঘটনা হিসাবে দেখা দিয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি পরিণত হয় প্রহসনে।

যে তত্ত্ব বলে পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট পার্টিগুলি যে ‘অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়’ মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে তার বিপর্যয়ের মূল কারণ, সেই তত্ত্বের সঙ্গে আমরা সহমত পোষণ করি না। এই যুক্তিধারাকে সম্প্রসারিত করলে দেখা যাবে যে সোভিয়েত ও চীনা সমাজতান্ত্রিক সমাজও ‘অস্বাভাবিক’ রূপে দেখা দিচ্ছে। কেননা মার্কস সর্বাপেক্ষা উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতেই সর্বপ্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হবে বলে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন এক্ষেত্রে তার হুবহু মিল দেখা যায় না।

এই লেনিনীয় বিধানের প্রতি আমাদের বিশ্বাস এখনও অবিচল – রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের কোনো সুযোগ কমিউনিস্ট পার্টির কাছে এলে তাকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে এবং তারপর সমাজকে নতুন করে গড়তে হবে।

সোভিয়েত রাশিয়া, চীন ও পূর্ব ইউরোপের বিকৃতির সন্ধান ক্ষমতা দখলের মধ্যেই না করে তা করতে হবে সর্বহারার ক্ষমতা পরিচালনার ধারার মধ্যে।

অতিরিক্ত মাত্রায় কেন্দ্রীভবন ও সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলির অবক্ষয়ের পরিণতিতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনে যে আমলাতান্ত্রিক বিকৃতি দেখা দেয় তা যেমন সত্য, তেমনি সাধারণভাবে বলতে গেলে একথাও সত্যি যে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং পার্টি ও প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্য থেকে রাজনৈতিক সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে ঐ বিকৃতিগুলির সংশোধন করাও সম্ভব। চীনে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এবং রাশিয়ায় গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রৈকার ইতিবাচক দিকগুলি এই বিষয়টিকেই প্রতীয়মান করে।

পূর্ব ইউরোপের ঘটনাবলী

কমিউনিস্ট পার্টিগুলির জীবনে এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার অভ্যন্তরে বিকৃতিগুলি ছাড়াও পূর্ব ইউরোপের সমস্যাবলীকে আরও জটিল করে তুলেছিল যে বিষয়টি তা হল, সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টিগুলি সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর চূড়ান্ত মাত্রায় নির্ভরশীল ছিল এবং এক ধরনের অতিবৃহৎশক্তি বনাম তাঁবেদার রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে উদ্ভূত রাশিয়া-বিরোধী জাতীয়তাবাদী আবেগও যথেষ্ট তীব্র ছিল। এর ফলে জনগণ থেকে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির ব্যাপক বিচ্ছিন্নতা ঘটে এবং চার্চ ও অন্যান্য অনেক বিরোধী শক্তিগুলি জাতীয়তাবাদী আবেগে নেতৃত্ব দিয়ে সামনে চলে আসে।

পূর্ব ইউরোপে যখন এই শক্তিশালী জনপ্রিয় বিক্ষোভের ফল্গুধারা বয়ে চলেছিল, সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের গ্রাসনস্ত ও পেরেস্ত্রৈকা তাদের কাছে বিরাট নৈতিক অনুপ্রেরণা হয়ে দেখা দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষেও এই অস্বস্তিকর সম্পর্ককে টেনে চলা আর সম্ভব হচ্ছিল না এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সোভিয়েত সমাজের মধ্যেকার পরিবর্তনের ধারাও পূর্ব ইউরোপে একই ধরনের পরিবর্তনকে অপরিহার্য করে তুলেছিল। এটিই ছিল পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা, কেননা এছাড়া আর অন্য কোনো অর্থপূর্ণ পথে এই দুই সমাজের মধ্যে আন্তঃক্রিয়াকে অব্যাহত রাখা সম্ভব ছিল না। সোভিয়েতের অগ্রাধিকার স্পষ্টতই ছিল সংস্কারের মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসা। এর মধ্যে যে ঝুঁকি রয়েছে গর্বাচভ সে সম্পর্কে অবহিত ছিলেন এবং সে ঝুঁকি নিতে তিনি দ্বিধা করলেন না। চেকোশ্লোভাকিয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হবে না বলে সোভিয়েত যে ঘোষণা করে, সেটিই পূর্ব ইউরোপের বিস্ফোরণের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক শর্ত হিসাবে কাজ করে। সোভিয়েত ইউনিয়নই ষড়যন্ত্রমূলকভাবে পূর্ব ইউরোপের পরিবর্তনগুলি ঘটিয়েছে এমন মনে করার কোনো ভিত্তি নেই। খুব সম্ভবত যে গতিতে ঘটনাবলী এগিয়েছে এবং পরিবর্তনকামী যে শক্তিগুলি সামনে এসেছে, তা একেবারেই তাদের ধারণার বাইরে ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে এখনও মূলত অতিবৃহৎশক্তি বনাম তাঁবেদার রাষ্ট্রের সম্পর্ক বজায় থাকলেও, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি এখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাপেক্ষে অধিকতর মাত্রায় স্বাধীনতা ও প্রয়োগকৌশল ক্ষমতা ভোগ করে। একথা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, পূর্ব ইউরোপের পরিবর্তনগুলি এবং তারা যে পশ্চিমের কাছে নিজেদের উন্মুক্ত করে দিয়েছে, এ সবই সোভিয়েতের বর্তমান নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। গর্বাচভ যখন বলেন যে পূর্ব ইউরোপের পরিবর্তনগুলি সমাজতন্ত্র, অর্থাৎ সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের স্বার্থের পরিপন্থী নয়, তখন তিনি একেবারে যথার্থ কথাই বলেন। তাঁর নববর্ষের ভাষণে গর্বাচভ বলেছেন, “পূর্ব ইউরোপ সব সময়েই সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর নির্ভর করতে পারে” এবং পূর্ব ইউরোপ অবশ্যই তা করে যাবে।

এই প্রেক্ষাপটে রুমানিয়ার ঘটনা একেবারে আলাদা। চৌসেস্কু দীর্ঘদিন ধরেই মস্কোর সাপেক্ষে এক স্বাধীন নীতি নিয়ে চলছিলেন এবং রুমানিয়াকে পশ্চিমের কাছে অনেকটাই উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তাঁর নিজের এক শক্তিশালী ভিত্তি ছিল। তাঁর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ থাকলেও, তাঁর অপসারণে সেনা বাহিনীর জড়িত থাকা এবং পরবর্তীতে তাঁর হত্যা থেকে এটি বোঝা যায় যে, সেক্ষেত্রে নীচের থেকে গণবিদ্রোহের চেয়ে সমাজের ওপর তলার মধ্যকারই এক লড়াই-ই বেশি ছিল।

এছাড়াও, চৌসেস্কুর অপসারণে রাশিয়ার নির্দিষ্ট স্বার্থ, রুমানিয়ার ঘটনাবলী সম্পর্কে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তীতে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতি – এ সমস্ত কিছুই অভিযোগের তীর রাশিয়ার দিকেই নির্দেশিত করে।

অবশ্য, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির, যেখানে পুঁজি গঠনের হার অত্যন্ত নিম্নস্তরের, সেই দেশগুলির সমস্যা সমাধান করা পুঁজিবাদের পক্ষে সম্ভব নয়। পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলির ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র অনেক বেশি ‘স্বাভাবিক’। পুঁজিবাদী পথ এই দেশগুলির ব্যাপক জনগণের জন্য কেবলমাত্র আরও দুর্দশাই নিয়ে আসবে এবং এই দেশগুলিকে নয়া-উপনিবেশবাদী শোষণের কাছে প্রতিরোধহীন করে তুলবে।

দ্বিতীয়ত, দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে কমিউনিস্ট পার্টিগুলি একগুচ্ছ অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নিজেদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছে। আর যে দেশগুলিতে তা করা সম্ভব হয়নি, সেখানেও নতুন শাসককূল সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে সমস্যায় পড়ছেন। পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরীর সরকারের কিছু পদক্ষেপ জনগণ অবশ্যই ভালো চোখে নেবেন না।

পরবর্তী যে পরিবর্তনের ধারা সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় সাধন গড়ে তুলবে তা আর খুব দূরে নয়।

নতুন বিতর্ক

নয়া ঔপনিবেশিক শোষণ চালায় না এমন এক শান্তিপূর্ণ, সভ্য সাম্রাজ্যবাদ; জাতি, রাষ্ট্র ও মহাদেশগুলির পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসা; বিশ্ব শান্তির নামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সহযোগিতা করা ইত্যাদি সংক্রান্ত গর্বাচভের ধারণাগুলি তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের কমিউনিস্ট পার্টি, গণতান্ত্রিক সংগঠন ও জনগণের মনে সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিই নয়া ঔপনিবেশিক শোষণের সবচেয়ে বড় শিকার এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই-এর ধার কমিয়ে দেওয়ার জন্য যে উপদেশবাণী তাদের শোনানো হচ্ছে তাকে তাদের স্বার্থের প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করা হচ্ছে। দুটি বৃহৎ শক্তির পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসা এইভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির মৌলিক স্বার্থের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এইভাবে আমরা সিপিসি ও সিপিএসইউ-র মধ্যে নতুন একপ্রস্থ মহাবিতর্কের সম্ভাবনা দেখছি। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের কমিউনিস্ট পার্টি হিসাবে এবং আমাদের চতুর্থ পার্টি কংগ্রেসে গর্বাচভের সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে তত্ত্বের বিরোধিতা, যা এদেশে সম্ভবত আমরাই প্রথম করেছি, এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তৃতীয় বিশ্বের প্রতিনিধিত্বকারী পার্টি ও সংগঠনগুলির পক্ষাবলম্বন না করে পারি না। যাই হোক, সোভিয়েত ইউনিয়নে গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রৈকার ইতিবাচক মূল্যায়ন করার সাথে সাথে নিরস্ত্রীকরণ ও বিশ্বশান্তির পক্ষে সোভিয়েত পদক্ষেপগুলিকে আমরা সমর্থন করে যাব। অপরদিকে আমরা মনে করি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান ও মতাদর্শগত রাজনৈতিক শিক্ষাদান ছাড়াও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে চীনে এখনও অনেক কিছু করার আছে। অন্ধভাবে কোনো না কোনো ‘নেতা পার্টি’ ও তাদের ক্যারিশ্মা সম্পন্ন নেতাদের অনুকরণ করার মুৎসুদ্দি মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে। পশ্চিমী প্রচারবিদদের কাছেও আমাদের মস্তিষ্ক বন্ধক দেওয়া চলবে না। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক নীতিমালার উপর ভিত্তি করে এবং আমাদের দেশ, জনগণ ও আমাদের পার্টির স্বার্থকে সর্বোচ্চ অবস্থানে রেখেই আমরা অন্যান্য কমিউনিস্ট পার্টির সূত্রায়ন ও নির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলির স্বাধীনভাবে বিচার করব।

আমাদের দেশে কমিউনিস্ট পার্টির সংহতকরণ বনাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সম্প্রসারণ করা সম্পর্কে

ক্রুশ্চেভের সময় থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য সোভিয়েতের সাহায্যে পুঁজিবাদী স্তরের মধ্য দিয়ে না গিয়ে সরাসরি সমাজতন্ত্রে পৌঁছনোর ওকালতি করে আসছে। রাজনৈতিক দিক থেকে এর অর্থ হল, সাম্রাজ্যবাদ ও একচেটিয়া পুঁজির বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টিকে শাসক ‘জাতীয় বুর্জোয়াদের’ সঙ্গে ব্যাপকতর জোটে আবদ্ধ হতে হবে। সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর অর্থ হল, সোভিয়েতের সাহায্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিকাশ ঘটানো, যে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র বেসরকারি ক্ষেত্রের বিরুদ্ধে এক দুর্গ হিসাবেই কাজ করবে এবং যার উপর ভিত্তি করে এই দেশগুলি সমাজতন্ত্রে পৌঁছে যেতে সমর্থ হবে। সিপিআই-এর ‘জাতীয় গণতন্ত্রের’ ধারণা এই প্রেক্ষিতের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল এবং সিপিআই(এম)-ও অনেকটাই এই পথ অনুসরণ করেছিল। তার শুরু থেকেই সিপিআই(এমএল) রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে কল্পকথার স্বরূপ উদ্ঘাটন করে দিয়েছে এবং দেখিয়ে এসেছে কীভাবে তা একচেটিয়া পুঁজির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আমলাতান্ত্রিক পুঁজির জন্ম দেয়।

সোভিয়েত তাত্ত্বিকরা এখন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র অদক্ষতা, অপচয় ও আমলাতন্ত্র সৃষ্টি করে। তৃতীয় বিশ্বের জন্য এখন যে নতুন মডেলের কথা তাঁরা বলছেন, তাঁদের ভাষায় যাকে বলে ‘গণতান্ত্রিক’ অথবা ‘সুসভ্য পুঁজিবাদ’। একথা উল্লেখ না করলেও চলে যে, এই নতুন দাওয়াই তাঁদের নিজস্ব সমাজের পরিবর্তনশীল ধারার প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এখন আবার তাঁরা আহ্বান জানিয়েছেন, ‘সুসভ্য পুঁজিবাদ’-এর প্রতিনিধিত্বকারী শক্তিগুলির সঙ্গে এক ব্যাপকতর জোটে আবদ্ধ হতে হবে। আমরা জানি না, ভি পি সিং-এর জন্য সিপিআই ও সিপিআই(এম)-এর এই নতুন অনুরাগ ঐ বাতলানো পথের সঙ্গেই তাল মিলিয়ে এসেছে কিনা। যাই হোক, জনগণতন্ত্রের দিকে যাত্রার এও এক পথ বটে!

মাও-এর নয়া গণতন্ত্রের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে আমরা এক গণতান্ত্রিক মোর্চার বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। গণতান্ত্রিক মোর্চা এথবা গণবিপ্লবী পার্টি সম্পর্কে আমাদের সামগ্রিক ধারণা উদ্ভূত হয়েছে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মূল নীতিমালা থেকে, আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে নির্দিষ্ট ভারতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে তার একাত্মকরণের মধ্য থেকে, তার কর্মসূচি উদ্ভূত হয়েছে সমাজতন্ত্রের দিকে এক উত্তরণশীল পর্যায় হিসাবে এক বিপ্লবী গণতান্ত্রিক প্রেক্ষিত থেকে এবং তার নেতৃত্বকারী কেন্দ্র গঠিত হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিয়েই। গত কয়েক বছরে ঐ ধরনের এক মোর্চা গড়ে তোলার ব্যাপারে আমরা কিছু মাত্রায় সাফল্য পেয়েছি। বিশেষত বিহারে ঐ মোর্চা অন্যান্য দলের কর্মীবাহিনীর মধ্যে থেকে বামপন্থী ও গণতন্ত্রীদের আকৃষ্ট করে চলেছে। বিভিন্ন রূপের সংগ্রামের মধ্যে সমন্বয়সাধন করতেও আমরা কিছুদূর সফল হয়েছি, যার মধ্যে রয়েছে সংসদীয় সংগ্রামের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট অগ্রগতি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি পার্টির মধ্য থেকেই এক অদ্ভুত তত্ত্ব উঠে আসছে, যে তত্ত্ব সাম্প্রতিক পূর্ব ইউরোপের ঘটনাবলীর বিকাশ থেকে প্রেরণা পেয়েছে। এই তত্ত্ব বলছে যে পার্টিকে বিলোপ করে দিতে হবে, ঘুরিয়ে বলা হচ্ছে ‘আইপিএফ-এর রূপে পার্টি খোলা হয়ে সামনে আসছে’। তাঁরা ধারাবাহিকভাবে বলে যাচ্ছেন যে, কমিউনিস্ট পার্টিকে প্রতিস্থাপিত করতে হবে গণতান্ত্রিক পার্টিকে দিয়ে, অথবা যাকে কেউ কেউ বলতে পছন্দ করেন ‘বাম গঠন’। পার্টি সুনির্দিষ্ট সাফল্যলাভ করার পরও, এক গণতান্ত্রিক মোর্চা বা বলা যায় এক গণতান্ত্রিক পার্টিকে বিকশিত করার ব্যাপারে সাফল্যলাভের পরও হঠাৎ করে পার্টির বিরুদ্ধে এই বিস্ফোরণ কেন? এর কারণ অনুসন্ধান খুব কষ্টসাধ্য নয়। আমাদের সহযাত্রীরা যে ‘গণতান্ত্রিক পার্টি’ বা ‘বাম গঠনের’ ধারণা করেছেন তা মূলগতভাবে এক উদারনৈতিক বুর্জোয়া কর্মসূচি অনুসরণ করে আর এই পরিকল্পনার সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি খাপ খায় না, কেননা কমিউনিস্ট পার্টি সব সময়েই এক বিপ্লবী গণতান্ত্রিক দিশা প্রদানের চেষ্টা চালায়। এক উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক পার্টির প্রয়োজনের যথার্থতা প্রতিপন্ন করতে এই তত্ত্ব বিপরীত অভিমুখেই যাত্রা করে। প্রথমত সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে লঘু করে ফেলা হয়। আর ঐ সমস্ত উদারনৈতিকদের গুরু হলেন গর্বাচভ, যাঁর সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে উপদেশাবলী, রাষ্ট, জাতি ও মহাদেশগুলির পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসা সম্পর্কিত হিতোপদেশগুলিকে সমালোচনা ছাড়াই গ্রহণ করা হয়। অন্য শত্রু সামন্ততন্ত্র সম্পর্কে বলা হয় যে, সামন্ত অবশেষগুলিকে এক বুর্জোয়া সরকার মারফত আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে ধাপে ধাপে নির্মূল করা যেতে পারে। বিপ্লবীদের শুধু এই ধরনের সরকারে যোগ দেওয়া প্রয়োজন, অথবা খুব বেশি হলে এই সরকারের উপর কিছু জনপ্রিয় চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

সমগ্র ৯০ দশক জুড়েই আমাদের রণনীতিগত কর্তব্যকর্ম থাকছে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মহান লাল পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা, সিপিআই(এমএল)-কে শক্তিশালী করা এবং গণতান্ত্রিক মোর্চার সম্প্রসারণ করে চলা।

(জানুয়ারি ১৯৮৮, চতুর্থ পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট থেকে)

১৯৮৭-র ৮ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট রেগন ও সাধারণ সম্পাদক গর্বাচভ ওয়াশিংটনে একটা চুক্তিতে সই করেছেন যার লক্ষ্য হচ্ছে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার আণবিক অস্ত্রের গোটা ধরনটারই বিলোপসাধন করা। এজন্য বিশ্ব জনগণের মধ্যে যে আনন্দের সঞ্চার হয়েছে আমরাও তার অংশীদার। এই চুক্তিকে আমরা স্বাগত জানাই। আণবিক অস্ত্রের যতটুকু (মাত্র ৪ শতাংশ) বিলোপ ঘটাতে চাওয়া হয়েছে, সেদিক থেকে এই চুক্তি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে না, তবুও এটা একটা শুভ সূচনার ইঙ্গিত বহন করছে। আমেরিকার অর্থনৈতিক সংকট ও রাশিয়ার অর্থনীতিকে পুনর্বিন্যাস (rationalisation) করার একান্ত প্রয়োজনীয়তা, আণবিক প্রযুক্তির ক্রমাগত বৃদ্ধির জন্য ঘনিয়ে আসা বিপদ যা আমেরিকার আণবিক কারখানাগুলিতে কয়েকটা লিক তথা চেরনোবিলের কুখ্যাত দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে পরিলক্ষিত হয়, পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকায় শান্তি আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান তীব্রতা এবং অবশ্যই মিখাইল গর্বাচভের চালু করা শান্তি অভিযান প্রভৃতি নানান কারণের সম্মিলিত প্রভাবেই এটা সম্ভব হয়েছে।

সতর্কবাণী হিসাবে আমাদের অবশ্যই এখানে এটা পুনরায় উল্লেখ করতে হবে যে নভেম্বর ভাষণে গর্বাচভ শান্তি আন্দোলনের বুনিয়াদ হিসাবে যা হাজির করেছেন তাতে সাম্রাজ্যবাদকে সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে। সেই ভাষণে, তিনি এমনই এক সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার কল্পনা করেছেন যে ব্যবস্থায় যুদ্ধের বিপদ আর থাকবে না, যা অর্থনীতিকে আর সমরমুখী করে তুলবে না, যেখানে নয়া উপনিবেশিক শোষণ আর থাকবে না। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নাকি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবেই প্রতিযোগিতা করবে। সাম্রাজ্যবাদের এহেন ছবি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। নয়া ঔপনিবেশিক শোষণ ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বের জনগণের সংগ্রাম, ইউরোপ ও আমেরিকার জনগণের শান্তি আন্দোলন, নিজ নিজ দেশের অর্থনীতির সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রাম, এবং শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ চূড়ান্তভাবে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার ধ্বংসের শর্ত সৃষ্টি করবে এবং এর ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গেই কেবল যুদ্ধের বিপদ চিরকালের জন্য দূর হতে পারে।

[ সিপিআই(এমএল) পলিট ব্যুরোর বিবৃতি, লিবারেশন, জুন ১৯৮৯ থেকে]

চীনের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী

চীনের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে সিপিআই(এমএল) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সংবাদে জানা যাচ্ছে যে, তিয়েন-আন-মেন স্কোয়ারে সামরিক বাহিনীর হাতে বহু সংখ্যক ছাত্র ও নিরীহ জনগণ নিহত হয়েছেন। সমাজতান্ত্রিদ দেশে এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক এবং সমগ্র বিশ্বের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক জনগণ যে দুঃখ ও বেদনা প্রকাশ করেছেন আমরাও তার অংশীদার।

সিপিআই(এমএল) এটিও লক্ষ্য করছে যে সাধারণভাবে পশ্চিমী ধনতান্ত্রিক দেশগুলি এবং বিশেষ করে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ঘোলা জলে মাছ ধরতে চাইছে। চীনের অভ্যন্তরে কিছু মার্কসবাদ বিরোধী ও সমাজতন্ত্র বিরোধী শক্তির সাথে যোগসাজশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্ভূত সমস্যাটির কোনো ধরনের আপোশ মীমাংসার পথে বাধা সৃষ্টির জন্য মরীয়া প্রচেষ্টা চালিয়েছে, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনকে চীনের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে এবং এইভাবে সে ১৯৪৯ সালের ঐতিহাসিক পরাজয়ের বদলা নিতে চেয়েছে।

চীন থেকে আসা সাম্প্রতিক সংবাদে বোঝা যাচ্ছে যে, পরিস্থিতি দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে আসছে এবং পশ্চিমী সংবাদ মাধ্যমগুলির দ্বারা প্রচারিত গুজবগুলি ও ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলির মারফৎ সেগুলির যাচাই না করে ঢালাও প্রচার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হল গালপল্প।
ভারতবর্ষে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির চক্রান্তমূলক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সজাগ থাকার জন্য আমরা ভারতীয় জনগণের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। এই শক্তিগুলি চীনের মর্মান্তিক ঘটনাকে পুঁজি করে প্রকৃতপক্ষে ভারতের বাম আন্দোলনকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে এবং ভারতীয় জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের বাম মোড় নেওয়ার নতুন সম্ভাবনাকে বানচাল করার চক্রান্ত করছে।

আমরা আশা করি, গণতন্ত্রের জন্য জনগণের আন্দোলনের পিছনকার মূল কারণগুলি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবেন এবং গণতন্ত্রের জন্য জনগণের আকাঙ্খা পূরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংস্কারের কাজ হাতে নেবেন। আমরা আরও আশা করি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার সম্পর্কের সমগ্র বিষয়টি চীনা নেতৃত্ব পর্যালোচনা করবেন এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যকার ঐক্যকে শক্তিশালী করার জন্য প্রচেষ্টাকে বাড়িয়ে তুলবেন।

আমরা স্থির নিশ্চিত যে, ১৯৪৯ সালের পূর্বেকার যুগে চীনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের স্বপ্ন কখনোই সফল হবে না এবং বর্তমান বিশৃঙ্খলা অতিক্রম করে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিজয়ী ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে দাঁড়াবে।

৮ জুন, ১৯৮৯

(১৯৯৪-এর মার্চে সাউথ এশিয়া সলিডারিটি গ্রুপের পক্ষ থেকে এই সাক্ষতকার নেন কল্পনা উইলসন)

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে সমাজতন্ত্রের তথাকথিত সংকট সম্পর্কে আপনার ব্যাখ্যা কী?

প্রধানত, আমি মনে করি সমাজতন্ত্র নিজেই এক স্বয়ংসম্পূর্ণ বা স্থিতিশীল ব্যবস্থা নয়। সমাজতন্ত্র হল পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের মধ্যে এক উত্তরণশীল ব্যবস্থা। তাই এটি এক বিশিষ্ট পরিঘটনা। এর মধ্যে অবশ্যই সাম্যবাদের – অর্থাৎ যে সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে – তার কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, আবার এর মধ্যে পুঁজিবাদেরও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য এই অর্থে বজায় থেকে যায় যে – মার্কস যেমন বলেছেন – প্রত্যেককে তার কাজ অনুযায়ী দেওয়ার ‘বণ্টনের নীতি’ও কার্যত অপরিপর্তিত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক কোনো সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মালিকানাধীন একটি কারখানা রয়েছে। সেখানে একজন শ্রমিকের মনে হতে পারে যে তিনি জনগণেরই অংশ এবং সেই অর্থে তিনিও কারখানাটির মালিক। অন্যদিকে তিনি যেহেতু তাঁর কাজ অনুযায়ী পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন, তাঁর মনে হয় যে তিনি একজন মজুরি শ্রমিক। সুতরাং এই দ্বৈত সত্তাই একজন শ্রমিকের চেতনায় ক্রিয়াশীল থাকে।

মালিকানার প্রশ্নে, একাধারে এটি সমগ্র জনগণের মালিকানা; অপরদিকে এই মালিকানা রাষ্ট্রীয় মালিকানার দ্বারা পরিচালিত হয় (কারণ সমাজতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব তখনও থেকে যায়) এবং রাষ্ট্র-নিযুক্ত পরিচালকরা তা কার্যকরী করে থাকেন। সুতরাং মালিকানার চরিত্রও দ্বৈত স্বরূপ বিশিষ্ট এবং তা আমলাতন্ত্রে অধিঃপতিত হয়ে যেতে পারে। শ্রমিক এবং মালিকানা এই দ্বৈত সত্তা উত্তরণকালীন সমাজের বৈশিষ্ট্য।

এটিও ঘটনা যে আমরা সমাজতন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছি কোনো উন্নত পুঁজিবাদী দেশে নয়, কয়েকটি পশ্চাদপদ দেশে। উৎপাদিকা শক্তি পিছিয়ে পড়া, তাই চটজলদি কোনো উন্নততর মালিকানাব্যাবস্থার প্রবর্তন করা সম্ভব নয়। নানা ধরনের মালিনাকার অস্তিত্ব এখানে বিদ্যামান থাকে – সমগ্র জনগণের মালিকানা, যৌথ মালিকানা, ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত উদ্যোগসমূহ ... কেবলমাত্র ক্রমে ক্রমেই অন্য পর্যায়ে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। পণ্য সম্পর্কগুলি, মুদ্রা – এসবের অস্তিত্ব কেবলমাত্র যে বহাল থাকে শুধু তাই নয়, এগুলির যথেষ্ট ভূমিকা থেকেই যায়, কারণ পুঁজিবাদ তখনও নিঃশেষিত হয়নি। বেশ কিছু বিনিময় আসলে পণ্য বিনিময় বা বাজার বিনিময়ই রয়ে যায়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, জনগণের মালিকানাধীন উদ্যোগ ও যৌথ মালিকানাধীন উদ্যোগের মধ্যে বিনিময় তথা বিভিন্ন স্তরে উদ্যোগগুলির মধ্যে বিনিময় – সবই মূলত পণ্য বিনিময়। সমাজতান্ত্রিক সমাজের এই বৈশিষ্ট্যের কারণে, বিশেষত পিছিয়ে পড়া দেশগুলিতে সমাজতন্ত্রের অনুশীলনের ফলে সমাজতন্ত্রের দুটি সম্ভাবনাই থেকে যায় – তা সাম্যবাদের দিকেও এগিয়ে যেতে পারে অথবা পুঁজিবাদের পিচ্ছিল পথেও ফিরে যেতে পারে।

শুরুতে ধারণা ছিল যে, সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিছুকাল পরে তা সাম্যবাদে পৌঁছে যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে মার্কসবাদের তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটেছে। লেনিন বলতে থাকেন যে, এই উত্তরণ দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ এবং তারপরে চীন দেশে মাও বলেন যে, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে কে জিতবে তা এখনো নির্ধারিত হয়নি এবং এটি নির্ধারিত হতে কয়েকশো বছর সময় লাগতে পারে। নির্দিষ্ট যেসব পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্র গড়ে তুলতে হয়েছে সেই কারণেই এই পরিবর্তন সাধিত হয়। আর সমাজতান্ত্রিক সমাজেও শ্রেণীদ্বন্দ্ব, শ্রেণীসংগ্রামের অস্তিত্বের সূত্রায়নগুলি উপস্থিত হতে থাকে অথচ মার্কসবাদের আদি প্রবক্তারা সমাজতন্ত্র বলতে শ্রেণীহীন সমাজের কথাই ভেবেছিলেন। তাই আমি মনে করি মার্কসের মূল তত্ত্বে কেবল এক সাধারণ রূপরেখা প্রদান করা হয়েছিল। কারণ তাঁর সমগ্র ধারণা গড়ে উঠেছিল পুঁজিবাদী সমাজের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে, তাও আবার বিমূর্ত স্তরে, আদর্শ পুঁজিবাদী সমাজের প্রেক্ষিতে। নির্দিষ্ট অর্থে, এমনকি অত্যন্ত উন্নত পুঁজিবাদী সমাজের সাথেও মার্কসের আদর্শ মানদণ্ডগুলি পুরোপুরি মিলে যায় না। সুতরাং পুঁজিবাদের অধ্যয়ন সম্পূর্ণ হয়েছে – একথা বলতে আপনি পারেন না। কারণ পুঁজিবাদ আজও বিদ্যমান, তা অত্যন্ত দ্রুত বেড়ে উঠছে এবং এর দৌড় শেষ হয়ে যায়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সমাজতন্ত্র ও তার অর্থনৈতিক নিয়মগুলি সম্পর্কে অধ্যয়ন আজও রয়ে গেছে খুবই আদিম ও প্রাথমিক স্তরে। এইসব কারণে আমার মনে হয় মার্কসবাদের পুনর্জাগরণের জন্য বর্তমানে যা দরকার, জনপ্রিয় ভাষায় বলতে গেলে তা হল নতুন দাস ক্যাপিটাল। এজন্য সময়ও পরিপক্ক হয়ে উঠেছে। মূল ভিত্তিগুলি রয়েছে, সেগুলির কার্যকারিতাও অব্যাহত, কিন্তু পুঁজিবাদের অধ্যয়ন সম্পূর্ণ হয়নি। এমনকি লেনিনও একচেটিয়া পুঁজিবাদ সম্পর্কে অধ্যয়ন করার সময়ে এই ধারণা পোষণ করতেন যে একচেটিয়া পুঁজিবাদ হল পুঁজিবাদের শেষ পর্যায় এবং তা মুর্মূষু ও ধ্বংসোন্মুখ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একচেটিয়া পুঁজিবাদ নতুন নতুন রূপ পরিগ্রহ করছে ও টিকে থাকছে। তাই নতুন করে অধ্যয়নের প্রয়োজন। সেইসঙ্গে প্রয়োজন রাশিয়ার ৭৫ বছরের অভিজ্ঞতা ও পরবর্তীতে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির নিয়মগুলিকে অধ্যয়নের গুরুত্ব। ... সেজন্যই আমার মনে হয় মার্কসবাদের জন্য পুঁজি গ্রন্থের তুলনীয় এক বিস্তৃত অধ্যয়নের প্রয়োজন – বিশেষত যখন দেখা যাচ্ছে যে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবই চলছে চীন, ভিয়েতনাম ইত্যাদি পিছিয়ে পড়া দেশগুলিতে। সমাজতন্ত্র যদি কয়েকশো বছর ধরে এক উত্তরশীল সমাজ হিসাবে থেকে যায় তাহলে তার অর্থ হল পণ্য, মুদ্রা ও বাজারকে নিছক এক বাধ্যতা হিসাবে দেখলে এবং এগুলিকে অতিক্রম করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করলেই চলবে না। বরং এমনকি সমাজতান্ত্রিক সমাজেও এগুলির আরও বিকাশের প্রয়োজন হতে পারে, সমাজতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থেই এগুলিকে বিশেষভাবে কাজে লাগিয়ে নিতে হতে পারে। এগুলি নিছক বর্জনীয় ব্যাপার নয় বা ক্ষতিকারক হলেও আপাতত মানিয়ে নিয়ে চলতে হচ্ছে, এমন বিষয় নয়। পরিকল্পনাকে সমাজতন্ত্রেরই এক বৈশিষ্ট্য বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে, অথচ আমরা দেখেছি যে পুঁজিবাদী সমাজ তার অঙ্গস্বরূপ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নৈরাজ্যকে ঠেকানোর জন্য পরিকল্পনাকে ব্যবহার করেছে। অনুরূপভাবেই তাই, কমিউনিস্টদেরও সমাজতন্ত্র গঠনের জন্য পণ্য, মুদ্রা ও বাজারকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতে হবে।

মার্কস যখন বলেন সমাজতন্ত্র হল এক উত্তরণকালীন ব্যবস্থা, তখন তিনি আরও একটি বিষয়ের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সর্বহারার একনায়কত্ব একেবারেই অপরিহার্য। সে কারণেই আমার মনে হয়, যেখানে সর্বহারা একনায়কত্বকে দুর্বল করে ফেলা হয় সেখানে এই উত্তরণশীল ব্যবস্থা থেকে পিছলে পুঁজিবাদের দিকে ফিরে যাওয়া অবধারিত। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, যদি আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে তাকাই, আমরা দেখব যে তার পতনের আগে যে অর্থনৈতিক মডেল সেখানে চালু ছিল তা মোটের উপর চিরাচরিত সমাজতান্ত্রিক মডেলই ছিল। সবই ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের আওতায়,  বেসরকারিকরণ ও বিদেশী পুঁজি ছিল কার্যত অনুপস্থিত। কিন্তু ক্রুশ্চেভের আমল থেকেই সেখানে সর্বাহারা একনায়কত্ব শিথিল হতে শুরু করে এবং আমরা দেখি যে সেখান থেকেই কোনো না কোনোভাবে পুঁজিবাদের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বিপরীতে আমার মনে হয়, মাও সমাজতন্ত্রের পুঁজিবাদে প্রত্যাবর্তনের এই বিপদ সম্পর্কে অধ্যয়ন করেছিলেন, পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার যে সম্ভাবনাকে রাশিয়ানরা অস্বীকার করেছিল তা নিয়ে তিনি চিন্তাভাবনা করেছিলেন।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধারণাকে মাও সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক নিয়মগুলি উপেক্ষা করার উদ্দেশ্যে সামনে আনেননি বা পিছিয়ে থাকা উৎপাদিকা শক্তিকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে কোনো এক ধরনের অগ্রণী সাম্যবাদী উৎপাদন সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কল্পনা করা হয়নি। এর মধ্যে দিয়ে মাও আসলে সর্বহারা একনায়কত্বকে জোরদার করতে চেয়েছিলেন। ৯০ শতাংশ জনগণের গণতন্ত্রেরই অপর নাম হল সর্বহারার একনায়কত্ব। আর এটিই তিনি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন : অল্প কিছু লোকের ওপর একনায়কত্ব ও ৯০ শতাংশ জনগণের জন্য গণতন্ত্র। তাই সাংস্কৃতিক বিপ্লব বড় হরফের পোস্টার, গণউদ্দীপনা ইত্যাদির উপরেই জোর দিয়েছিল। রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে সর্বহারা একনায়কত্বকে বোঝা হত নিছক একনায়কত্ব হিসাবে। অন্য দিকটি অর্থাৎ ৯০ শতাংশের জন্য গণতন্ত্র – সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের এই প্রশ্নকে সর্বহারার একনায়কত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে তাঁরা উপলব্ধি করেননি। তাই গণতন্ত্রের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এল অন্য শক্তিগুলি। চীনেও সবসময়ই এই প্রশ্ন ছিল এবং সমাজতন্ত্রের অধীনে এই গণতন্ত্রের সাধারণীকরণের জন্য মাও সর্বপ্রথম প্রচেষ্টা চালান। গণতন্ত্রের জন্য এই আকাঙ্খারই পুনঃপ্রকাশ ঘটেছিল তিয়েন-আন-মেনে, আর আমার তো মনে হয়, প্রতি দশ বছর কিংবা প্রতি পাঁচ বা সাত  বছর অন্তর আমরা জনগণের কোনো না কোনো বড় ধরনের আন্দোলন প্রত্যক্ষ করছি। এই বিষয়টিকে যদি সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে হাতে নেওয়া না হয় তাহলে লোকে বুর্জোয়া কাঠামোর মধ্যে এটি তুলে ধরবে।

যাই হোক, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছিল এ প্রশ্নেই একটি পরীক্ষা। একথা সত্যি যে, কিছু পেটি বুর্জোয়া সামাজিক শক্তির আবির্ভাব ঘটে এবং সমগ্র সাংস্কৃতিক বিপ্লব পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। আর কিছু কিছু ব্যক্তি সমাজতন্ত্রের মৌলিক অর্থনৈতিক নিয়মগুলি লঙ্ঘন করে কিছু উচ্চতর সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা চালাতে শুরু করে। এই বিপ্লবে যার হাতিয়ার হওয়ার কথা সেই পার্টিই অসংগঠিত হয়ে পড়ে। এভাবে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু আমার বক্তব্য হল, সাংস্কৃতিক বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছিল। জনগণের মধ্যে তা বিপুল উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল, যদিও তাকে যথাযথভাবে সংগঠিত করা যায়নি, আর সেটিই ছিল এক সমস্যা।

চীনে বর্তমানে তাঁরা অর্থনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন আর কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বকেও অটুট রেখে চলেছেন। আমি অবশ্যই একে ভালো মনে করি এবং এক গবেষণা হিসাবে এটি পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়নের দাবি রাখে। কিন্তু অন্য দিকটিও, গণতন্ত্রের জন্য আকাঙ্খাও, সেখানে বর্তমান। চীনে পুনরায় কোনো না কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দেখা দেবে। কোনো দেশ কেবলমাত্র কিছু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যে দিয়েই বেঁচে থাকতে পারে না। আমার মনে হয় সেখানে আবারও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শিক্ষাগুলি কাজে লাগবে, অন্তত প্রসঙ্গক্রমেও তার উল্লেখের দরকার হবে। সমজতন্ত্রের সংকট বা সমাজতন্ত্রের সমস্যাগুলিকে এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমি দেখে থাকি।

ভারতের পটভূমিতে বাজার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? এই অনুশীলনকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিপিআই(এমএল)-এর দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে?

চীনের ক্ষেত্রে দেখবেন, এমনকি গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর্যায়েও মাও বুর্জোয়াদের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া ও জাতীয় বুর্জোয়া – এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করেছিলেন। এজন্য তাঁকে প্রচণ্ড সমালোচিত হতে হয়। তিনি মুৎসুদ্দি আমলাতান্ত্রিক পুঁজির কথা বলেছিলেন। এরা ছিল বিপ্লবের লক্ষ্যবস্তু। মাও দুটি জিনিসের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন : একটি হল কৃষকদের সঙ্গে মৈত্রী, আর এই প্রক্রিয়ায় তিনি কৃষকদের এক বিপ্লবী শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। এ ছিল মার্কসবাদে, অন্ততপক্ষে বিপ্লবী রণনীতিতে এক নতুন অবদান। তাঁর অবদানের অপর দিকটি হল জাতীয় বুর্জোয়াদের সাথে মৈত্রী স্থাপন। গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে সমাজতন্ত্র গড়ে তুলতে গিয়ে তিনি জাতীয় বুর্জোয়াদের রূপান্তরসাধনের বিষয়টি ধাপে ধাপে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। নিছক তাদের মালিকানাস্বত্ব বিলোপের পরিবর্তে তিনি তাদের ব্যবহার করে নিতে এবং রূপান্তর করতে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। এজন্য তাঁকে নিন্দা করা হয়, কারণ এটি নাকি সত্যিকারের সমাজতন্ত্র নয়। কিন্তু আমি মনে করি ভারতবর্ষের পরিস্থিতিতেও এই প্রশ্নের বিরাট গুরুত্ব থেকে যাবে। চীনের জাতীয় বুর্জোয়ারা ছিল খুব দুর্বল ও গুরুত্বহীন। ভারতে যখন বিপ্লব বিজয় অর্জন করবে ততদিনে বুর্জোয়াদের মধ্যে খুব সম্ভব ভাঙ্গন দেখা দেবে বলে আমি মনে করি। আর সেক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের একাংশের সাথে – যারা ততদিনে জাতীয় বুর্জোয়ায় রূপান্তরিত হয়েছে – আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালাতে হবে। আর ভারতীয় পরিস্থিতিতে ঐ জাতীয় বুর্জোয়ারা হবে রীতিমতো শক্তিধর। এমনকি কৃষকদের সাথে মৈত্রীর ক্ষেত্রেও, মধ্য কৃষক অথবা চাষিদের মধ্যেও একটি বড় অংশের উদ্ভব ঘটেছে যাদের মধ্যে রয়েছে পুঁজিবাদী প্রবণতা। রাজনৈতিক ফ্রন্টে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরসাধনের প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে এই সমস্ত শক্তির সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সমাজতন্ত্রের স্বার্থে তাদের কাজে লাগিয়ে নেওয়া – ভারতে আমরা এইসব বিশেষ প্রশ্নের সম্মুখীন।

কেউ কেউ বলে থাকেন, যেহেতু ভারতের বুর্জোয়ারা মুৎসুদ্দি, আর মুৎসুদ্দি মানে সাম্রাজ্যবাদের দালাল, তাই ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতা রয়েছে সাম্রাজ্যবাদের হাতে। সিপিআই(এমএল) গড়ে তোলার সময়ে, ১৯৬৯-৭০ সালে, যখন তার কর্মসূচির খসড়া তৈরি হচ্ছিল তখন আমরা এ প্রশ্নে এঁদের সাথে মতপার্থক্য রেখেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, এটি ভুল। আমরা মনে করি ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতা হয়েছে ভারতীয় বুর্জোয়া ও জমিদারদের হাতে। ক্ষমতা হস্তান্তরের এটিই হল সামগ্রিক মর্মবস্তু – এটি নিছক কোনো টেকনিক্যাল বিষয় ছিল না। শ্রেণীগত অর্থে তারা সাম্রাজ্যবাদের কাঠামোর মধ্যে থেকেই কাজ করে, কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা রয়েছে তাদেরই হাতে। যাঁরা মনে করেন যে সাম্রাজ্যবাদ ভারতীয় রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে তাঁদের সূত্রায়ন হল সাম্রাজ্যবাদের সাথে দ্বন্দ্বই ভারতের প্রধান দ্বন্দ্ব। তাই তাঁরা বলেন যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এক ব্যাপক ফ্রন্টের প্রয়োজন। হ্যাঁ, সাম্রাজ্যবাদের সাথে আমাদের এক মৌলিক দ্বন্দ্ব আছে – কিন্তু তা আছে এক বাহ্যিক অর্থে – জাতি বনাম সাম্রাজ্যবাদ হিসাবে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দিক থেকে আমরা একে প্রধান দ্বন্দ্ব বলে মনে করি না।

স্বভাবতই এখন যে প্রশ্ন উঠে আসে তা হল, এই মুৎসুদ্দিদের আসল চরিত্র কী? আমরা বলেছি যে এই বিষয়টি আমাদের নতুনভাবে দেখতে হবে। যদি আপনি তাদের অত্যন্ত মোটা দাগে, নিছক দালাল হিসাবে সূত্রায়িত করেন সেটি সঠিক হবে না। আমরা বলেছি যে ভারতীয় বুর্জোয়ারা একটি শ্রেণী হিসাবেই কাজ করে, তাদের বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তাদের মধ্যে এক সাধারণ যোগসূত্র রয়েছে। ভারতীয় বুর্জোয়াদের রয়েছে এক একক রণনীতি এবং তারা কিছুটা আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করে। এটি বজায় রাখা হয় বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক রেখে চলার মধ্য দিয়ে। এই স্বাধীনতা কোনো চরম অর্থে নয়, তারা সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ থেকেও মুক্ত নয়। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা রয়েছে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া ও জমিদারদের হাতে – এ বিষয়টি বোঝার মধ্য দিয়ে এবং তাদের দরকষাকষি করার তথা এক ধরনের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার সামর্থকে স্বীকার করে নেওয়ার মাধ্যমে, আমাদের পার্টি পুরোনো সূত্রায়নগুলি থেকে সরে আসতে এবং বাস্তব পরিস্থিতির সাথে আরও উপযোগী হয়ে ওঠার প্রয়াস চালিয়েছে।

বর্তমানে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে এবং ভারতীয় বুর্জোয়ারা পশ্চিমী শক্তি ও আইএমএফ/বিশ্ব ব্যাঙ্কের সাথে ঘনিষ্ঠতর সম্পর্ক গড়ে তুলছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আবার পরামর্শ আসছে যে ভারত তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলে কমবেশি এক নয়া উপনিবেশে পরিণত হয়েছে আর রাষ্ট্রক্ষমতা এখন রয়েছে সাম্রাজ্যবাদের হাতে, আর তাই সাম্রাজ্যবাদের সাথে ভারতীয় জাতির দ্বন্দ্বই বর্তমানে প্রধান অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সুতরাং আমাদের তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ব্যাপকতম মোর্চা গড়ে তোলা উচিত। লোকে বলতে শুরু করেছে যে আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারসাম্য রক্ষাকারীর ভূমিকা পালন করত এবং তার সাথে সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই ভারত পশ্চিমী দেশগুলির সাথে দরকষাকষি করতে পারত। কিন্তু এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন বিদায় নেওয়ায় ভারত আর তা করতে পারে না। সত্যিই, পরিস্থিতির এইসব পরিবর্তন ও ভারতীয় নীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তনের কারণে সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশ অনেক গভীরতর হয়েছে। কিন্তু তবু আমি মনে করি যে ভারতীয় বুর্জোয়াদের আপেক্ষিক স্বাধীনতা আছে। তা শেষ হয়ে যায়নি। ব্যাপক সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মোর্চায় জনপ্রিয় সমাবেশ সংগঠিত করার জন্য কেউ ‘ভারতের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিপদের’ কথা, ‘স্বাধীনতার সংকটের’ কথা বলতেই পারেন। কিন্তু বিষয়টি খুব আক্ষরিক অর্থে ধরা উচিত নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন বিদায় নিয়েছে, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে আজও দ্বন্দ্ব রয়েছে। তাই ভারত তার সম্পর্কগুলিকে কিছু ভিন্ন ধরনে বিন্যস্ত করার চেষ্টা চালাতেই পারে। যতদূর সম্ভব এইসব দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে নেওয়ার সামগ্রিক কৌশল আজও বিরাজ করছে। সোভিয়েতের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনো সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে ছিল না, তা ছিল নেহাতই দরকষাকষির হাতিয়ার। সাধ্যমতো, রাশিয়ার সঙ্গেও তারা এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারে, জাপান, জার্মানী ইত্যাদির সঙ্গেও তারা এই প্রয়াস চালিয়ে যেতে পারে। কারণ ভারতের বুর্জোয়া অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলি খুবই বৈচিত্রপূর্ণ, আর সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যেও রয়েছে দ্বন্দ্ব, সংকট আর প্রতিযোগিতা। তাই এই দরকষাকষির সামর্থ, দ্বন্দ্বিগুলিকে কাজে লাগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, এই আপেক্ষিক স্বাধীনতা বর্তমানে অনেকখানি সীমাবদ্ধ হতে পারে, কিন্তু আমি মনে করি না যে এই ক্ষমতা লোপ পেয়ে গেছে। আজও রাষ্ট্র ক্ষমতা ভারতীয় বুর্জোয়াশ্রেণীর হাতেই আছে। এই বিষয়টি আয়ত্ত করা অপরিহার্য – নতুবা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব উপেক্ষিত হবে।

আমি একটি ব্যবহারিক উদাহরণ দিতে পারি, যেমন ধরুন বিহারের কথা। বিহার বর্তমানে এক পিছিয়ে পড়া রাজ্য – যেখানে সামন্ততন্ত্র যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান এবং জমি ইত্যাদির প্রশ্নে সংগ্রাম অব্যাহত। তাই আমরা জমির প্রশ্নে সংগ্রামের বিষয়টি উত্থাপন করেছি এবং এমনকি সিপিআই, সিপিআই(এম)ও এইসব ইস্যু গ্রহণ করেছে। এখানে যে সরকার রয়েছে – লালু যাদবের জনতা দল সরকার – ভূমিসংস্কার করার অবস্থায় নেই। এর জন্য না আছে তার রাজনৈতিক সদিচ্ছা না আছে কোনো কাঠামো। তাহলে তাঁদের কৌশলটি কী? হঠাৎই তাঁরা ‘ডাঙ্কেলের’ কথা বলতে শুরু করেছেন, বলতে শুরু করেছেন যে ডাঙ্কেল খুব সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার, এটি কৃষক বিরোধী ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে তাঁরা সিপিআই এবং সিপিআই(এম)-এর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছেন। আর, সিপিআই-সিপিআই(এম)ও গুরুত্ব সহকারে জমির লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অবস্থায় নেই। কারণ জমির লড়াই গুরুত্বের সঙ্গে ধরতে গেলেই উত্তেজনা ও সশস্ত্র সংঘাত বেড়ে চলতে থাকে। এসব ব্যাপারে শুধুমাত্র আইনি উপায়ে সমাধান করা সহজ নয়। তাঁরা এরকম কঠিন পরিস্থিতি এড়াতে চান, আবার এক বিপ্লবী ভঙ্গিমাও বজায় রাখতে চান। ঠিক তখনই লালু ডাঙ্কেল নিয়ে আবির্ভূত হলেন আর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার নায়ক বনে গেলেন। কিন্তু কেন তিনি এই সমস্ত জিনিসকে সামনে আনছেন? লোকটি ডাঙ্কেলের ব্যাপারে কিছুই বোঝেন না। ডাঙ্কেল হল এক গাধা – এইটুকু বলে তিনি গাধাদের নিয়ে একটি মিছিল বের করলেন। এই হল তাঁর কর্মসূচি। বিহারের পরিপ্রেক্ষিতে আমি মনে করি না যে ডাঙ্কেল খুব বেশি হৈ চৈ ফেলতে পারবে, কারণ পুঁজিবাদী চাষাবাদ এখানে সেভাবে বিকশিত হয়নি। অবশ্য, আমরাও প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসছি এবং এমনকি বিহারেও এবিষয়ে আমরা কর্মসূচি নিয়েছি। কিন্তু তাঁরা যেভাবে প্রশ্নটি আনছেন, তাতে বেশ বোঝা যায় যে তাঁদের সমগ্র উদ্দেশ্য হল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে লঘু করে দেওয়া। আর, সিপিআই-ও ডাঙ্কেল প্রশ্নে জনতা দলের সঙ্গে যৌথ কার্যকলাপ শুরু করে দিয়েছে এবং জমির জন্য সংগ্রাম ত্যাগ করেছে। এসবের বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমি যা বলতে চাইছি তা হল এই যে, বাস্তবে সত্যিই বিপদটি রয়েছে এবং আমরা ব্যাপক এক মোর্চা গঠনেরও চেষ্টা চালাচ্ছি, কিন্তু আপনি যদি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান যে ভারত ইতিমধ্যেই এক Banana Republic-এ পরিণত হয়েছে, তাহলে আমরা সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বলে গুলিয়ে ফেলব, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলির আর কোনো গুরুত্ব থাকবে না এবং নিশ্চিতভাবেই আমরা সমস্ত ধরনের জোটের মধ্যে আটকা পড়ে যাব। আমাদের অনুশীলনের ধারা যদি এইভাবে নির্ধারিত হয় তবে সেটি আমাদের পরিস্থিতিতে সঠিক হবে না বলেই আমি মনে করি।

আপনি প্রকৃত এক জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভবের সম্ভাবনার কথা বলছিলেন। কোথা থেকে এর উদ্ভব ঘটবে? ভারতীয় বুর্জোয়াদের বাকি অংশের সাথে তার দ্বন্দ্বগুলিই বা কী হবে?

ভারতীর কমিউনিস্ট আন্দোলনে জাতীয় বুর্জোয়াদের অন্বেষণ এক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে রয়েছে। কারণ সোভিয়েত প্রভাবের ফলে একেবারে শুরু থেকেই সিপিআই বলতে শুরু করেছিল যে ভারতে একটি জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী রয়েছে, আর তা হল এক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তি। কখনও কখনও নেহরুকে এই শক্তির প্রতিনিধি হিসাবে দেখা হয়েছে, কখনও দেখা হয়েছে অন্য কোনো ব্যক্তিকে। ফলস্বরূপ, যত জোর গিয়ে পড়ে জাতীয় বুর্জোয়াদের সঙ্গে সম্পর্কের বিকাশ ঘটানোর ওপরে, আর সিপিআই বলতে শুরু করে দেয় যে তারাই (জাতীয় বুর্জোয়ারা – অনু) নেতৃত্বকারী ভূমিকা পালন করবে। এই চিন্তা কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দুর্বল করে দেয়। আমাদের অভিমত হল যে, আগেভাগে খুঁজে বেড়ানোর পরিবর্তে এবং তাদের প্রতিনিধিদের সনাক্ত করার পরিবর্তে প্রশ্নটিকে বরং সংগ্রামের মধ্য দিয়েই নিরসন করা যাক। আসুন, আমরা নিজেদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও সেই সঙ্গে সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে এগিয়ে চলি এবং দেখা যাক বাস্তবে কোন কোন শক্তি উঠে আসছে এবং আমাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। সিপিআই(এমএল) শুরু থেকেই এই কাজ করে আসছে এবং আমি নিজে আজও মূলগতভাবে অনুরূপ ধারণা পোষণ করি।

জাতীয় বুর্জোয়াদের এক অর্থে আপনি ছোটো বা মাঝারি বুর্জোয়া বলে একটি পার্থক্যরেখা টানতে পারেন : মতাদর্শগতভাবে তাদের মধ্যে জাতীয়তা বলে কোনো কিছু নেই, কিন্তু বাস্তবে তারা জাতীয় বুর্জোয়ার মতো আচরণ করতে বাধ্য হতে পারে কারণ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে সকলকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। কিন্তু যদি জাতীয় বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি খুঁজে বেড়াতে শুরু করে দেন তাহলে আরএসএস-কেও তার স্বদেশী কর্মসূচি ও ডাঙ্কেল বিরোধিতার জন্য সেরকমই এক প্রতিনিধি বলে মনে করতে পারেন। বোম্বাই-এর ব্যবসাদারদের কিছু কিছু অংশ পর্যন্ত গ্যাট ও ডাঙ্কেলের বিরোধিতা করেছে এবং ভারতে বহুজাতিকদের প্রবেশের বিরোধিতা করেছে।

ব্যাপারটি এমন নয় যে জাতীয় বুর্জোয়ারা কোথাও রয়েছে আর আপনার কাজ তাদের খুঁজে বের করা। আমরা বরং এই সূত্রায়ন থেকে শুরু করেছি যে তারা সকলেই মুৎসুদ্দি এবং আসুন আমরা দেখি মুৎসুদ্দিদের ভিতর থেকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের ধারায় এক জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভব কীভাবে ঘটে। এই অর্থে জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী সৃষ্টি করতে হবে।

আমরা গণতন্ত্র সম্পর্কে কথাবার্তা দিয়ে শুরু করেছিলাম। এই পরিপ্রেক্ষিতে পার্টির অনুশীলন কেমন চলছে? পার্টি আর গণসংগঠনগুলির মধ্যকার সম্পর্কই বা কীরকম থাকছে?

গণসংগঠনগুলি সম্পর্কে বলতে গেলে, আমরা মনে করি সেগুলি নিছক পার্টি শাখার থেকে বেশি কিছু হওয়া উচিত। বিভিন্ন গণসংগঠন জনগণের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব করে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, ছাত্র/যুব সংগঠনের থাকে নিজস্ব গতিময়তা, নিজস্ব চলার পথ ও নিজস্ব ভাবপ্রবণতা। পার্টি যদি কিছু সূত্র বেঁধে দেয় এবং সংগঠনটিকে তার সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ রেখে কাজ করার কথা বলে তাহলে তা ছাত্র/যুব সংগঠনের সমস্ত প্রাণশক্তি, উদ্যোগ ও গতিকে বিনষ্ট করে দিতে পারে। অনুরূপভাবে, মহিলা সংগঠনগুলির কাজের নিজস্ব ধরন রয়েছে, তাঁরা বিশেষ ধরনের নিপীড়নের মুখোমুখি হন, আর তাঁদের অভিব্যক্তিও তাই হবে আলাদা ধরনের। তাঁদের তাই আপেক্ষিকভাবে স্বাধীনরূপে কাজ করার সুয়োগ দিতে হবে। আমরা দেখেছি বিশেষত সিপিআই(এম)-এর গণসংগঠনগুলি অনেকটাই পার্টি শাখার অনুরূপ। তা চিরায়ত রুশ, এমনকি চীনা অনুশীলনের মতো। গণসংগঠনগুলি নেহাত কাগুজে সংগঠন হয়ে দাঁড়ায়। তাদের কেবলমাত্র সদস্য সংখ্যার হিসাবে – ৪০ লাখ, ৫০ লাখ এভাবে দেখা হয়। তাদের কর্মসূচিতে অনর্গল হস্তক্ষেপ করা হয়। তাই আমরা এমন এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর চেষ্টা করছি – যাতে তাদের বেশি বেশি স্বাধীনতা দেওয়া যায়, তাদের বৈশিষ্ট্যগুলিকে স্বীকার করা হয় ও তাদের উৎসাহিত করা যায়। এটি হচ্ছে একটি দিক। আর দ্বিতীয়ত, আমরা মনে করি যে সেক্ষেত্রে এক দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক থাকতে হবে যেখানে একদিকে পার্টি তাদের নেতৃত্ব দেয় অপরদিকে তারা নিজেরাও পার্টির ওপর এক ধরনের নজরদারির কাজ করে। এমনকি পার্টি যখন ক্ষমতায় নেই তখনও পার্টির ভিতরে আমলাতন্ত্রের মতো কিছু কিছু বিকৃতি ও প্রবণতার উদ্ভব হতে পারে।

উদাহরণ হিসাবে, ধরুন, কোনো পার্টি ক্যাডার কোনো মহিলার সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন। পার্টি কমিটিতে বিষয়টি আলোচিত হল কিন্তু প্রতিক্রিয়া ঘটার আশঙ্কায় গোটা ব্যাপারটি চেপে যাওয়া হল। অভিযোগটি মহিলা সংগঠনের কাছে গেল। তাঁরা বিষয়টি গ্রহণ করলেন এবং পার্টির ওপর চাপ দিয়ে বললেন যে এটি অন্যায় হচ্ছে। আমরা মনে করি, এতে ভালোই হয় কারণ পার্টি ব্যবস্থায় সাধারণত বিষয়গুলিকে মহিলাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় না। সংশ্লিষ্ট মহিলা তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করার, অবিচারের প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ পাওয়ার মতো অবস্থায় নাও থাকতে পারেন। কিন্তু মহিলা সংগঠন যদি বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে স্বভাবতই পার্টিকে চাপের মুখে পড়তে হয়।

কোথাও আমাদের হাতে কিছুটা ক্ষমতা থাকলে, যেমন ধরা যাক কার্বি-আংলং জেলা পরিষদে কিম্বা ভবিষ্যতে কোনো সরকার চালাতে গেলেও, আমরা এ বিষয়ে লক্ষ্য রাখি যাতে কৃষক সমিতি ও অন্যান্য (গণ)সংগঠনগুলি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং তারা যাতে কর্মকর্তাদের ওপর, পার্টির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই হল গণসংগঠনগুলি সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিকোণ – একদিকে তাদের স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করা, যাতে যে অংশের তারা প্রতিনিধিত্ব করছে সেই অংশের বৈশিষ্ট্যগুলিকে তারা যথাযথভাবে প্রতিফলিত করতে পারে। এটা তাদের প্রাণময়তা ও গতিশীলতা জোগাবে। পার্টির উচিত কেবল নেতৃত্ব দেওয়ার কাজে নিজেকে আবদ্ধ রাখা আর অন্যদিকে গণসংগঠনগুলির উচিত পার্টির ওপর নজরদারি বহাল রাখা।

যে উদ্যোগটি খুবই দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হল ইনকিলাবী মুসলিম কনফারেন্স গঠন। এক ধর্মীয় পরিচিতিকে ঘিরে সংগঠন গড়তে বামপন্থীরা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

আমরা এ ব্যাপারে হাত লাগিয়েছি কারণ সম্প্রতি দেশকে এরই ভিত্তিতে বিভাজিত করা হয়েছে। সামনে এসেছে হিন্দুত্ব আর মুসলিমরাই হলেন এর লক্ষ্যবস্তু। ওরা বলতে শুরু করেছে, হিন্দুত্ব হল ধর্মের থেকেও বেশি, এটি এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক বর্গ। তাই ওরা বলছে যে মুসলিমরাও হিন্দুদের অংশ কারণ তারা ভারতে বসবাস করে – ঐতিহাসিকভাবে এবং সংস্কৃতিগতভাবেও। ওরা  ‘মহম্মদীয় হিন্দু’ কথাটি চালু করে বলছে : মুসলিমরা যদি তাদের পৃথক পরিচিতি ত্যাগ করে ও বৃহত্তর হিন্দু পরিবারের অংশ হয়ে ওঠে তাহলে মুসলিমরা ভারতে থেকে যেতে পারে, আর তাদের মহম্মদীয় হিন্দু বলে গ্রহণ করতে আমরা প্রস্তুত। তারা আরও বলছে যে, শিখ, জৈন ও বৌদ্ধরাও হিন্দু। কেউ ভগবানের – একেশ্বরের, কেউ দশ দেবতার, কেউ কোটি কোটি দেবতার পূজো করছে, আবার কেউ বা কোনো দেবতারই পূজো করছে না – তবুও তারা সবাই হিন্দু! হিন্দুত্ব হল এক ব্যাপকতর সামাজিক-সাংস্কৃতিক বর্গ আর মুসলিমরা সহ সকলেরই  এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। এটি মেনে নেওয়ার সদিচ্ছার মধ্যে দিয়েই তাদের দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের যাচাই হবে। তাই মুসলিমদের তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিচিতিকে ত্যাগ করতে বলার দাবি হল এক বিশেষ আক্রমণ। এই আক্রমণ ধর্মের উপরই নয়, বরং এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক আক্রমণও বটে। সম্প্রদায়গতভাবেই মুসলিমরা বিপদের মুখে। তাই প্রতিক্রিয়াও হচ্ছে সম্প্রদায়েরই ভিত্তিতে। এখন এই মুসলিম প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এক মৌলবাদী উপাদান – যা বিজেপির প্রতিপক্ষ। কিন্তু অন্যান্য মুসলিমরা মনে করেন যে ভারতের মতো দেশে যেখানে মুসলিমরা সংখ্যালঘু আর জনসংখ্যার ৮০-৮৫ শতাংশ হল হিন্দু সেখানে এটি সঠিক হবে না। তাই ভারতের পটভূমিতে তাঁরা মনে করেন ধর্মনিরপেক্ষতাই আরও ভালো।

এর অর্থ এই নয় যে ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে বুর্জোয়াকরণ ঘটে গেছে এবং সেই অবস্থান থেকেই তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলছেন। তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বিপরীতে যায়। কিন্তু ভারতের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি তাঁদের ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে যেতে উৎসাহিত করেছে।

দ্বিতীয়ত, মুসলিমরা বামপন্থীদের সাথে এক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। নির্বাচনের সময় তাঁরা কোনো না কোনো বুর্জোয়া দলের পক্ষ নিলেও তাঁদের মধ্যে সাধারণভাবে এই ধারণা গড়ে উঠেছে যে বামপন্থীরাই হল প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ।  আগে মুসলিমদের একাংশ বামেদের সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রগতিশীল, কমিউনিস্টরা ছিলেন। বহু গুরুত্বপূর্ণ কমিউনিস্ট ছিলেন মুসলিম ও বহু মুসলিম শ্রমিক শ্রেণী হিসাবে সামিল হয়েছিলেন। তারপর ছিলেন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা, বহু প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মী। কিন্তু সমগ্র সম্প্রদায়গতভাবে বামেদের প্রতি এ ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ কিছুটা নতুন ব্যাপার। আগে ভাবাবেগ ছিল অনেকটাই পাকিস্তানের অনুকূলে। কিন্তু এখন আর নতুন করে দেশকে বিভাজনের কোনো আকাঙ্খা নেই।

তাই এগুলি হল পরিবর্তনের দিক। সম্প্রদায়গতভাবেই যখন মুসলিমরা আক্রমণের মুখোমুখি তখন তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতাকে সমর্থন জানাচ্ছেন এবং বামেদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলছেন।

আমরা এই সম্পর্ককে সংহত করতে চাই। কিন্তু একে কীভাবে এক সাংগঠনিক রূপ, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়? সামগ্রিকভাবে সেই ভাবনা থেকেই ইনকিলাবী মুসলিম কনফারেন্সের জন্ম। সম্প্রদায়গত দিক আর ইনকিলাবী দিক – দুটি দিককেই মাথায় রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবোধকে শক্তিশালী করার কোনো অভিপ্রায় নেই, বরং বিজেপি ইত্যাদির বিরুদ্ধে মুসলিম স্বার্থগুলি তুলে ধরতে হবে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক পরিবর্তন ঘটানোর ওপরেও গুরুত্ব আরোপ করা দরকার। তাই ইনকিলাবী বিজেপির বিরুদ্ধে নয়, বরং তা সম্প্রদায়ের নিজের মধ্যেই ইনকিলাবী। তাই আমরা মুসলিম মহিলাদের অবস্থাকে উন্নত করার বিষয়টির ওপর বিরাট জোর দিয়েছি। এই প্রশ্ন তাঁদের নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই উঠে এসেছে।